কালো পর্দার ওপার থেকে মোটা গলায় হাঁক আসে। ফতে সিং কিংবা ডালকুত্তা আওয়াজে বোঝা যায় না।
রুটি-মাংস। চার জনের!
কানা সাজিয়ে দেয়। পরিবেশন করতে যায় ছেলেটা। আর তখনই ব্যাপারটা ঘটে যায়।
কী-একটা গেলাস-টেলাস উলটে পড়ল মনে হয়। তারপেরই শোনা যায় জঘন্য একটা গালাগাল। বাচ্চাটা ছিটকে সরে আসে, কালো পর্দার ভেতর থেকে জুতোপরা প্রকান্ড একটা লোক বেরিয়ে নিদারুণ লাথি বসায় ছেলেটার পেটে। হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে সে, তার হাত থেকে এক থালা রুটি-মাংস ছড়িয়ে যায় ঘরময়।
আতঙ্কে শক্ত হয়ে যায় কানা, হুড়মুড় করে লাফিয়ে ওঠে কানাইল সিং। গালাগালির ঢেউ উঠতে থাকে পর্দাটার ওপার থেকে।
টেবিলে থালা বসাতে গিয়ে একটা গেলাস উলটে দিয়েছিল ছেলেটা। খানিক মদ টলে পড়েছে ডালকুত্তার গায়ে।
মাংসের ঝোলে মাখামাখি হয়ে উঠে বসে ছেলেটা—ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। হাতজোড় করে কসুরের মাপ চায় কার্নাইল সিং, তটস্থ হয়ে ছোটে নিজের হাতে পরিবেশন করতে।
চোখের জল মুছতে মুছতে ছেলেটা মেঝে সাফ করতে বসে যায়।
কানা দেখে। মনে মনে খুশি হওয়া উচিত ছিল তার, কিন্তু খুশি হতে পারে না। স্মৃতিতে তার যন্ত্রণা চমকায়। তাকেও যেন কে অমনি করে লাথি মেরেছিল একবার, খাবার দিতে দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে। একটা চোখ মেলে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে সে, যেন নিজের সেদিনকার মুখটার ছায়া দেখতে পায় সেখানে।
খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে আসে লোকগুলো। পয়সা মিটিয়ে দেয় কার্নাইল সিংকে। কানাইল সিং হাসে। খাতির করে কিছু বলতে যায়, কিন্তু আলাপ জমে না। অন্ধকার চেহারা নিয়ে শুকনো গলায় কী বলে তারা আবার বেরিয়ে যেতে থাকে রাস্তার দিকে।
বাচ্চাটা পথ ছেড়ে ভয়ে সরে দাঁড়ায়। হঠাৎ কী ভেবে দাঁড়িয়ে পড়ে ডালকুত্তা। বাচ্চাটাকে
ডাকে, এই শুনো, ইধার আও।
বাচ্চাটা নড়ে না।
ইধার আও, ডবরা মত। পকেট থেকে একটা আধুলি বের করে ডালকুত্তা, লো!
ছেলেটা তেমনি দাঁড়িয়ে থাকে।
লো লো, বকশিশ লো।
একভাবে ছেলেটা ঘাড় গুঁজে থাকে, এক পাও নড়ে না।
আধবোজা চোখ দুটো খানিক খুলে যায় ডালকুত্তার। সাপের মতো চাউনি লিকলিক করে ওঠে। চেচক-এর চিহ্নে ভরা প্রকান্ড মুখটাকে ভয়ংকর দেখায়।
গোসসা হো গয়া শালে কো? আধুলিটা ছেলেটার মুখের ওপর সজোরে ছুড়ে দেয় ডালকুত্তা। ছেলেটা যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠে। হা-হা করে হেসে চার জন লাফিয়ে বসে জিপে। স্টার্ট নেয় গাড়িটা, এগিয়ে যায় কলকাতার দিকে। এক বার চেয়ে দেখেই আবার কাগজটা পড়তে থাকে কানাইল সিং।
ছেলেটা দেখে না, আর কেউ দেখে না, কানা দেখে। আধুলিটা গড়িয়ে গিয়ে পড়ে নর্দমার ভিতরে।
সময় যায়, বেলা বাড়ে, খরিদ্দার আসে। একটু আগেকার সব দুঃখ ভুলে গিয়ে ছেলেটা পরিবেশন করে। গরিবের ছেলের ওসব মনে রাখলে চলে না।
কানাকে যে লাথি মেরেছিল সে বলেছিল, কাঁদছিস কেন শুয়োরের বাচ্চা। হাস, হাস বলছি, নেহি তো ফিন এক লাথসে তুমকো…
হাসতে হয়েছিল কানাকে। আর মজা দেখে মুচকে মুচকে হাসছিল হোটেলের মালিক। সেও চাবুক দিয়ে পিটতে ভালোবাসত কানাকে।
এক ফাঁকে দোকানের চাপ একটু কমে গেলে ছেলেটা এসে দাঁড়ায় কানার পাশে। ফিসফিস করে বলে, চাচা!
কেয়া?
উ তোক খুন কিয়া।
কেয়া?
হ্যাঁ, তাই। পর্দার বাইরে থেকে শুনেছে বাচ্চাটা। ওরা এবার পাঞ্জাবে পালিয়ে যাবে। জমানা খারাপ। মালিকের আর হাতযশ নেই আগেকার মতো।
কানার ঠোঁটের ওপর দাঁতের চাপ পড়ে। পাঞ্জাব! হঠাৎ কানার মনে পড়ে যায়, তার মা ও যেন কার সঙ্গে পাঞ্জাব পালিয়ে গিয়েছিল।
তীব্র গলায় কানা বলে, যাক, মরুক গে! ডাকু সব!
চাচা! বাচ্চাটা আবার ডাকে।
কেয়া?
উ লোগ মুঝে এক আধুলি দিয়া থা, কিধার গিয়া দেখা তুম?
কানা দেখেছে, ওই নালার ভেতর। জানে হাত দিলেই পাওয়া যাবে ওখানটায়।
একটু চুপ করে থাকে, তারপর জবাব দেয়, না, দেখিনি। যেতে দে বদমায়েশের পয়সা, আমি তোকে আধুলি দেব একটা।
ছেলেটা বিশ্বাস করতে পারে না। চাচার এমন দয়া এর আগে সে আর কখনো দেখেনি।
তুম?
হ্যাঁ আমিই দেব। বিশ্বাস করছিস না কেন?
ছেলেটার চোখ-মুখ খুশিতে ভরে যায়। বাচ্চা রামছাগলের মতো লাফাতে লাফাতে চলে যায় বাইরে। একটা ঘুড়ি কেটে পড়েছে কাছাকাছি, ছোটে তারই দিকে। ওরা কত সহজে ভুলে যায়।
সামনে আকাশটা নীল। গাড়ি ছুটছে একটার পর একটা। সব হাওয়া বদলে চলল। কিন্তু ওই নীলের দিকে তাকিয়ে আর মন খারাপ হয় না কানা সিংয়ের। হির-রনঝার গান ভেসে ওঠে না কোথাও। কেন যেন খুশি লাগে তার, বাচ্চা ছেলেটাকে একটা আধুলি দেবার কথা ভাবতে ভালো লাগে। কোথায় যেন একটা হাওয়া বদল হয়ে যাচ্ছে টের পায় সে।
ইজ্জত
সমুদ্র অনেক দূরে। সেখানে ঝড়, সেখানে সাইক্লোন, আর এখানে এই এক টুকরো গ্রাম যেন প্রবালদ্বীপ। এর চারদিকে সহজ অশিক্ষা আর অজ্ঞতার শান্তি একটা স্তব্ধ লেগুনের মতো প্রবাল-বলয় দিয়ে ঘেরা।
উপমাটা দিয়েছিল গ্রামের ডাক্তার এবং আশপাশের চারখানা গ্রামের মধ্যে একমাত্র এলএমএফ ডাক্তার জয়নুদ্দিন মিয়ার ছেলে মইনুদ্দিন। সে তখন কলকাতার কলেজে বিএ পড়ত। তারপর সাত-আট বছর পার হয়ে গেছে। সে এখন দূরের মফস্বল শহরের উঠতি উকিল, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মেম্বার, একজন নামজাদা নেতা। শান্ত স্তব্ধ লেগুনের চাইতে মাতাল সমুদ্রের গর্জনই তার ভালো লাগে বেশি।
