বললাম, এবার আমাকে বিদায় দিন তা হলে
রাজবাহাদুর সবে চতুর্থ পেগে চুমুক দিয়েছেন তখন। তেমনি অসুস্থ আর রক্তাভ চোখে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, আপনি যেতে চান?
–হ্যাঁ, কাজকর্ম রয়েছে—
—কিন্তু আমার শিকার আপনাকে দেখাতে পারলাম না।
—সে না হয় আর একবার হবে।
—হুমা চাপা ঠোঁটের ভেতরেই একটা গম্ভীর আওয়াজ করলেন রাজাবাহাদুর আপনি ভাবছেন আমার ওই রাইফেলগুলো, দেওয়ালে ওই সব শিকারের নমুনা—ওগুলো সব ফার্স?
আমি সন্ত্রস্ত হয়ে বললাম, না, না, তা কেন ভাবতে যাব! শিকার তো খানিকটা অদৃষ্টের ব্যাপার–
—হুম! অদৃষ্টকেও বদলানো চলে রাজাবাহাদুর উঠে পড়লেন আমার সঙ্গে আসুন।
দুজনে বেরিয়ে এলাম রাজাবাহাদুর আমাকে নিয়ে এলেন হান্টিং বাংলোর পেছন দিকটাতো ঠিক সেখানে—যার চারশো ফুট নিচে টেরাইয়ের অন্যতম হিংস্র অরণ্য বিস্তীর্ণ হয়ে আছে।
এখানে আসতে আর একটা নতুন জিনিস চোখে পড়ল দেখি কাঠের একটা রেলিং দেওয়া সাঁকোর মতন জিনিস সেই সীমাহীন শূন্যতার ওপরে প্রায় পনেরো মোল হাত প্রসারিত হয়ে আছে। তার পাশে দুটো বড় বড় কাঠের চাকা, তাদের সঙ্গে দুজোড়া মোটা কাছি জড়ানো। ব্যাপারটা কী ঠিক বুঝতে পারলাম না।
—আসুন। রাজবাহাদুর সেই ঝুলন্ত সাঁকোটার ওপরে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমিও গেলাম তাঁর পেছনে পেছনে একটা আশ্চর্য বন্দোবস্ত। ঠিক সাঁকোটার নিচেই পাহাড়ী নদীটার রেখা, নুড়ি মেশানো সঙ্কীর্ণ বালুতট তার দুপাশে, তাছাড়া জঙ্গল আর জঙ্গল। নিচে তাকাতে আমার মাথা ঘুরে উঠল। রাজবাহাদুর বললেন, জানেন এসব কী?
–না।
আমার মাছ ধরবার বন্দোবস্ত। এর কাজ খুব গোপনে নানা হাঙ্গামা আছে। কিন্তু অব্যর্থ।
—ঠিক বুঝতে পারছি না।
—আজ রাত্রেই বুঝতে পারবেন। শিকার দেখাতে আপনাকে ডেকে এনেছি, নতুন একটা শিকার দেখাব কিন্তু কোনোদিন এর কথা কারো কাছে প্রকাশ করতে পারবেন না।
কিছু না বুঝেই মাথা নাড়লাম–না।
–তা হলে আজ রাতটা অবধি থাকুন। কাল সকালেই আপনার গাড়ীর ব্যবস্থা করব। রাজবাহাদুর আবার হান্টিং বাংলোর সম্মুখের দিকে এগোলেন কাল সকালের পর এমনিতেই আপনার আর এখানে থাকা চলবে না।
একটা কাঠের সাঁকো, দুটো কপিকলের মতো জিনিস। মাছ ধরার ব্যবস্থা কাউকে বলা যাবে এবং কাল সকালেই চলে যেতে হবে সবটা মিলিয়ে যেন রহস্যের খাসমহল একেবারে আমার কেমন এলোমেলো লাগতে লাগল সমস্ত। কিন্তু ভালো করে জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। রাজাবাহাদুরকে বেশি প্রশ্ন করতে কেমন অস্বস্তি লাগে আমার অনধিকার-চর্চা মনে হয়।
বাংলোর সামনে তিন চারটে ছোট ছোট নোংরা ছেলেমেয়ে খেলা করে বেড়াচ্ছে, হিন্দুস্থানী কীপারটার বেওয়ারিশ সম্পত্তি। কীপারটাকে সকালে রাজাবাহাদুর শহরে পাঠিয়েছেন, কিছু দরকারী জিনিসপত্র কিনে কাল সে ফিরবো ভারী বিশ্বাসী আর অনুগত লোক। মাতৃহীন ছেলেমেয়েগুলো সারাদিন হুটোপাটি করে ডাকবাংলোর সামনে রাজবাহাদুর বেশ অনুগ্রহের চোখে দেখেন ওদের। দোতলার জানলা থেকে পয়সা, রুটি কিংবা বিস্কুট ছুঁড়ে দেন, নিচে ওরা সেগুলো নিয়ে কুকুরের মতো লোফালুফি করে। রাজাবাহাদুর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন সকৌতুকে।
আজও ছেলেমেয়েগুলো হুল্লোড় করে তাঁর চারিপাশে এসে ঘিরে দাঁড়ালো। বললে হুজুর, সেলাম। রাজবাহাদুর পকেটে হাত দিয়ে কতকগুলো পয়সা ছড়িয়ে দিলেন ওদের ভিতরে হরির লুঠের মতো কাড়াকাড়ি পড়ে গেল।
বেশ ছেলেমেয়েগুলি। দুই থেকে আট বছর পর্যন্ত বয়েস আমার ভারী ভালো লাগে ওদের। আরণ্যক জগতের শাল শিশুদের মতো সতেজ আর জীবন্ত প্রকৃতির ভেতর থেকে প্রাণ আহরণ করে যেন বড় হয়ে উঠেছে।
সন্ধ্যায় ডিনার টেবিলে বসে আমি বললাম, আজ রাত্রে মাছ ধরবার কথা আছে আপনার।
চোখের কোনা দিয়ে আমার দিকে তাকালেন রাজবাহাদুরা লক্ষ্য করেছি আজ সমস্ত দিন বড় বেশি মদ খাচ্ছেন আর ক্রমাগত চুরুট টেনে চলেছেনা ভালো করে আমার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলেন নি। ভেতরে ভেতরে কিছু একটা ঘটে চলেছে তাঁর।
রাজবাহাদুর সংক্ষেপে বললেন—হুম।
আমি সসংকোচে জিজ্ঞাসা করলাম, কখন হবে?
একমুখ ম্যানিলা চুরুটের ধোঁয়া ছড়িয়ে তিনি জবাব দিলেন—সময় হলে ডেকে পাঠাবা এখন আপনি গিয়ে শুয়ে পড়ুন। স্বচ্ছন্দে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিতে পারেন।
শেষ কথাটা পরিষ্কার আদেশের মতো শোনালো। বুঝলাম আমি বেশিক্ষণ আর তাঁর সঙ্গে কথা বলি এ তিনি চান না। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে বলাটা অতিথিপরায়ণ গৃহস্থের অনুনয় নয়, রাজার নির্দেশ এবং সে নির্দেশ পালন করতে বিলম্ব না করাই ভালো।
কিন্তু অতি নরম জাজিমের বিছানায় শুয়েও ঘুম আসছে না। মাথার ভিতর আবর্তিত হচ্ছে অসংলগ্ন চিন্তা। মাছ ধরা, কাঠের সাঁকো, কপিকল, অত্যন্ত গোপনীয়! অতল রহস্য!
তারপর এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যে চৈতন্য আচ্ছন্ন হয়ে এল তা আমি নিজেই টের পাইনি।
মুখের ওপর ঝাঁঝালো একটা টর্চের আলো পড়তে আমি ধড়মড় করে উঠে পড়লাম। রাত তখন কটা ঠিক জানি না আরণ্যক পরিবেশে নির্জনতা আবির্ভূতা বাহিরে শুধু তীব্রকণ্ঠ ঝিঝির ডাক।
আমার গায়ে বরফের মতো ঠাণ্ডা একটা হাত পড়েছে কার। সে হাতের স্পর্শে পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিউরে গেল আমার। রাজাবাহাদুর বললেন—সময় হয়েছে, চলুন।
