তাই যতদিন আদিম অবিভক্ত সমাজ, ততদিন পৰ্যন্ত ইন্দ্ৰজাল বন্ধ্যা নয়, মিথ্যা নয়, মূখীতা নয়। তার বাস্তব মূল্যও অনেকখানি, অনেকখানি তার অবদান বাস্তব সাফল্যের পথে। তারপর সেই আদিম সাম্যাবস্থা-বিচ্যুতিএই বিচ্যুতির মধ্যেই ইন্দ্ৰজালের মৃত্যু : অবিভক্ত সমাজে ইন্দ্ৰজাল যে বাস্তব সাফল্যের সহায় ছিল, বিভক্ত সমাজে আর তা রইল না। মানুষের জীবনে দেখা দিল অনিশ্চিত আর অসহায় ভাব। তাকে অবলম্বন করেই জন্ম হল ধর্মের।
ইন্দ্ৰজাল থেকে ধর্ম : কোনো কল্পিত আদিম দার্শনিকের আকস্মিক আবিষ্কার নয়, সামাজিক পরিবর্তনেরই প্ৰতিচ্ছবি।
০৫. ধৰ্ম আর ভাববাদ
ধৰ্ম আর ভাববাদ। ধর্মেরই মার্জিত আর সংস্কৃত সংস্করণ অধিবিদ্যা, ভাববাদের চুড়ান্ত অসম্ভব থেকে যার মুক্তি নেই। তাই, যে-অর্থে ইন্দ্ৰজাল ছেড়ে ধর্মের আওতায় এসে পড়া, সেই অর্থে ধর্ম ছেড়ে অধিবিদ্যা আর ভাববাদের আওতায় এসে পড়া কোনদিনই নয়। বরং ইতিহাস-বিচারে চোখে পড়ে ধর্মের সঙ্গে অধিবিদ্যার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তাই! কেবল, ধর্মের বেলায় দরবারটা আবেগ আর কল্পনার কাছেই বেশি, অধিবিদ্যার বেলায় বিশুদ্ধ বুদ্ধির দাবিদাওয়ার কাছে। তবু মূলের কথাটা একই কথা। সে-কথা মেহনতের কথা নয়, প্ৰকৃতির সঙ্গে সংগ্রামের কথা নয়, প্ৰকৃতিকে চেনবার,–আর চেনবার ভিত্তিতে জয় করবার,–কথা নয়। প্রয়োগ-জীবন নয়। তার বদলে বিশুদ্ধ চেতনার দাবি। মেহনতের সঙ্গে লেশসম্পর্কহীন চেতনা। তারই বিকাশ ধর্মে, আবার ধর্মেরই বিশুদ্ধ সংস্করণ অধিবিদ্যায়।
আসলে, এই দুনিয়ায় বিপর্যয়ের যেন অন্ত নেই। বিরাট আর বিপুল প্ৰকৃতির যে শক্তি, তারই মুখোমুখি হয়েছে মানুষ। তাই, বিপর্যয়ের পর যেন বিপর্যয়ের ঢেউ। এই বিপৰ্যয়কে জয় করবার পথ রয়েছে দুটো। এক হলো প্ৰকৃতিকে জয় করা, আর এক হলো বিপৰ্যায়-বোধকে জয় করা। এক হলো বিজ্ঞান, যার স্থূল আর অচেতন অভিব্যক্তি ইন্দ্ৰজালের মধ্যে। আর এক হলো ধর্ম, যার সংস্কৃত আর মার্জিত অভিব্যক্তি অধিবিদ্যার মধ্যে।
প্ৰাকৃতিকে জয় করবার পথ, সংগ্রামের পথ–প্ৰয়োগের পথ। অব্যক্ত আর অচেতন ভাবে হলেও, স্থূল আর প্রায় সাহিজিক বৃত্তির বিকাশ হিসেবে হলেও, এই পথটাই ছিল ইন্দ্ৰজালের পথ। আবার এই পথটাই আধুনিক বিজ্ঞানের পথও। বিজ্ঞানের ঐশ্বৰ্য অনেক বেশি, ইন্দ্ৰজালের মতো বিজ্ঞান অচেতন আর অব্যক্ত নয়, নয়। প্ৰায় সাহিজিক বৃত্তির বিকাশমাত্র। ইন্দ্ৰজালের মধ্যে অনেকখানি জায়গা জুড়ে রয়েছে ইচ্ছাপূরণ; কল্পনা আর ভ্রান্তি। তাই আধুনিক বিজ্ঞান ইন্দ্ৰজালের পুনরুক্তিমাত্র নয়। বিজ্ঞানকে খাটো করবার, খেলো করবার, তুচ্ছ করবার তাগিদ ছাড়া আর কোনো তাগিদে নিশ্চয়ই বিজ্ঞানকে ইন্দ্ৰজালের পুনরুক্তি-মাত্র বলবার প্রশ্ন ওঠে না। আসলে ইন্দ্ৰজালের মধ্যে যেটা সংকীর্ণতা,–যেটা ইচ্ছাপূরণ,–তার দায়ভাগ বিজ্ঞানের নয়, ধর্মেরই। তবু ইন্দ্ৰজালের অন্য দিকটার কথা ভুললেও চলবে না। সেটা হলো প্রয়োগজীবনের দিক : কল্পিত দেবতার পায়ে মাথা কোটা নয়, প্রার্থনা দিয়ে মন গলাবার চেষ্টা করা নয়, তার বদলে প্ৰকৃতিকে জয় করা। আদিম মানুষের কাছে মেহনত আর জীবন প্ৰায় সমব্যাপ্ত : এত স্থূল আর এমন ভোঁতা। তার হাতিয়ার যে, সেই হাতিয়ারের নির্ভারে প্রত্যেকের পক্ষেই প্ৰাণপাত মেহনত না করলে বাঁচবার আর কোনো উপায়ই নেই। তাই, চেতনা যেটুকু, তা মেহনতেরই অপর পিঠ। চেতনায়-মোহনতে মিলে এক অখণ্ডতা। মেহনত থেকেই ঠিকরে বেরিয়েছে চেতনার স্ফুলিঙ্গ, আবার চেতনার এই স্ফুলিঙ্গই প্রেরণা জুগিয়েছে মেহনন্তের। তবু হাতিয়ারটা নেহাতই স্থূল, নেহাতই অনুন্নত। তাই তার অনুরূপ মেহনতও নেহাতই নিচু স্তরের। ফলে তার উলটো পিঠেই যে চেতনা, সেই চেতনাও। তার মধ্যে চোদ্দ আনাই ইচ্ছাপূরণ, কল্পনা, ভ্ৰান্তি। তবুও, ভ্ৰাস্তি দিয়ে ভরা হলেও, চোব্দ আনা ইচ্ছাপূরণ হলেও, মেহনতকে প্রেরণা জোগাতে পেরেছে। তার কারণ তখনকার সেই সাম্যজীবন;- যখন সবাই মিলে দল বেঁধে নাচছে, আর সবাইকার চোখের সামনে দুলছে কামনা সফল হবার ছবি, তখন সবকিছুই অনেকখানি অন্য রকম। তখন দল বেঁধে শিকার করতে বেরিয়ে বাস্তবিকই শিকার সংগ্ৰহ করতে পারা অনেক বেশি সহজ, অনেক বেশি সম্ভব। জীবনের তাগিদ, মেহনতের তাগিদ,
প্ৰয়োগের তাগিদ-ইন্দ্ৰজালের মধ্যে এই যে তাগিদ-এরই উত্তরাধিকার আধুনিক বিজ্ঞানের। ইন্দ্ৰজালের ইচ্ছাপূরণটুকুর উত্তরাধিকার নয়; কেননা সেই দৈন্তের ভিত্তি নয়, স্থূল আর প্রায় অকৰ্মণ্য হাতিয়ারের ভিত্তি নয়। প্রয়োগের তাগিদ হলেও, একটা মস্ত তফাত রয়েছে। আদিম মানুষের ইন্দ্ৰজালের পিছনে এই যে প্রয়োগের তাগিদ, এ-তাগিদ প্ৰায় স্বতঃস্ফুর্তভাবে এসেছে তার সমাজের গড়নটা থেকে। সাম্যজীবন, দারিদ্র্যের তাগিদে হলেও সাম্যজীবন। তাই মেহনতের দায় সবাইকার উপরই, মেহনত আর জীবন প্ৰায় সমব্যাপ্ত। অথচ, আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সামাজিক মেহনতের এই প্রেরণা নেই। কেননা আধুনিক সমাজ হলো শ্রেণীবিভক্ত সমাজ, এ-সমাজের সদর মহলে মিসমার হয়ে গিয়েছে মেহনতের মৰ্যাদা। অবশ্য, মধ্যযুগের শৃঙ্খল ভেঙে যখন আধুনিক যুগের শুরু, জনগণ তখন এগিয়ে এসেছে সমাজের সদর মহলে, শোনা গিয়েছে মুক্তির বাণী; সমগ্ৰ মানবতার মুক্তি। সামাজিক মেহনতের প্রেরণায় দীপ্ত হয়ে উঠেছে বিজ্ঞান, ধর্মমোহের সঙ্গে দুর্বার তার সংগ্রাম। কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যেই একটা প্ৰকাণ্ড ফাকি লুকোনো ছিল। সমগ্ৰ মানবতার স্বাৰ্থ নিয়ে অত কথার পিছনে প্রচ্ছন্ন ছিল শুধু একটি বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থ। সে-শ্রেণীর নাম দেওয়া হয় বুর্জোয়া শ্রেণী। এই শ্রেণীর স্বাৰ্থ যতই প্ৰকট হয়ে পড়তে লাগল, ততই দেখা গেল, সমাজের সদরমহলে জনগণের ঠাই আর হচ্ছে না। বিজ্ঞানের পিছন থেকে বাদ পড়তে লাগল সামাজিক মেহনন্তের প্রেরণা ৷ অথচ, প্রয়োগকে বাদ দিয়ে বিজ্ঞানের পক্ষে বাঁচাই সম্ভব নয়, বিজ্ঞান একান্তভাবেই প্রয়োগনির্ভর। সামাজিক মেহনত থেকে বিচ্যুত হয়ে তাই বিজ্ঞান ক্রমশই নিজেকে গুটিয়ে নিতে লাগল। গবেষণাগারের সংকীর্ণ গণ্ডিটুকুর মধ্যে যে খণ্ড বিচ্ছিন্ন প্রয়োগ, তারই উপর নির্ভর করবার আশায়। এই প্রয়োগটুকুরও নির্ভর যদি না জুটত, তাহলে বিজ্ঞানের পক্ষে বিজ্ঞান হয়ে থাকা আর সম্ভবই হতো না। তবু এপ্রয়োগ নেহাতই খণ্ড প্রয়োগ; সাধারণ কর্মজীবনের সঙ্গে, সামাজিক মেহনতের সঙ্গে তার মুখ-দেখাদেখি কম। কোনো এক অসামান্য বৈজ্ঞানিক হয়তো গবেষণাগারের মধ্যে আবিষ্কার করলেন পরমাণুর ভিতর লুকানোশপ্ৰায় অবিশ্বাস্ত দৈত্যশক্তিকে। কিন্তু সামাজিকভাবে এই দৈত্যশক্তিকে নিয়ে কী করা হবে, তা তার জানা নেই; এই দৈত্যশক্তিকে নিয়োগ করে পাহাড় গুড়ো করে মরুভূমির বুকে নদীর স্রোত টেনে আনা যায়, যায় মরা ধুলোর রাজ্যে সুজলাসুফলা-শস্যশ্যামলা পৃথিবী গড়া। সোভিয়েট দেশে যেমনটা আজ আয়োজন। আবার এই দৈত্যশক্তিকে নিয়োগ করে এক মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ স্ত্রী-পুরুষ আর শিশুকে নির্বিচারে নিঃশেষ করা যায়। মার্কিন মুলুকে যেমনটা আজ আয়োজন। কোন পথে নিযুক্ত হবে ওই দৈত্যশক্তি? নিছক গবেষণাগারের সংকীর্ণ গণ্ডিটুকুর মধ্যে বসে এ-প্রশ্নের কোনো জবাব বৈজ্ঞানিক খুঁজে পান। না। সামাজিক মেহনত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিজ্ঞান। বৈজ্ঞানিকের সামনে তাই অনিশ্চয়তার বিরাট খাদ্য। এই খাদ পূরণ করবার আশায় বৈজ্ঞানিককে হরেক রকম অলীক কল্পনার দ্বারস্থ হতে হয়, বস্তুবাদের সঙ্গে মিশেল হয় অধ্যাত্মবাদের। সুস্থ প্রয়োপের যতটুকু ভিত্তি ততটুকুই সুস্থ বস্তুবাদ, কাজের মানুষ অনিবাৰ্যভাবেই বাস্তব পৃথিবীর মুখোমুখি। মধ্য যুগের অন্ধকার বিদীর্ণ করে যখন আধুনিক যুগের দিকে এগিয়ে আসা, তখন সামাজিক মেহনতের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল বলেই বিজ্ঞান রূপ নিতে পেরেছিল দুর্বিজয় বস্তুবাদের। তারপর বিজ্ঞান সামাজিক মেহনত থেকে যতই বিচ্ছিন্ন হয়েছে ততই তার সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত বস্তুবাদী ভিত্তিতে ফাটল দেখা গিয়েছে, দেখা গিয়েছে রকমারি অধ্যাত্মবাদ দিয়ে ফাটলগুলো পূর্ণ করবার চেষ্টা। আবার, কর্মজীবনের সুস্থ তাগিদ ছিল বলেই আদিম ইন্দ্ৰজালের ভিত্তিতেও বাস্তবাদের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। প্ৰকৃতির নিয়মকানুনকে চেনবার চেষ্টা। অবশ্যই ভুল করে চেনা। কেননা, তখনকার কর্মজীবন হলো দীন-দরিদ্র হাতিয়ারের কর্মজীবন। প্রয়োগ, কিন্তু নেহাতই নীচু স্তরের প্ৰয়োগ। আর সেই প্রয়োগ-বিছুরিত যে বস্তুবাদ, সে-বস্তুবাদও সুপ্ত, অব্যক্ত, অচেতন। যেন বস্তুবাদের স্বপ্ন, তবুও বস্তুবাদেরই স্বপ্ন-ভাববাদ নয়, অধ্যাত্মবাদ নয়, অলীক ইচ্ছাপূরণের যতখানি মিশেলাই থাকুক না কেন! সোভিয়েট দেশে সেই হারিয়ে-যাওয়া সাম্যজীবনকে নতুন করে খুঁজে পাবার আয়োজন; কিন্তু অভাবের ভিত্তিতে নয়, দারিদ্র্যের ভিত্তিতে নয়, ভোঁতা। আর স্থূল হাতিয়ারের ভিত্তিতে নয়। তাই সামাজিক মেহনতকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে পারা, কিন্তু এবার অনেক উচু স্তরে। তুলনাই হয় না, এমন উচু স্তর। আর তাই বলিষ্ঠ, সচেতন বস্তুবাদ। এই বস্তুবাদের আভাস পাওয়া গিয়েছিল আধুনিক যুগের শুরুতে। কিন্তু ওই আভাস হিসেবেই শেষ হলো তার ইতিহাস। সামাজিক মেহনতের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের পিছনে প্ৰকাণ্ড ফাকি ছিলো, তাই। তাই দর্শনের আঙিনায় আসন পাবার জন্য সে-বস্তুবাদ যখন বড় বেশি দুবিনীত হই-হল্লা করেছিল, তখন শ্রেণীসমাজের সদর মহলের সংস্কৃতি নেহাতই অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার জন্যে, খানিকটা জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু সামাজিক মেহনতের সঙ্গে সম্পর্ক যত ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগল ততই তাকে সংস্কৃত করবার নামে সর্বস্বাস্ত করে। নেবার আয়োজন, আর না-হয় তো সাক্ষাৎ-সমরে তাকে পরাভূত করে তারই শবদেহের উপর অধ্যাত্মবাদের প্ৰেত-সাধনা। ভারতীয় সংস্কৃতিতে বস্তুবাদের কথা নিয়ে পরে স্বতন্ত্র আলোচনা তুলব। আপাতত ঘুরোপীয় সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা যাক। আদিম ইন্দ্ৰজালের মধ্যে বস্তুবাদ দেখা দিয়েছিল, যদিও তা স্বপ্নের মতো অক্ষুট। ভিত্তিতে হাতিয়ারের দৈন্য, তাই অক্ষুট, তাই স্বপ্নের মতো। আধুনিক যুগের শুরুতে দেখা দিয়েছিল সুস্থ আর সচেতন বস্তুবাদের আভাস, কিন্তু সমাজ-ব্যবস্থার মূলে যে-ফাকি লুকোনো ছিল তারই চাপে এই বস্তুবাদের ইতিহাস উপক্ৰমণিকাতেই পরিসমাপ্ত হলো। সোভিয়েট সমাজে সামাজিক মেহনতের বলিষ্ঠ ভিত্তি, তাই বিজ্ঞানের ঐশ্বর্ষে দীপ্ত বস্তুবাদ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দুর্জয় হয়ে উঠেছে। বাকি থাকে গ্ৰীক যুগের কথা। দর্শনের ইতিহাসের সঙ্গে সমাজ-ইতিহাসকে মিলিয়ে দেখলেই দেখতে পাওয়া যায়, গ্ৰীক যুগে যখনই বস্তুবাদ দুৰ্জয় হয়ে উঠেছে তখনই তার সঙ্গে কর্মজীবনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক : প্ৰাচীন আয়োনীয়া শহরে তখন বণিক শ্রেণীর শাসন, পৃথিবীর সঙ্গে সংগ্রামের হাতিয়ারকে উন্নত করার উপরই তাদের সম্পদের নির্ভর, তাই এই উন্নতি-কল্পে তাদের অমন উৎসাহ, আর তাই এই শহরের আবহাওয়ায় জন্ম হলো যে-দর্শনের, সে-দর্শন বস্তুবাদী দর্শন।। থ্যালিস, এ্যানেক্সিমেণ্ডার, এ্যানেক্সিমেনিস। এদের বস্তুবাদ অবশ্যই স্থূল ধরনের বস্তুবাদ। না-হয়ে উপায়ও ছিল না। মানব-ইতিহাসে তখন সবেমাত্র বিজ্ঞানের সুচনা। তাছাড়া ও-শহরে তখন কর্মজীবনের যে-আবহাওয়া, সে-আবহাওয়ার মধ্যে চোদ্দ আনাই ফাকি, কেননা তার ভিত্তিতে শ্রেণী-স্বাৰ্থ আর শোষণই। আর তাই–সমাজের ভিত্তিতে শ্রেণীর স্বার্থের এই উর্বর জমি ছিল বলেই,– আয়োনীয় বস্তুবাদকে অমন সহজে ফেলে গ্ৰীক যুগে পাইথাগোরাস আর পারমানাইডিসের দল পারল ভাববাদী আর অধ্যাত্মবাদী দর্শনের বীজ বুনতে, সে বীজ ফলফুলে শোভিত হয়ে দেখা দিল প্লেটোর দর্শনে। প্লেটো যে কী পরিমাণে এদের কাছে ঋণী, তা নিয়ে গ্ৰীক দর্শনের ঐতিহাসিকেরা অনেক আলোচনা করেছেন। মাঝখানে বস্তুবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে চেয়েছিল এম্পিডোক্লিস্ আর বিশেষ করে ডিমোক্রিটাস-লিউসিপাসের দর্শনে। মনে রাখতে হবে, পাইথাগোরাস, পারমানাইডিস বা প্লেটোর মতো এই বস্তুবাদীরা কেউই কর্মজীবন-বিচ্যুতি রহস্যবাদের বা বিশুদ্ধ চেতনার উপাসক নন। কর্মজীবনের সঙ্গে এদের যোগাযোগটুকু স্পষ্ট, আর তাই বস্তুবাদের বেশ। এম্পিডোক্লিস স্পষ্টই স্বীকার করেন যে, তার দার্শনিক ধারণাগুলিকে তিনি সংগ্রহ করেছেন রঙমেশানো বা রুটি তৈরি করার কাজ চোখে দেখতে দেখতে। তা ছাড়াও গ্ৰীক যুগের অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সঙ্গে তার নাম সংযুক্ত হয়ে রয়েছে, যে-রকম থ্যালিসের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে আছে এঞ্জিনিয়ারিং বুৎপত্তির কথা। আর ডিমোক্রিটাস-লিউসিপাস-এর প্রধানতই ছিলেন। বৈজ্ঞানিক, বৈজ্ঞানিক বলেই প্রয়োগপরায়ণ আর তাই বস্তুবাদী। কেবল মনে রাখতে হবে, গ্ৰীক যুগের এইসব বস্তুবাদ মানব-সংস্কৃতির যত মূল্যবান ঐতিহাই হোক না কেন, এগুলি সবই দ্বিধাভিরা বস্তুবাদের নমুনা। কেননা এর মূলে যে প্রয়োগ, যে কৰ্মজীবনের প্রেরণা, তার শক্তি নেহাতই ক্ষীণ। সামাজিক মেহনতের পূর্ণ প্রেরণা এইসব বস্তুবাদের মূলে জোটেনি। জোটবার কথাও নয়। গ্ৰীক সমাজ ক্রীতদাসের মেহনতের উপর নির্ভর করেছিল, সমাজের সদর মহলে মেহনতের পূর্ণ মর্যাদা জুটবে কেমন করে? তবুও, এই সামাজিক কাঠামোর মধ্যেও, মেহনতের সঙ্গে, কর্মজীবনের সঙ্গে যখনই সংস্কৃতির যোগাযোগ, তখনই মাথা তুলে দাড়াতে চেয়েছে বস্তুবাদ। এই কথাটাই বিশেষ করে লক্ষ করবার মতো কথা।