কিন্তু যখন বৈজ্ঞানিক-ঐতিহাসিকের উচ্চাসন একবার গ্রহণ করেছি তখন কোনও সত্যই গোপন করলে চলবে না। অগ্ৰীতিকর হলেও সমস্ত কথাই প্রকাশ করে বলতে হবে! অপ্ৰাচীন দার্শনিক যুগে যে দেশে আন্নাভাব ও অন্নচিন্তা ছিল না। এ বিষয়ে সর্বদর্শন-সংগ্রহের প্রমাণ অকাট্য। কিন্তু ঐতিহাসিকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যাবে যে খুব প্রাচীন অর্থাৎ বৈদিক যুগে কিছু কিছু অন্নাভাব ছিল। কেননা শ্রুতিতে অন্ন সম্বন্ধে আলোচনা দেখা যায়। এর বিস্তৃত প্রমাণ দেওয়া অনাবশ্যক। একটা দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। ধরুন তৈত্তিরীয় উপনিষদের ভৃগু-বরুণের উপাখ্যান। বরুণের পুত্ৰ ভৃগু যখন পিতার কাছে ব্ৰহ্ম সম্বন্ধে উপদেশ জিজ্ঞাসা করলেন তখন বরুণ তাকে বলেন তপস্যার দ্বারাই ব্ৰহ্মকে জানা যায়, তুমি তপস্যা করো। তবে সুবিধার জন্য ব্রহ্মের সম্বন্ধে একটা ‘ফরমুলা’ বলে দিলেন, ‘যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে’ ইত্যাদি। তপস্যা করে ভৃগু জানলেন অন্নই ব্ৰহ্ম। অন্ন থেকেই সকলের জন্ম হয়, জন্মের পর অন্নের বলেই সকলে বেঁচে থাকে, অন্নের দিকেই সকলের গতি এবং শেষে অন্নেই সবাই লীন হয়, অতএব অন্নই ব্ৰহ্ম। ভৃগু এই জ্ঞানটুকু লাভ করে পিতার কাছে গেলে বরুণ তাকে আবার তপস্যা করতে বললেন। দ্বিতীয়বার তপস্যায়। ভৃগুর বোধ হল প্ৰাণই ব্ৰহ্ম। এইরকমে তৃতীয়বারে জানলেন মনই ব্ৰহ্ম। চতুর্থবারে বুঝলেন বিজ্ঞানই ব্ৰহ্ম। অবশেষে শেষবার তপস্যায় এই জ্ঞানে পৌছিলেন যে আনন্দই ব্ৰহ্ম। এই হল ভৃগু-বরুণের গল্প, যাকে বলে ‘ভার্গবী বারুণী বিদ্যা’। এই শ্রুতি সম্বন্ধে শঙ্কর ও অন্যান্য ভাষ্যকারেরা নানা তর্ক তুলেছেন, ‘পঞ্চকোষ বিবেক’ ও ওইরকম সব দুর্বোধ্য জটিলতার অবতারণা করেছেন। কিন্তু এর প্রকৃত অথচ সহজ ইঙ্গিতটি কেউ ধরতে পারেননি। এই উপাখ্যানের প্রকৃত তাৎপর্য কি এই নয় যে গোড়ায় অন্ন থাকলে তবেই শেষ পর্যন্ত আনন্দ পাওয়া যায়! ইহাই যে শ্রুতির প্রকৃত মর্ম ও শিক্ষা তাতে আমার বিন্দুমাত্ৰ সংশয় নেই এবং একটু বিচার করে দেখলে বোধ হয় পাঠকেরও কোনও সন্দেহ থাকবে না। কেননা উপাখ্যানটি শেষ করেই শ্রুতি চারটি পরিচ্ছেদে কেবল অন্নেরই প্ৰশংসা করেছেন। এবং তার মধ্যে এমন সব শ্রুতি আছে যাতে যে-কোনও ইকনমিস্টের’ প্ৰাণ আহ্বাদে নৃত্য করে উঠবে। প্রকৃত ব্যাপারটা এই যে উপাখ্যানটি পড়লেই বিংশ শতাব্দীর জ্ঞানের উজ্জ্বল আলোতে ওর প্রকৃত অর্থটা স্পষ্ট ধরা পড়ে; এবং শঙ্কর প্রভৃতি প্রাচীন দার্শনিকেরা কেন যে ওর যথার্থ মর্ম বুঝতে পারেননি তার কারণও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্বেই প্রমাণ করেছি যে ওই সব দার্শনিকদের সময়ে কোনও অন্নাভাব ও অন্নচিন্তা ছিল না। এবং তাদের যে-কোনও historical sense বা ‘ঐতিহাসিক অনুভূতি’ ছিল না তা যার ওই sense বিন্দুমাত্র আছে তিনিই জানেন। সেইজন্য বৈদিক সময় যে তাঁহাদের সময়ের চেয়ে কিছুমাত্র অন্যরকম ছিল এটা তাঁরা কল্পনাই করতে পারতেন না। ফলে বর্তমান কালে আমরা যে higher criticism বা ‘উচ্চতর অঙ্গের সমালোচনা’র বলে প্রাচীনকালের মনের কথাটা একেবারে ঠিকঠাক বুঝে নিতে পারি, শঙ্কর প্রভৃতির সে সামর্থ্য ছিল না। অবশ্য ওই সমালোচনা-প্ৰণালীর নামের higher বিশেষণটা যাঁরা ও-প্রণালীটা প্রবর্তন করেছেন তাঁরাই দিয়েছেন, কিন্তু সত্যের খাতিরে বিনয়কে উপেক্ষা করবার মতো সৎ সাহস তাদের সকলেরই ছিল।
যাহোক পূৰ্ববতী আলোচনার ফলে এটা বেশ জানা গেল যে বৈদিক সময়ের পরে আর অন্নচিন্তায় আমাদের পূর্বপুরুষেরা বড় মাথা ঘামাননি। তাঁরা ব্ৰহ্মসূত্র রচনা করেছেন এবং কামসূত্রেরও অনাদর করেননি, কিন্তু মাঝখান থেকে অন্নসূত্রটা একেবারে বাদ দিয়েছেন। এর ফলভোগ করছি আমরা, তাদের এ যুগের বংশধরেরা। আমাদের অন্নের অভাব অত্যন্ত বেশি, এবং কীসে ও বস্তুটার কিছু সংস্থান হয় তার একটা মোটামুটিরকম মীমাংসারও বিশেষ প্রয়োজন; কিন্তু বহুযুগের বংশানুক্রমিক অনভ্যাসের ফলে ও-সম্বন্ধে চিন্তা বা আলোচনা করতে গেলেই গোলযোগ উপস্থিত হয়। তখন আমরা কে যে কী বলি তার কিছু ঠিক থাকে না। সেইজন্য আমাদেব বাংলাদেশে দেখা যায়, যিনি আইনের বিদ্যা ও বক্তৃতা বেচে টাকা জমিয়েছেন, তিনি সভায় দাঁড়িয়ে বাঙালির ছেলেকে ইস্কুল-কলেজে বৃথা সময় নষ্ট না করে চটপট ব্যাবসা-বাণিজ্যে লেগে যেতে খুব জোরালো বক্তৃতা দেন। অবশ্য সেই ব্যাবসাবাণিজ্যের মূলধনের জন্য তাঁর জমানো টাকার কোনও অংশ পাওয়া যাবে না, কেননা তাঁর যে বংশধর ওকালতি করবে। কিন্তু উপার্জন করবে না তার জন্য সেটা সঞ্চিত থাকা নিতান্ত দরকার। এবং বলা বাহুল্য, যে ‘শিল্প-বাণিজ্যে না ঢুকে’ ‘লেখাপড়া শিখে চাকুরি খুঁজে বেড়ায় বলে’ বাংলার যুবকেরা লেখায় ও বক্তৃতায় হিতৈষীদের গঞ্জনা শুনছে, সেই শিল্প ও বাণিজ্য দেশের কোথায় যে তাদের জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে সেটা তাদের দেখানো কেউ প্রয়োজন মনে করিনে। ভাবটা এই যে না-ই বা থাকল বাঙালির ছেলের মূলধন, না-ই বা থাকিল দেশে তাদের জন্য কোনও শিল্প-বাণিজ্য, তাঁরা কেন প্রত্যেকেই বিনা মূলধনে আরম্ভ করে নিজের চেষ্টায় এক একটা শিল্পের বড় বড় কারখানা গড়ে তোলে না, বড় রকম ব্যাবসার মালিক হয়ে বসে না। কেননা কোনও কোনও দেশে কোনও কোনও লোক যে কদাচিৎ ওইরকম ব্যাপার করেছে, তা তো পুথিতেই লেখা আছে। তারপর আমাদের এই অন্নসমস্যার সমাধানের জন্য ইস্কুল-কলেজ সব তুলে দিয়ে সে জায়গায় কৃষিপরীক্ষাশালা ও শিল্প-বিদ্যালয় খোলাই যে একমাত্র উপায় সে বিষয়ে কেউ যুক্তি-তৰ্ক দেখান; আর যাঁরা কাজের লোক তাঁরা যে-হয় কোনও ছেলেকে, যা-হোক কিছু একটা শিখে আসবার জন্য, যে একটা হোক বিদেশে যাওয়ার জাহাজ-৬াড়া সাহায্যের জন্য চান্দার খাতায় স্বাক্ষর করাতে আরম্ভ করেন। আর এ যুগের বাঙালির ছেলেও হয়েছে এক অদ্ভুত জীব। বর্তমানে ধনে-জনে যে জাতি পৃথিবীর মাথাব্য বসে আছেন শোনা যায়, বুকের মধ্যে র্তাদের হৃৎপিণ্ডে পৌছিতে হলে তাদের গায়ের জামার অংশবিশেষের ভিতর দিয়েই তার সোজা, এবং মন্দ লোকে বলে একমাত্র পথ। বাঙালির ছেলের অবস্থাটা ঠিক উলটো। নিজের পকেট সম্বন্ধেও খুব বেশি সজাগ ও উৎসাহান্বিত করতে হলে, এদের একেবারে বুকের মধ্যে ঘা না দিলে কোনওই ফল পাওয়া যায় না। দেশি শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া যে দেশের ধনবৃদ্ধির ও ধনরক্ষার জন্য একটা ‘টারিফের’ প্রাচীর মাত্র, ‘পলিটিক্যাল ইকনমি’ নামক বিজ্ঞানশাস্ত্রের যুক্তি-তর্ক এবং মহাজনের খাতার হিসাব-নিকাশেরই বিষয়, তা এরা কিছুতেই বুঝতে চায় না, এবং বুঝলেও তাতে কোনও ফল হয় না। এরা চায় গান আর কবিতা, যার বিষয় হচ্ছে দেশের উত্তরের হিমালয়ের মাথার বরফের মুকুট, দক্ষিণের নীল সমুদ্রের তরঙ্গভঙ্গ, এবং যখন সমস্ত পৃথিবী মুক ছিল তখন আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে সামগানে সিন্ধু সরস্বতীর তাঁর ধবনিত করেছিলেন, সেই কাহিনি। অথচ এরা যে হাতেকলমে কাজে লাগতে পারে না বা কাজ উদ্ধার করতে পারে না, এমন নয়। এরা অর্ধোদয়-যোগে দেশের দীনতমকেও নারায়ণের পূজায় সেবা করে এবং শৃঙ্খলার সঙ্গেই করে; বন্যার জলে চালের বস্তা পিঠে নিয়ে সাঁতার দেয়, এবং কোনও ডিপার্টমেন্টের বিনা চালনায় অনুষ্ঠানটি যেমন করে নির্বাহ করে, তাতে কাজের চেয়ে কাজের শৃঙ্খলাই যাদের গর্বের প্রধান বিষয়, সেই ‘ডিপার্টমেন্টের’ কর্তাদেরও কতক বিস্ময় কতক সন্দেহের উদ্রেক হয়; জাতির একটা দুর্নােম ঘোচাবার জন্য এরা তুর্কির গুলিতে টাইগ্রিসের তীরে প্রাণ দিতে রাজি হয়, এবং তার শিক্ষানবিশিতে পুব-পশ্চিমের কোনও জাতির চেয়ে কম পটুতা দেখায় না। কিন্তু এ তো অতি স্পষ্ট যে এ সকলই কেবল ভাবের খেলা, এর মধ্যে বস্তুতন্ত্রতা কিছুই নেই। প্রকৃত কাজের বেলায় এদের চরিত্রে কোনও গুণই দেখা যায় না। এরা কিছুতেই উপলব্ধি করে না যে খুব দৃঢ়-প্রতিজ্ঞা ও একনিষ্ঠার সঙ্গে আরম্ভ করে, সংসারযুদ্ধে জয়ী হয়ে দশের এক হওয়াই সবচেয়ে বড় কাজ, চরিত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সেইজন্য যদিও বাল্যকালে বিদ্যাশিক্ষার পুথিতে এদের সেই সব মহাপুরুষদের জীবনী পড়ানো হয় যাঁরা খুব হীন অবস্থা থেকে পরিশ্রম, অধ্যবসায় প্রভৃতি বহু সদগুণের সদ্ব্যবহারে নিজেদের অবস্থা খুব বেশিরকম ভাল করেছিলেন; এবং ইংরেজি হাতের লেখা লিখতে আরম্ভ করেই সময় আর টাকা যে একই জিনিস কপিবুক’ থেকেই এরা সে অদ্বৈতজ্ঞান লাভ করে, তবুও কিছু বড় হলেই এই পুস্তকস্থা-বিদ্যার ফল এদের স্বভাবে কিছু দেখা যায় না। তখন বাল্যশিক্ষার পুথির মহাজনদের অনুরূপ যে সব কৃতকর্মী পুরুষ, সমাজে সশরীরেই বর্তমান এরা তাদের কোনও খবরই বাখে না, এমনকী তাঁরা দেশের রাজার কাছে খুব উঁচু সম্মান পেলেও নয়। যাঁরা কেবল কথার সঙ্গে কথা গাঁথতে পারে, বা লজ্জাবতীর পাতায় তামার তার জড়ায়, এরা তাদের নিয়েই অসঙ্গতারকম হইচই করে। অন্নচিস্তায় যে এরা কাতর নয়, কি অন্নচেষ্টা যে এদের উত্তেজিত করে না তা নয়। সে চিন্তায় এরা যথেষ্টই ক্লিষ্ট; সে চেষ্টায় এরা অনেক দুঃখ, অনেক অপমানই সহ্য করে। কিন্তু সে-সব সত্ত্বেও ওই চিন্তা আর ওই চেষ্টাকেই পরমোৎসাহে সমস্ত মন দিয়ে বরণ করে নিতে কিছুতেই এদের মন সরে না। এদের ভাব কতকটা এইরকম যে রোগ যখন হয় তখন ডাক্তারও ডাকতে হয়, ঔষধও গিলতে হয় এবং হাঙ্গামও কিছু কম হয় না। এবং যে চিররোগী, সমস্ত জীবনই বাধ্য হযে তাকে এই হাঙ্গাম সইতে হয়। কিন্তু তাই বলে রোগের চিকিৎসাকেই সবচেয়ে বড় উৎসাহের ব্যাপার করে তোলা সম্ভবপর নয়।