বলেই চিৎকার :
ওরে ভূষণ, শিগগির মাস্টারমশাইদের জন্য ভালো করে জলখাবার নিয়ে আয়। ওঁরা অনেক খেটেখুটে এসেছেন।–বলে নিজেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠে গেলেন ভেতরে।
হেডমাস্টারের ঘাম দিয়ে জ্বল ছাড়ল।
বাঁচালে বিমল, যা ঝামেলায় ফেলে দিয়েছিলেন খাঁড়ামশাই।
বিমলবাবু আস্তে-আস্তে মাথা নাড়লেন।
না স্যার, উনি আমাদেরও চোখ খুলে দিয়েছেন। আজ বুঝতে পারছি, এতগুলো ডিগ্রি পেয়েও নিজের দেশকে আমরা কিছুই চিনিনি। সব আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
গজকেষ্টবাবুর হাসি
আমাদের পাড়ার গজকেষ্টবাবুকে নিয়ে ভারি মুশকিলেই পড়া গেছে।
ব্যাপারটা আর কিছুই নয়–ভদ্রলোক হাসতে ভালোবাসেন। আর সে-হাসি সাংঘাতিক।
কথাটা বোধ হয় বুঝতে পারছ না? ভাবছ, হাসতে ভালোবাসেন তাতে আর ক্ষতিটা কী!
সাংঘাতিক হাসেন, তাতেই বা কী আসে যায়? বরং ভয়ঙ্কর গোমড়ামুখো লোকের চাইতে হো-হো-হা-হা, করে হাসিয়ে লোক তো ঢের ভালো।
হুঁ-হুঁ, মোটেই তা নয়। গজকেষ্টবাবু তো শুধু হাসেনই না–একবার যদি তাঁর হাসি পায়, তা হলে তিনি মারাত্মক হয়ে ওঠেন। তখন আ-পাশের লোককে তিনি কাঁদিয়ে ছাড়েন। তাই যক্ষুনি তিনি সবার জন্য হাঁ করেন, তক্ষুনি আমরা বাপ-রে-মা-রে বলে যে যেদিকে পারি ছুটে পালাই।
তা হলে আর-একটু খুলেই বলি।
এই তো সেদিন আমাদের পটলডাঙার নকুড়বাবু কাঁধে একটা মস্ত চালকুমড়ো নিয়ে যাচ্ছেন। নকুড়বাবুর মাথা জোড়া চকচকে টাক–একটি চুল পর্যন্ত কোথাও নেই। তাই, দেখে হাবুল সেন আমাকে বলছিল, মজাটা দ্যাখছস প্যালা? নকুড়বাবুর মাথা আর চালকুমড়াটা দ্যাখতে ঠিক একইরকম! মনে হইতাছে, নকুড়বাবুর কান্ধের উপর দুইটা মাথা উঠছে।
ব্যস আর যায় কোথায়!
পাশ দিয়ে গজকেষ্টবাবু যাচ্ছিলেন। হাবলার কথা শুনেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। আকাশ-জোড়া হাঁ করে ত্রিশটা দাঁত (মানে, দুটো পড়ে গেছে) বার করে হাউহাউ শব্দে হাসতে-হাসতে হঠাৎ জাপটে ধরলেন হাবুলকে। তারপরেই হাবুলের কাঁধের উপরে খ্যাঁক করে এক কামড়!
–খাইছে–খাইয়া ফেলছে কম্মো সারছে বলে তো হাবুলের তারস্বরে চিৎকার।
আমরা সকলে মিলে ছাড়াতে গেলুম কিন্তু ছাড়ানো কি সোজা! অনেক কষ্টে হাবুলকে বের করে আনা গেল, কিন্তু তার মধ্যেই গজকেষ্টবাবু ঘ্যাঁচ করে আমার বাঁ কানটা কামড়ে দিলেন আর ক্যাবলাকে দিলেন একটা ঘুষি বসিয়ে।
মানে, হাসি পেলে ওঁর আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। হাসির সঙ্গে সঙ্গে যাকে সামনে পান আঁচড়ে কামড়ে, কিল-ঘুষি মেরে অস্থির করে তোলেন।
গত বছরের ব্যাপারটাই শোনো। সরস্বতীপুজোর সময় মাইকে বাজানোর জন্যে কতগুলো গ্রামোফোন রেকর্ড আনা হয়েছে। তাই থেকে সবে একটা হাসির গান বাজাতে শুরু করেছে আমাদের টেনিদা, আর তৎক্ষণাৎ
বাজারের ভেতরে তাড়া খেয়ে গোরু যেমন করে দৌড়তে থাকে তেমনিভাবে ছুটতে-ছুটতে–একে ধাক্কা দিয়ে, তাকে মাড়িয়ে–গজকেষ্টবাবু এসে হাজির। তাই দেখে রেকর্ড-ফেকৰ্ড ফেলে টেনিদা তো এক লাফে উধাও। তখন গজকেষ্টবাবু করলেন কি হাসতে-হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগলেন, তারপর উঠে একসঙ্গে খান বারো রেকর্ডই তুলে নিয়ে মারলেন এক আছাড়! আর দেখতে হল না বারোখানা রেকর্ডেরই বারোটা বেজে গেল! তা হলেই বোঝো, কী ভয়ঙ্কর ওঁর হাসি।
এমনিতে কিন্তু খাসা মানুষ। পুজোর চাঁদা চাই? আচ্ছা, তক্ষুনি দিলেন পঞ্চাশটা টাকা। পাড়ার কারও আপদ-বিপদ হলে গজকেষ্টবাবুর অমনি সেখানে হাজির। কোনও বাড়ির রুগীকে রাত দুটোর সময় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে? গজকেষ্টবাবু নিজের মোটর-গাড়ি নিয়ে তক্ষুনি চলে আসবেন। এমন লোকের ওপর তো রাগও করা যায় না।
ওঁর মোটর-গাড়ির কথাই ধরো না। বললেই তোমাকে গাড়িতে চাপাবেন, যেখানে যেতে চাও পৌঁছে দেবেন। কিন্তু গাড়ি চালাতে চালাতে যদি ওঁর হাসি পায় আর দেখতে হবে না। তখন তুমি পৈতৃক প্রাণটা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে কি না সন্দেহ। এই তো দুমাস আগে আমি আর আমার পিসতুতো ভাই ফুচুদা মেট্রো সিনেমা থেকে বায়োস্কোপ দেখে বেরিয়ে ট্রামের জন্য দাঁড়িয়ে আছি–গজকেষ্টবাবু এসে ঘস করে আমাদের দেখে গাড়ি থামালেন।
বাড়ি ফিরবে বুঝি?
আমরা বললুম, আজ্ঞে হ্যাঁ
-তাহলে উঠে পড়ো গাড়িতে।
আমরা দারুণ খুশি হয়ে উঠেছি ওঁর গাড়িতে। দিব্যি মজাসে যাচ্ছি, হঠাৎ ফুচুদাই গোলমাল করে ফেলল। সিনেমার-শোনা একটা হাসির গান বিচ্ছিরি বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল–
এক ছিল শৌখিন ব্যাং
সরু-সরু মোজাপরা ঠ্যাং
সাবান মাখত আর গাইত পুকুরঘাটে বসে
ট্রালা-লা-লা-লা-লা-লা-গ্যাঁ
আমি আঁতকে উঠে ফুচুদাকে বলতে গেছি–আরে করছ কী–সর্বনাশ হয়ে যাবে, কিন্তু তার আগেই যা হওয়ার হয়ে গেছে। বিকট আওয়াজ করে হেসে উঠেছেন গজকেষ্টবাবু। এক প্যাকেট মাখন আর দুটো পাউরুটি কিনেছিলেন, সেগুলো ছুঁড়ে দিয়েছেন রাস্তায়, একজন দাড়িওলা ভদ্রলোকের মুখে গিয়ে লেগেছে মাখনের প্যাকেট–দাড়িতে মাখন মাখামাখি, রুটির ঘা খেয়ে একজন ওড়িয়া চাকর বাপো-বাপ্পো বলে চেঁচিয়ে উঠছে আর
আর মোটরগাড়ির স্টিয়ারিং ছেড়ে দিয়ে পা দুটো সামনের উইণ্ড-স্ক্রিনে তুলে দিয়ে দুহাত ছুঁড়ে গজকেষ্টবাবু হাসছেন হা-হা-হা-হা-হা-হাউ
সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা গিয়ে ধাক্কা মেরেছে সামনের ল্যাম্পপোস্টে। ভাগ্যিস আস্তে যাচ্ছিল গাড়ি, তাই মাথায়-পেটে বেদম ঝাঁকুনি খেয়েই আমরা এ যাত্রা পার পেয়ে গেলুম। স্পিডে চললে আর দেখতে হত নাব্যাস, ওইখানেই খেলা খতম। একদম হালুয়া হয়ে যেতুম আমরা।
