একটু পরে ওয়েটার ট্রেতে করে দুটো পেগ গ্লাস এনে টেবিলের উপরে নামিয়ে রাখল, আউর কুছ সাব?
হ্যাঁ, দোনোমে থোড়া করকে পানি মিলা দো।
ওয়েটার একটু একটু করে দুটো পেগ গ্লাসে জল ঢেলে দিয়ে চলে গেল।
সন্তর্পণের সঙ্গে একটু একটু করে সিপ করছি আর অনুভব করবার চেষ্টা করছি নেশা ধরল কিনা। হঠাৎ এমন সময় খোলা দরজার দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠলাম, শ্রীমতী রাণু ও শতদল হাসতে হাসতে প্রবেশ করল ঘরের মধ্যে।
এবং তারা আমাদের দুটো টেবিলের পরের টেবিলে এসে বসল। ওরা আমাদের দুজনকে লক্ষ্য করেনি।
বোয়—বোয়? শতদলের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
বয় এসে ওদের সামনে দাঁড়াল।
একঠো হুইস্কি সোডা, আউর একঠো অরেঞ্জ স্কোয়াসু শতদল অর্ডার দিল।
কিরীটীর দিকে তাকালাম। সে দেখি অন্যদিকে তাকিয়ে একমনে সিগার টেনে যাচ্ছে, শতদল বা রাণুর দিকে তার দৃষ্টি নেই।
কিন্তু তোমার মা, simply I cant stand her রাণু! তিনি যে আমাকে খুব বেশী পছন্দ করেন তা বলে মনে হয় না, শতদল রাণুকে বলছে কানে এল।
ওটা তোমার ভুল ধারণা দল
না, ভুল ধারণা নয়। কুমারেশের প্রতিই তাঁর একটু– কথাটা শতদল শেষ করে না।
Dont be silly, দল! রাণু জবাব দেয়।
একটু বোধ হয় অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। কাউন্টারের পাশে কনসার্ট বাজানো শুরু হয়েছিল। বেহালা, পিয়ানো ও ফ্লুট—মাত্র তিনটি যন্ত্রের সহযোগে চমৎকার ঐকতান বাদ্য। সুরটা একটা পরিচিত বাংলা গানের। কনসার্ট-বিরতি কয়েক মিনিটের জন্য হতেই আবার শতদলের কণ্ঠ শোনা গেল, কুমারেশের আজ পর্যন্ত কোনো সংবাদুই আর পাওয়া যায়নি?
না। রাণু জবাব দেয়।
কিন্তু এবারও কুমারেশের অলিম্পিকে যোগ দেবার কথা। সারা ভারতবর্ষ থেকে তো ওই একা সাঁতারে সিলেকটেড হয়েছে।
এতক্ষণে বুঝতে পারি কুমারেশ মানে বিখ্যাত সাঁতারু কুমারেশ সরকারের কথা হচ্ছে। নামটা তাই প্রথম থেকেই কেমন যেন চেনা-চেনা মনে হচ্ছিল।
এখানে আসবার দিন পনেরো আগে সংবাদপত্রে একটা সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, বিখ্যাত সাঁতারু কুমারেশ সরকার তার কলকাতার বাসভবন থেকে হঠাৎ কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে। সংসারে তার আপনার বলতে একমাত্র বৃদ্ধ বাপ অধ্যাপক ডঃ শ্যামাচরাণু সরকার। বছর পাঁচেক হল ডঃ সরকার চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। কুমারেশ সরকার শুধু একজন বিখ্যাত সাঁতারুই নয়, কণ্ঠসংগীতেও আধুনিক গায়কদের মধ্যে সে অন্যতম। গায়কদের মধ্যেও কুমারেশ রেডিও গ্রামোফোন জগতে একচ্ছত্র সম্রাট। সেইজন্যই কুমারেশ সরকারের নিরুদ্দেশের সংবাদ যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং এ-ও জানি, এখন পর্যন্ত সেই নিরদিষ্ট কুমারেশের কোন সংবাদুই পাওয়া যায়নি। ব্যাপারটা সত্যিই যেমন রহস্যপূর্ণ তেমনি চাঞ্চল্যকর।
আবার রাণুর গলা শোনা গেল, সত্যিই শতদল তুমি জান না কুমারেশ কোথায় গিয়েছে?
সকালবেলাতেই তো বলেছি জানি না।
কিন্তু আমি কি ভেবেছিলাম, জান?
কি
তুমিই তার সবচাইতে প্রিয় বন্ধু, অন্ততঃ তুমি বোধ হয় জান সে কোথায়!
শুধু তোমার কেন, সকলেরই তাই ধারণা। অথচ এরা কেউ বিশ্বাস করে না যে, তার সংবাদ জানা সত্ত্বেও গোপন করে রাখার কী আমার স্বার্থ থাকতে পারে! জগতে কুমারেশের চাইতে প্রিয় বন্ধু আর আমার নেই। সেই স্কুলের জীবন থেকে আমাদের বন্ধুত্ব, তার প্রতিটি কাজে চিরদিন আমিই সর্বাগ্রে তাকে উৎসাহ দিয়েছি, তার জীবনের প্রতিটি success-এ আমিই তাকে এগিয়ে দিয়েছি। সে শুধু আমার বন্ধুই নয়, সহোদরের চাইতেও অধিক।
জানি। মৃদুকণ্ঠে রাণু কেবল জবাব দেয়।
আবার বাজনা শুরু হয়, এবারে কিন্তু আর ঐকতান নয়, কেবল বেহালাবাদক বেহালা বাজাতে শুরু করে। চমৎকার বাজনার হাত লোকটির। আমার মনটা বাজনার প্রতি আবার আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
হঠাৎ কিরীটী চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। চেয়ে দেখি, রাণু আর শতদলও চেয়ার ছেড়ে উঠে খোলা দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিরীটী দূর থেকে ওদেরই অনুসরণ করে, আমিও কিরীটীর পিছনে চললাম।
মাথাটা একটু হালকা হালকা বোধ হয়। বুঝলাম জিন ও লাইমের কার্য শুরু হয়েছে আমার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোতে।
শতদলবাবু? কিরীটীর ডাকে চমকে শতদল ফিরে তাকাল, কে? ও মিঃ রায়, our detective! Hallow! মনে আছে স্যার, আপনার সেই সাবধান বাণী। আর বলতে হবে না।
ব্যাপার কি শতদল? বিস্মিতা রাণু প্রশ্ন করে শতদলের মুখের দিকে তাকিয়ে।
মিঃ রায়ের ধারণা, আমার জীবনের উপরে কেউ না কেউ attempt নিচ্ছে, উনি আমাকে তাই আজ সকালে সাবধান করে দিয়েছেন, মৃদু হাস্যসহকারে বলে শতদল।
তোমার life-এর ওপরে attempt! বিস্মিত সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে আবার তাকাল রাণু শতদলের মুখের দিকে।
কিন্তু আমি অন্য কথা বলবার জন্য আপনাকে ডেকেছিলাম শতদলবাবু কিরীটী বললে।
কী বলুন তো?
আপনার বাড়িতে আজ সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম। হরবিলাসবাবু, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল।
Really! তিনটে পাগল—তিন শ্রেণীর। কেমন লাগল পাগলগুলোকে? হাসতে হাসতে শতদল বলে।
কিন্তু আপনার নিরালা দেখা হল না, তাই ভাবছি কাল সকালের দিকে যাব।
নিশ্চয় নিশ্চয়। আসবেন। তুমিও এস না রাণু। রাণুর দিকে ফিরে তাকিয়ে শতদল বলে।
কোথায়, তোমার ওখানে?
হ্যাঁ। সকালে চা-পর্বটা আমার ওখানেই না হয় হবে সকলের, কী বলেন মিঃ রায়!
