প্রায় সমান্তরাল ঘটনা ঘটে গেল ওঁর নিজের শহরে–এই তো সেদিন। কেন্দ্রীয় সরকারের একজন পদস্থ মধ্যবয়সী মহিলা অফিসারকে রেডক্রস-ছাপমারা গাড়ি থেকে টেনে নামানো হল। একহাট লোকের সামনে মস্তান-পার্টি ঐ মহিলাকে বিবস্ত্র ও হত্যা করল। এ ভদ্রমহিলা কিন্তু দিল্লীর সেই তরুণ নটুয়ার মতো কোনো একটা রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার করতে রাস্তায় নামেননি। সমাজকল্যাণ দপ্তরের তিনি এক সম্মানীয় অফিসার। সরকারী কাজে ট্যুরে বেরিয়েছিলেন। রাজনীতির ধারে কাছে নেই। তবে হ্যাঁ, দুর্জনে বলে, তিনি নাকি একটি তদন্তও করছিলেন : এক আন্তর্জাতিক সংস্থার বিনামূল্যে প্রেরিত ঔষধপত্র কীভাবে চোরাবাজারে বিক্রয় হচ্ছে সে বিষয়ে তদন্ত!
এবারেও হাটের কেন্দ্রবিন্দুতে অনুষ্ঠিত ঐ নাটকের–দুঃশাসনকর্তৃক দ্রৌপদীবস্ত্রহরণ পালার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নেই! হত্যার সময়ে হাজার হাটুরে যে চোখ খুলে ছিল এমন প্রমাণ নেই, তবে কমিশনের সামনে কেউ যে মুখ খুলবার সাহস পায়নি তার প্রমাণ আছে।
আমরা শুনলাম–আদালতে নয়, বাইরে : ‘এমন তো হয়েই থাকে!’
ফলে, ঐ অজ্ঞাতপরিচয় মস্তান যা দাবী করেছে, তা মিথ্যা আস্ফালন নয়। সত্যই জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ার আড়ালে ও যথেচ্ছাচার করে যাচ্ছে। ‘যুগ-যুগ জিও’ আইনে করে যাবেও। ছেলেটা কথাপ্রসঙ্গে ওঁকে ‘আর. কে. টি.’ নামে অভিহিত করেছে। অর্থাৎ ছাত্রমহলে ওর যাতায়াত আছে।
এ কথা নিশ্চিত : ও যদি ‘কেমিক্যাল ল্যাব’-এর ভিতর অথবা লেকচার থিয়েটারে ঢুকে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ওঁকে গুলি করে মেরে ফেলে, তারপর শিস দিতে দিতে কলেজ থেকে বেরিয়ে যায়, মোটর বাইকে চেপে হাওয়া হয়ে যায়–তাহলে, পরে পুলিস রোল-কলের খাতা মিলিয়ে একচল্লিশটি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে একটিও প্রত্যক্ষদর্শী উদ্ধার করতে পারবে না।
এই আজকের সমাজ-ব্যবস্থা।
আর্দশের জন্য মরতে উনি ভয় পান না! কিন্তু প্রণতি! তার কী হবে? যদি এ অসম যুদ্ধে সাহসিকতা দেখাতে গিয়ে…।
নাঃ। উপায় নেই! ছোকরার প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া!
পঁচিশ হাজার টাকার জন্য দুঃখ করছেন না। ওঁর কোনো ওয়ারিশ নেই। প্রণতির আজীবন ভরণ-পোষণ-সেবাযত্নের জন্য টাকা জমা দেওয়া আছে ইন্সিওরেন্স কোম্পানিতে–যদি দৈবাৎ ওঁর ডাক আগে এসে যায়। বাকি অর্থের কিছুটা পাবে তোতন। বাকিটা শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন। পঁচিশ হাজার টাকার অঙ্কটা সেদিক থেকে কিছুই নয়।
বেদনা দু-তরফা।
এক : ঐ নরকের কীটের কাছে হার মানা। এদিকে মাস্তান ওঁকে দোহন করছে। আর ওদিকে লালমোহন কৃষ্ণার বডি নামিয়ে দিচ্ছে তার বাপের দাওয়ায়! উনি প্রতিবাদ করতে পারছেন না।
দুই : নিজের ভ্রান্তি! উনি সঠিক কেমিক্যাল অ্যানালিসিস করতে পারলেন না! ক্যালসিয়াম, সিলিকা আর সোডা অ্যাশ-এর মিশ্রণকে আইডেন্টিফাই করলেন ‘ক্রিস্টালাইজড রেগুলার অক্টাহেড্রনাস স্ফটিক’ বলে। সোজা কথায় বেলোয়ারী কাঁচকে হীরকখণ্ড বলে ভুল করলেন আজন্ম অদ্বিতীয় কেমিস্ট্রির অধ্যাপক! ভুলটা হল কখন? ঠিক কোথায়? হ্যাঁ, মনে পড়েছে! ও যখন বললে, ‘তোমাকে তোমারি অস্ত্রে বধ করব এবার! বলতো, অধ্যাপক, বুদ্ধযুগে, একজন অযোনিসম্ভবা জনপদকল্যাণী সে-কালীন শ্রেষ্ঠ ভেষগাচার্যকে গর্ভে ধারণ করে…’
তখনি, ঠিক তখনি, ওঁর সব ভুল হয়ে গেল। উনি দৃঢ়মুষ্টিতে ধরে ফেলেছিলেন অর্ধ-অনাবৃতার বাহুমূল! না, না, কামপরবশ হয়ে নয়, তবে হ্যাঁ, উত্তেজনায়.! ওঁর মনে পড়ে গেছিল মাতা আম্রপালীর কথা!
হ্যাঁ! রূপোপজীবিনী রাজনটী আম্রপালী নয়, বৌদ্ধ ভিক্ষুণী : ‘মাতা’ আম্রপালী!
.
আম্রপালী! তাঁর জন্ম নিয়ে নানান কিংবদন্তী। বিনয় পিটক অনুসারে তিনি স্বয়ম্ভু, অযোনিসম্ভবা! বৈশালী নগরী তখন লিচ্ছবীদের রাজধানী। সেই নগরীপ্রান্তে এক আম্রকাননে পূর্ণযৌবনারূপে আম্রপালীর আবির্ভাব। সকলকলাপারঙ্গমা এই উর্বশীবিনিন্দিতাকে মহিষী করার জন্য একযোগে লিচ্ছবীরাজের কাছে আবেদন করলেন প্রতিবেশী রাজন্যবর্গ। সকলেই মহাক্ষত্রপ : ক্রৌঞ্চ, শাক্য, মগধ, পাঞ্চাল। অযুত পাণিপ্রার্থীর ভিতর মাত্র একজনকেই সন্তুষ্ট করা সম্ভব–মগধ ব্যতিরেকে, কারণ মগধরাজ বিম্বিসার লিচ্ছবিদের শত্রু–কিন্তু বাদবাকি সবাই যে তাহলে অসন্তুষ্ট হয়ে যাবে। লিচ্ছবি মহারাজ তখন ‘গণ’-এর শরণ নিলেন। গণ হচ্ছে ‘সিটি কাউন্সেল’–নগর প্রধানদের পঞ্চায়েত।
গণ নির্দেশ দিলেন : আম্রপালী হবে জনপদকল্যাণী, শত্রু ভিন্ন সর্বজনভোগ্যা!
আম্রপালী হল স্বৈরিণী, রাজনটী।
নগরীর রাজপুরুষ, শ্রেষ্ঠী তো বটেই বিদেশী ক্রৌঞ্চ, শাক্য, পাঞ্চালের সওদাগরেরাও অর্থমূল্যে এই নাগরীর শয্যাসঙ্গী হবার সৌভাগ্যলাভ করল। এমনকি লিচ্ছবি প্রহরীদের চোখে ধূলো দিয়ে ছদ্মবেশে স্বয়ং মগধরাজ বিম্বিসারও গঙ্গা পার হয়ে রাত্রিবাস করে যেতেন ঐ পণ্যাঙ্গনার প্রমোদভবনে।
ভাগ্যের এমনই বিড়ম্বনা–ঐ শত্রুরাজ বিম্বিসারের ঔরসেই গর্ভবতী হল আম্রপালী!
পুত্রের নাম জীবক। কিন্তু লিচ্ছবীরাজের আদেশে তার চূড়াকরণ হল না, বিদ্যারম্ভ হল না। মাতার কাছে সর্ববিদ্যা অধ্যয়ন করতে থাকে জীবক, পরবর্তীকালের শ্রেষ্ঠ ভেষগাচার্য!
আমাদের কাহিনীর কালে আর্যাবতের শ্রেষ্ঠ মানুষ শাক্যসিংহ। তিনি তখন পরিব্রাজক। কিন্তু রাজচক্রবর্তী মগধাধিপতি বিম্বিসার। জাহ্নবীর দক্ষিণপাড়ে পাটলীপুত্র, উত্তরে বৈশালী।
