“গগন ঘটা ঘহরাণী সধো
গগন ঘটা ঘহরাণী
পূরব দিস্সে উঠিহৈ বদরিয়া
রিম ঝিম বরষত পানী।
আপন আপন মেড়ঁ সম্হারো
বহ্যো জাত য়হ পানী
সুরত নিরত কা বেল নহায়ন
করৈ খেত নির্ব্বাণী।”
—কবীর
ঘনঘটা ঘনিয়ে এল পূবে বাদল উঠলো রিমঝিম বরিষ নামলো, সামাল ভাই ক্ষেতের আল, ঐ যে জল বয়ে চল্লো। দুটি লতা—অনুরাগের বিরাগের—তাদের আজ এই রসের বৃষ্টিধারায় ভিজিয়ে নাও, এমন ক্ষেত লাগাও যেখানে অবাধ মুক্তির ফসল ফলে, ক্ষেতের ফসল কেটে ঘরে তুলতে পারে, তাকেই তো বলি কুশল কিষাণ।
সেকালে তাঁরা art কিসে নেই বা কিসে আছে এটা সুনিশ্চিত করে দিতে অথবা নানা রকম কলাবিদ্যার সংখ্যা নির্ধারণ করে’ চৌষট্টির মধ্যেই artকে ধরে রাখতে চান নি; এই জন্যই শাস্ত্রে বলা হ’ল:
“বিদ্যা হ্যনন্তাশ্চ কলাঃ সংখ্যাতুং নৈব শক্যতে।
বিদ্যা মুখ্যাশ্চ দ্বাত্রিংশচ্চতুঃষষ্টিঃ কলাঃ স্মৃতাঃ॥” (শুক্রনীতিসার)
এইভাবে বিদ্যা এবং কলা দুয়ের প্রভেদটা মাত্র মোটামুটি রকমে শাস্ত্রে ধরা হ’ল:
“যদ্যত্ স্যাদ্ বাচিকং সম্যক্ কর্ম্মবিদ্যাভিসংজ্ঞকম্।
শক্তো মূকোপি যৎ কর্ত্তুং কলাসংজ্ঞন্তু তৎস্মৃতম্॥” (শুক্রনীতিসার)
আমরা এখন artকে fine, industrial—নানাভাগে ভাগ করে’ নিয়েছি। আগেও এই রকম ভাগ ছিল শিল্পে—কর্মাশ্রয়া দ্যুতাশ্রয়া উপচারিকা ইত্যাদি হিসেব। সেকালের চৌষট্টি কলার ফর্দটার মধ্যে যাকে বলি fine art, যাকে বলি industrial art এবং যাকে বলি science, সবই এক কোঠায় রাখা গেছে। সেকালের হিসেবে ধরলে আজকালের Football, Billiards ইত্যাদি খেলা artএর মধ্যে এসে পড়ে; সন্তান-পালন একটা artএর মধ্যে ছিল আগে, এখন ওটা আমরা Medical scienceএর মধ্যে ফেলে দিয়েছি। এমন কি ছেলেদের খেলার পুতুল গড়া ও কেষ্টনগরের পুতুল গড়া এবং গড়ের মাঠের ধাতুমূর্তি গড়া—তিনটেকে সম্পূর্ণ আলাদা জাতের শিল্প বলে ধরে নিয়েছি। মানুষের উন্নত ও সুন্দর এবং সুকুমার বৃত্তিসমূহ যে শিল্পকাযের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয় তাকে বলি fine art, মানুষের প্রতিদিনের জীবনের নানা সাজ সরঞ্জাম যাতে করে’ শুধু কাযের নয় সঙ্গে সঙ্গে সুদর্শন হয়ে ওঠে তাকে বলি industrial art; এমনি artএর মোটমাট জাতিবিভাগ সৃষ্টি হয়ে গেছে মানুষের নিজের মধ্যে সমাজ-বন্ধনের সময়ে নানা বর্ণ-বিভাগের প্রথায়; artistদের কাছে কিন্তু এ রকম একটা বিভাগ নিয়ে artএর উপভোগের তারতম্য ধরা একেবারেই নেই, সেখানে art এক কোঠায় না art অন্য কোঠায়, ইতর বিশেষ, মাঝামাঝি, চলনসই—এ সব কথা নেই, art কি art নয় এই বিচার।
শিল্পশাস্ত্র আমাদের যা রয়েছে তাতে ভাস্কর্যের একটা দিক, স্থাপত্যের খানিকটা—যেটা পূজন ও যজন-যাজনের সঙ্গে জোড়া, তারি উপরে বিশেষভাবে মতামতের জোর দেওয়া হয়েছে দেখা যায়। তা ছাড়া এটাও দেখি যে শিল্পশাস্ত্রের সংগ্ৰহকার্যে ভারি একটা ত্বরা রয়েছে— কোন রকমে একটা প্রাচীনত্বের ছাপ মেরে জিনিষটাকে সাধারণে প্রচার করার ত্বরা–একটা ধর্মবিপ্লবে এবং সেই সময়ের ত্বরা—শিল্পকে নিয়ে টানাটানি এ সবই লক্ষ্য করি শিল্পশাস্ত্রের সংগ্রহের ধরণ থেকে।
Artএর মধ্যে একটা অনির্বচনীয়তা আছে যেটা artistএর অনুভূতির বিষয় এবং অসাধারণ বলেই artএর অনির্বচনীয় রস যে কি ব্যাপার তা সবাইকে বুঝিয়ে ওঠা কঠিন। রস পেলে তো পেলে, না পেলে তো পেলে না, এসব কথা শিল্পশাস্ত্রকার বিচার করবার সময় পাননি, এসব চিন্ত আলঙ্কারিকদের, রসের দিক দিয়ে তার বিচার করে দেখেন যে সেদিক দিয়ে এতটুকু বা এত বড় নেই সরস বা নীরস নিয়ে কথা। মাটির খেলনা সরস হ’ল তো মগধের নাড়ুর চেয়ে বড় জিনিষ হ’ল এবং মগধ উড়িষ্যা সব শিল্পের বড় বড় ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ ও গণেশের সমতুল্য হয়ে উঠলো একটি সুন্দর আরতিপ্রদীপ। আর্টের জগৎ শিল্প কি শিল্প নয় এই নিয়ে,- উচ্চনীচ ভালমন্দ ভেদাভেদ, দেবতা কি মানুষ কি বানর এ নিয়ে দেখা নয়,—art কি art নয় এই নিয়ে সব জিনিষকে পরীক্ষা করা হ’ল অকাট্য নিয়ম। Art for art এই কথাই হ’ল artistএর, art ধর্মের জন্য কি জাতীয় গৌরবের ধ্বজা সাজাবার জন্য কি natureএর সম্মুখে mirror ধরার জন্য অথবা বিপশ্চিতাম মতম্-কে বলবৎ রাখার জন্য, এ তর্ক আর্টের জগতে উঠতেই পারে না।
Artist যে উদ্দেশ্যেই কায করুক artএর দিকে চেয়ে করাই হ’ল তার প্রধান কায। ময়ূর নিজের আনন্দে তার চিত্র-বিচিত্র কলাপ বিস্তার করে, বাগানের শোভা কি বনের শোভা কি খাঁচার শোভা তাতে হ’ল কি না হ’ল ময়ূরের মনে একথা উদয়ও হ’ল না; এতটা স্বাধীনতা মানুষ শিল্পে চায় কিন্তু পেলে কই?—ধৰ্ম বল্লে তুমি আমার কাজে লাগো, দেশ বল্লে আমার, এমনি নানাদিক দিয়ে শিকল পড়ে গেল শিল্পের হাতে পায়ে, তারপর একদিন চিরকালের ছাড়া পাখী তার মনিবের পোষ মানলে, ইসারাতে পুচ্ছ ওঠালে নামালে যে শুধু তাই নয়, জলযন্ত্র ঘোরালে ঘটিযন্ত্র চালালে কামান দাগলে নিয়ম মতো!
“অপি শ্রেয়স্করং নৃণাম্ দেববিম্বমলক্ষণম্।
সলক্ষণং মর্ত্ত্যবিম্বম্ নহি শ্রেয়স্করং সদা।।”
এই হুকুমে এককালে আমাদের শিল্পীরা বাঁধা পড়ে’ ছিল। পুঁথিকার দেবতা সমস্তের ধ্যান দিলে শিল্পে, সেই ধ্যান মতো গড়ে চল্লো— এই ঘটনাই যদি পুরোপুরি ঘটতো তবে আমাদের art কেবলমাত্র ধ্যানমালার illustration হয়ে যেতো কিন্তু এর চেয়ে যে বড় জিনিষ হয়ে উঠলো বুদ্ধ নটরাজ প্রভৃতি নানা দেবমূর্তি সেটা ধ্যানমালার লিখিত ধ্যানের অতিরিক্ত এবং শিল্পশাস্ত্রের মান-পরিমাণ লক্ষণাদির বাঁধা নিয়মের থেকে স্বতন্ত্র আর কিছু নিয়ে। প্রাচীন দেবমূর্তিগুলি আমাদের বাঙলার কার্তিকের মতো সম্পূর্ণ কাপ্তেনবাবু বা কলে কাটাছাঁটা মরা জিনিষ হয়ে পড়েনি শুধু শিল্পের শিল্প-ক্রিয়৷ তাদের অমরত্ব দিলে বলে’ এবং শুধু সেইটুকুর জন্য artএর জগতে এইসব দেবতার স্থান হ’ল।
