পরের দিনও তাদের মধ্যে ইসলামের কয়েকটি নীতি নিয়ে আলোচনা হয় এবং বলা হয়, কোনো ব্যক্তির অন্য কোনো দেশে গিয়ে জিহাদি কার্যক্রম চালানো বৈধ নয়। তখন নাফিস বলেন, তিনি বাংলাদেশের একজনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, ওই সব নীতি অনুসরণের বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ১১ জুলাই নাফিস জানান, যুক্তরাষ্ট্রের একজন ‘High Ranking official’কে সে হত্যা করতে চান।
ফেসবুকের কথোপকথনে নাফিস পরিষ্কার ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর ক্ষেত্রে ধর্মীয় কোনো বাধা নেই বলেই তিনি মনে করেন। এতে বলা হয়, নাফিসের পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে সহযোগী সেজে এফবিআই কর্মকর্তারাই তাকে ২০ ব্যাগ ‘নকল বিস্ফোরক সরবরাহ করেন, যাতে তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা যায়। ম্যানহাটনে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সামনে বিস্ফোরক ভর্তি’ ভ্যান গঁড় করিয়ে নাফিস পাশের মিলেনিয়াম হিল্টন হোটেলে যান। সেখান থেকে তিনি ভ্যানে রেখে আসা সেলফোনে বার বার কল দিতে থাকেন এক হাজার পাউন্ড (৪৫৪ কোজি) বিস্ফোরকে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য। কিন্তু ভ্যানে সত্যিকারের বিস্ফোরক না থাকায় সেটি আর ফাটেনি। বুধবার নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ভবনের সামনে থেকে নাফিসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও এফবিআই।
কিন্তু যেভাবে ‘আলকায়দার চর’ সেজে নাফিসের কর্মকাণ্ড দিনের পর দিন পর্যবেক্ষণ করেছে এফবিআই, যেভাবে তার আস্থা অর্জন করে তার কর্মকাণ্ডে ইন্ধন যুগিয়ে শেষ মেষ ধরা হয়েছে, তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় ভাবে একে ‘স্টিং অপারেশন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ভাবে টোপ ফেলে নাফিসকে ধরা বৈধ কিনা তা নিয়ে নানা জায়গায় বিতর্ক হতে পারে, এবং হয়েছে। অনেকেই তখন ভেবে নিয়েছিলেন যে, নাফিসকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশে নাফিসের অভিভাবকেরও একই অভিমত ছিল। এ নিয়ে সামান্য আলোচনা করা প্রয়োজন বোধ করছি। বেশ ক’বছর আগে আমেরিকার এমএসএনবিসি চ্যানেলে একটা প্রোগ্রাম হত ‘To Catch a Predator’ নামে। যারা অনলাইনে বসে বসে নাবালিকা মেয়েদের সাথে যৌনসম্পর্ক করার জন্য লালায়িত থাকত, তাদের ট্র্যাপে ফেলে জেলে ভরা হত। এমন নয় যে কোন ভাল মানুষকে ‘ফাঁদে ফেলে ব্যাপারগুলো করা হত। বরং অনলাইন চ্যাট ফ্যাট বহু স্তর পার হয়ে (প্রতিটি স্তরেই কিন্তু ইঙ্গিত দেয়া হত যে সম্পর্ক করতে ইচ্ছুক মেয়েটা কিন্তু ‘আণ্ডারএজড’) যারা খালি বাসায় মেয়ের সাথে দেখা করার লোভনীয় প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে চলে আসত তাদের গলাতেই দড়ি পড়তো। নাফিসের ব্যাপারটাও আমার সেরকমই মনে হয়। এটা এমন নয় যে নিরপরাধ নিষ্পাপ এক হাবা গোবা ছেলেকে ‘কায়দা করে ফঁসানো হয়েছে। বরং এধরণের কেসে যথেষ্ট আলামত পেলেই তারা এগোয়। যে লোক সারাদিন পর্নোসাইটে গিয়ে কেবল ‘আণ্ডারএজড মেয়ে’ খুঁজে ফেরে, কিংবা যে ছেলে ফেসবুকে বা অন্যত্র আমেরিকাকে ধ্বংসের জন্য জিহাদের ডাক দেয়, কিভাবে বোমা যোগাড় করা যায় তার খোঁজ খবর নেয়, একে ওকে ইমেইল করে, তার ধরার পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। নাফিসের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। যারা মনে করেন একুশ বছরের শান্ত-শিষ্ট বিভ্রান্ত ছেলেকে ফাঁদে ফেলে সন্ত্রাসবাদী বানানো হয়েছে, তাদেরকে ইন্টারনেট থেকে পুরো অভিযোগনামাটি (Complaint United States of America vs. Quazi Mohammad Rezwanul Ahsan Nafis) পড়ে দেখে বলব। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে কিভাবে তিনি আমেরিকায় জিহাদ করাকে নিজের ‘কর্তব্য মনে করেছেন, আমেরিকাকে ‘দার আল-হারব’[৩১] হিসেবে অভিহিত করেছেন, এবং আমেরিকার মুসলিমদের বলেছেন ‘তালাফি। বিন লাদেনও তাই মনে করতেন। ৯-১১ ঘটার অনেক আগেই– ১১ই জানুয়ারি ১৯৯৯ এর নিউজ উইকের একটি সংখ্যায় ওসামা বিন লাদেনের একটা সাক্ষাতকার ছাপা হয়েছিল। সেই সাক্ষাতকারে লাদেন সাহেব পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন কেন তিনি সকল আমেরিকানদের মেরে ফেলাকে জায়েজ’ মনে করেন, কারণ আমেরিকার অমুসলিমেরা সব কাফের, আর মুসলিমেরা সব ‘তালাফি’ (অর্থাৎ সত্যিকার মুসলিম নন)। এরা যেহেতু আমেরিকায় ট্যাক্স দিচ্ছে, এবং আমেরিকাকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে, তাই সব আমেরিকান, সেটা নারী পুরুষ শিশু যেই হোক না কেন— মেরে ফেললে ধর্মসিদ্ধই হবে। জিহাদিরা মনে করেন যতদিন পর্যন্ত আমেরিকার মত কাফির রাষ্ট্রগুলো ইসলামের পতাকাতলে না আসছে ততদিন এ সমস্ত দেশগুলোকে ‘দার আল-হারব’ বা ‘যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। শুধু মুসলিমদের নয়, ইসলামে ধর্মান্তরিত কাফিরদের জন্যও এ কথা প্রযোজ্য। এপ্রসঙ্গে বিখ্যাত ইসলামী গবেষক আনোয়ার সাইখ লিখেছেন,–
‘ইসলামে ধর্মান্তরিত সকলেরই এটা কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় যে, তাদেরকে অবশ্যই আরব সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে গ্রহণ করতে হবে, অর্থাৎ তাদের সমস্ত জাতীয় প্রতিষ্ঠান হবে আরবিয় প্রতিষ্ঠানসমূহের অধীন: যেমন মোহম্মদকে আচরণের আদর্শ রূপে দেখা, ইসলামী আইন প্রবর্তন, আরবি ভাষা, সংস্কৃতি শিক্ষা ইত্যাদি কার্যকর করতে হবে। এর চেয়েও খারাপ কথা হল, তাদের অবশ্যই নিজস্ব সংস্কৃতি ও জন্মভূমিকে (অর্থাৎ কাফির রাষ্ট্রকে) এতোটাই ঘৃণা করতে হবে যে, এটা ‘দার উল হারব’ বা জীবন্ত-যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।
