রসুয়ে বামুনের বাড়ি হইতে বাহির হইয়া ফলারে বামুন রাস্তা দিয়া চলিল। তাহার মনের দুঃখ রাখিবার আর জায়গা দেখিতেছে না। চলে, আর খালি বলে, ‘আহা! আর যদি খানকতক দিত।’
এখন সময় হইয়াছে কি, রাজার প্রধান ভাণ্ডারী সেই রাস্তা দিয়া চলিয়াছে। সে নিজের হাতে সেদিন সকাল বেলায় ঐ ফলারে বামুনের জন্য পুরো দু সের ময়দা আর তাহার মতন অন্য সব জিনিস মাপিয়া দিয়াছে। ফলারে বামুনের মুখে ঐ কথা শুনিয়া সে জিজ্ঞাসা করিল, ‘কি ঠাকুরমশাই! কি যদি আর খানকতক দিত।’ ফলারে বামুন বলিল, ‘বাবা আমি পাকা ফলারের কথা বলছি। রাজামশাই চিরজীবি হউন, আমাকে এমন জিনিস খাইয়েছেন! খালি যদি আর খানকতক হত।’
ভাণ্ডারী জিজ্ঞাস করিল, ‘আপনাকে কখানা দিয়েছিল?’ ফলারে বামুন বলিল, ‘চারখানি পাকা ফলার আমাকে দিয়েছিল।’ ভাণ্ডারী সবই বুঝিতে পারিয়া বলিল, ‘সে কি ঠাকুরমশাই! দু সের ময়দা দিয়েছি, তাতে কি মোটে চারখানা লুচি হয়?’ ব্রাহ্মণ বলিল, ‘হ্যাঁ বাপু, চারখানাই ছিল। আর তাতে খুব চমৎকার লেগেছিল। ভাণ্ডারী বলিল, ‘দু সের ময়দায় তার চেয়ে ঢের বেশী লুচি হয়। আমার বোধ হচ্ছে, ঐ রসুয়ে বামুনের ছেলেটা বাকি লুচিগুলো মাচায় তুলে রেখেছে। আপনি আবার যান। এবারে গিয়ে একেবারে মাচায় উঠবেন। দেখবেন আপনার লুচি সেখানে আছে।’ ব্রাহ্মণ বলিল, তাই নাকি? বাপু তুমি বেচে থাকো। ‘হতভাগা বেল্লিক, বাঁদর, শয়তান পাজি’ বলতে বলতে ব্রাহ্মণ সেই রসুয়ে বামুনের বাড়ির পানে ছুটিল। গালিগুলি অবশ্য ভাণ্ডারীকে দেয় নাই-রসুয়ে বামুনের ছেলেকে দিয়াছিল।
রসুয়ে বামুনের ছেলে ফলারে বামুনকে চারিখানি লুচি খাওয়াইয়া বিদায় করিয়াই, তাহার সেই চোর বন্ধুর কাছে গিয়াছিল। সেখানে গিয়া সে চোরকে বলিল, ‘বন্ধু ঢের লুচি তয়ের ক’রে মাচার উপর রেখে এসেছি। তুমি শিগ্গির যাও। আমিও এই বাজার থেকে একটা জিনিস নিয়ে এখনি আসছি।’
চোর রসুয়ে বামুনের মাচার উপর উঠিয়া সবে লুচির ডাকনা খুলিতে যাইবে, এমন সময় ফলারে বামুন আসিয়া উপস্থিত। এবারে কথাবার্তা নাই, একেবারে মাচায় গিয়া উঠিল। চোর মুশকিলে পড়িল। লুকাইবার স্থান নাই, পলাইবার পথ নাই। এখন সে যায় কোথায়? শেষটা আর কি করে, মাচার কোণে একটা কাঠের থাম জড়াইয়া কোনরকমে বেমালুম হইয়া থাকিতে চেষ্টা করিতে লাগিল। একে ‘সন্ধ্যাকাল’ তাহাতে আবার ফলারে বামুন নিতান্তই সাধাসিধে লোক, লুচি খাইবার জন্য তাহার মনটা যার পর নাই ব্যস্ত রহিয়াছে। সুতরাং চোরকে সে দেখিতে পাইল না। ফলারে বামুন সামনে লুচি, সন্দেশ, তরকারি মিঠাই সাজানো দেখিয়া খাইতে বসিয়া গেল। পেটে যত ধরির, তত সে খাইল। আর একটি হজমি গুলির স্থানও নাই।
এমন সময় ভারি একটা মজা হইল। রসুয়ে বামুনের ছেলেও বাজার হইতে ফিরিয়া আসিয়াছে, আর ঠিক সেই সময় রসুয়ে বামুনও আসিয়াছে। অন্যদিন সে প্রায় দুপুর রাত্রের পূর্বে ফিরে না, কিন্তু সেদিন সে ভুলিয়া একটা ঝঁজরা ফেলিয়া দিয়াছিল, সেটার ভারি দরকার। ছেলে আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘বাবা, তুমি এখনি ফিরে এলে যে?’ রসুয়ে বামুন বলিল, ‘ঝাঁজরা ফেলে দিয়েছিলুম, তাই নিতে এসেছি।’
এতক্ষণে ফলারে বামুনের পেট এত বোঝাই হয়েছে যে, আর-একটু হইলেই তাহার দম আটকায়। পিপাসায় গলা শুকাইয়া গিয়াছে, কিন্ত সেখানে জল নাই। সে ‘জল জল’ বলিয়া চেঁচাইতে চেষ্টা করিল, কিন্ত ভাল করিয়া কথা ফুটিল না।
রসুয়ে বামুন তাহার ছেলেকে বলিল, ‘ওটা কি রে?’ ছেলে দেখিল, ভারি মুশকিল। সে ফলারে বামুনের কথা ত আর জানত না, কাজেই সে মনে করিয়াছে যে ওটা তাহার বন্ধু, গলায় সন্দেশ আটকাইয়া বিশ্রী স্বরে জল চাহিতেছে। বন্ধুর খররটা বাপকে দিলে সে আর বন্ধুর হাড় আস্ত রাখিবে না, আর কিছু না বলিলেও হয়ত এখনই মাচায় উঠিয়া দেখিবে। এমন সময় হঠাৎ তাহার বুদ্ধি জোগাইল- সে বলিল, ‘বাবা, ওটা নিশ্চয়ই ভূত। তা নইলে মাচায় থেকে অমন বিশ্রী আওয়াজ দেবে কেন?’
ভূতের কথা শুনিয়া রসুয়ে বামুন কাঁপিতে লাগিল। আরো মুশকিলের কথা এই যে, ভূতটা জল চাহিতেছে। তাহার কাছে জল লইয়া যাইতে কিছুতেই ভরসা হইতেছে না, অথচ জল না পাইলে সে নিশ্চয়ই ভয়ানক চটিয়া যাইবে। তার সে কি করে তাহার ঠিক কি? ছেলের ভারি ইচ্ছা যে, সে ভূতকে জল দিয়া আসে। কিন্ত রসুয়ে বামুন বলিল, ‘তা হবে না, যদি তোর ঘাড় ভেঙ্গে দেয়।’ এই সময়ে তাহার মনে হইল যে, মাচার উপর কয়েকটা নারকেল ছাড়ানো আছে, সুতরাং সে ভূতকে বলিল, ‘মাচায় নারকেল আছে, থামে আছড়ে ভেঙ্গে খাও।’
ফলারে বামুনের হাতের কাছেই নারকেলগুলি ছিল। সে তাহার একটা হাতে লইয়া থামে আছরাইয়া ভাঙ্গিতে গেল। যে থাম জড়াইয়া চোর দাঁড়াইয়াছিল, ব্রাহ্মন পিপাসার চোটে থাম মনে করিয়া সেই চোরের মাথাতেই নারকেল আছড়াইয়া বসিয়াছে বাড়ি-একেবারে মাথা ফাটাইয়া ফেলিবার জোগাড় আর কি!
এরপর একটা মস্ত গোলমাল হইল। নারকেলের বাড়ি খাইয়া চোর ভয়ানক চেঁচাইয়া উঠিল। আর তাহাতে ভয়ানক চমকাইয়া গিয়া ব্রাহ্মণের হাঁউমাঁউ করিতে লাগিল। গোলমাল শুনিয়া পাড়ার সমস্ত লোক সেখানে আসিয়া জড়ো হইল। আসল কথাটা জানিতে এরপর আর বেশী দেরি হইল না। চোর ধরা পড়িল, আর রসুয়ে বামুন তাহার ছেলেকে সেই ঝাঁজরা দিয়া এমনি ঠেঙান ঠেঙাইল যে কি বলিব!
ফিঙে আর কুঁকড়ো
একটা দানব ছিল, তার নাম ছিল ফিঙে। সে দেড়াশো হাত লম্বা শালগাছের ছড়ি হাতে নিযে বেড়াত। আর একটা দানব ছিল, তার নাম কুঁকড়ো। সে ঘুঁষো মেরে লোহার মুগুর থেঁতলা করে দিত।
