ব্রাহ্মণ শুনিয়াছিল, দৈ-চিঁড়ের ফলারের চাইতে পাকা ফলারটা ঢের ভাল। সুতরাং এরপর যে ফলারের নিমন্ত্রণ করিতে আসিল, তাহাকে সে বলিল, ‘পাকা ফলার খাওয়াতে হবে।’ সে বেচারা গরিব লোক, পাকা ফলার সে কোথা হইতে দিবে? তাই সে বিনয় করিয়া বলিল, ‘মশাই, পাকা ফলার দেওয়া কি যার তার কাজ? রাজা রাজড়া হলে তবে পাকা ফলার দিতে পারে।’ এই কথা শুনিয়া ব্রাহ্মণ বলিল, ‘তবে রাজা যেখানে থাকে, সেইখানে গিয়ে আমি পাকা ফলার খাব।’
ব্রাহ্মণ পাকা ফলার খাইবার জন্য রাজার বাড়ি চলিয়াছে। পথে যাহাকে দেখে, তাহাকেই জিজ্ঞাসা করে, ‘হ্যাঁগা, রাজার বাড়িটা কোনখান্টায়?’ একজন তাহাকে রাজার বাড়ি দেখাইয়া বলিল, ‘ঐ যে পাকা বাড়ি দেখছ, ঐটে রাজার বাড়ি।’
ব্রাহ্মণ ‘পাকা ফলার’ যেমন খাইয়াছে, ‘পাকা বাড়ি’ও তেমনি দেখিয়াছে। সুতরাং, ‘পাকা বাড়ি’র কথা শুনিয়া সে ভারি আশ্চর্য হইয়া রাজার বাড়ির দিকে তাকাইল। সে দেশের সব লোকেরই কুঁড়েঘরঃ খালি রাজার একটি সুন্দর পাকা বাড়ি ছিল। রাজার বাড়ি দেখিয়া ব্রাহ্মণের মুখে লাল পড়িতে লাগিল। সে গদগদ স্বরে বলিল, ‘পাকা বাড়ি! আহা! পাকা বাড়িই বটে! না হবে কেন? সে যে রাজা, তাই সে অমন বাড়িতে থাকে। ওটা তয়ের করতে না জানি কত ক্ষীর, ছানা আর চিনি লেগেছিল!’
এ মনে করিয়া ব্রাহ্মণ তাড়াতাড়ি গিয়া রাজার বাড়ির একটা কোণ কামড়াইয়া ধরিল; আবার তখনই ‘উঃ- হু-হু’ করিয়া কামড় ছাড়িয়া দিল।
তারপর সে ভাবিতে লাগিল, ‘তাই ত, এই পাকা ফলারের এত নাম!’ আর খানিক ভবিয়া সে বলিল ‘ওঃ হো! বুঝেছি। নারকেলের মতন আর কি! ওটা ওর খোলা; আসল জিনিসটা ভিতরে আছে!’ এই বলিয়া সে আগের চাইতে দ্বিগুণ উৎসাহে কামড়াইতে আরম্ভ করিল। তাহার দুইটা দাঁত ভাঙ্গিয়া গেল, তাহাতে গ্রাহ্য নাই। কামড়াইতে কামড়াইতে সে সেই কোণের অনেকখানি ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে, আর মনে করিতেছে যে, ‘আর বেশী দেরী নেই, এরপরই পাকা ফলার আসবে!’ এমন সময় কোথা হইতে মস্ত পাগড়িওয়ালা দারোয়ান আসিয়া তাহাকে ধরিয়া ফেলিল। ‘আরে ঠাকুর, ক্যা করতে হো? মহারাজকে ইমারত খা ডাল্তে হো? চলো তুম হমারে সাথ।’ এই বলিয়া দারোয়ান তাহাকে রাজার নিকট লইয়া চলিল।
দারোয়ানের কাছে সকল কথা শুনিয়া রাজা বলিলেন, ‘কি ঠাকুর, ওখানে কি করছিলে?’ ব্রাহ্মণ উত্তর করিল, ‘মহারাজ! আমি পাকা ফলার খাচ্ছিলুম। খোলাটা না ভাঙ্গতেই এই বেটা দারোয়ান আমাকে ধ’রে এনেছে!’
এই কথা শুনিয়া রাজামহাশয় হো-হো করিয়া হাসিতে লাগিলেন, আর বেশ বুঝিতে পারিলেন যে, ঠাকুরের পেটে অনেক বুদ্ধি। যাহা হউক, তাহার সাধাসিধা কথাগুলি রাজার বেশ ভাল লাগি। সুতরাং তিনি হুকুম দিলেন যে, এই ব্রাহ্মণকে পেট ভরিয়া পাকা ফলার খাইবার মত ময়দা, ঘি আর মিঠাই দাও।
ব্রাহ্মণ মনের সুখে রাজাকে আশীর্বাদ করিতে করিতে ময়দা, ঘি আর মিঠাই লইয়া ঘরে ফিরিল। আসিবার সময় বলিয়া আসিল যে, পাকা ফলার খাইয়া আবার রাজামশাইকে আশীর্বাদ করিতে আসিবে।
পরদিন সকালে রাজামহাশয়, মুখ হাত ধুইয়া সভায় আসিয়াই সেই ব্রাহ্মণকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কি ঠাকুর, কাল পাকা ফলার খেলে কেমন? ব্রাহ্মণ বলিল, ‘মহারাজ অতি চমৎকার খেয়েছি, পাকা ফলার কি আর মন্দ হতে পারে? গুঁড়োগুলো আগে গলায় বড্ড আটকাচ্ছিল! জল দিয়ে গুলে নিতে শেষে তরল হল, কিন্ত অর্ধেক খেতে না খেতেই বমি হয়ে গেল।’
ময়দা আর ঘি দিয়া যে লুচি তৈয়ার করিতে হয়, ব্রাহ্মণ বেচারা তাহা জানিত না। কাজেই সে ঐ কাঁচা ময়দাগুলিকেই ঘি আর মিঠাই দিয়া মাখিয়া খাইতে বিশেষ চেষ্টা করিয়াছে। সহজে তরল হয় না দেখিয়া, আবার তাহার সঙ্গে জল মিশাইয়াছে। খাইতে তাহার খুব ভালই লাগিয়াছিল। তবে, পেটে রহিল না, এই যা দুঃখ।
রাজা দেখিলেন, লুচি নিজে তয়ের করিয়া খাইতে হইলে আর ব্রাহ্মণের ভাগ্যে পাকা ফলার ঘটিতেছে না। সুতরাং তিনি তাঁহার রসুয়ে বামুনদের একজনকে ডাকাইয়া বলিলেন, ‘এখান থেকে ময়দা ঘি নিয়ে, তোমার বাড়িতে লুচি তয়ের ক’রে, এই ঠাকুরকে পেট ভ’রে পাকা ফলার খাইতে দাও।’
রসুয়ে বামুন ফলারে বামুনকে তাহার বাড়ি দেখাইয়া বলিল, ‘আমি ফলার তয়ের করে রাখব, বিকালে আসিয়া আপনি খাবেন। আমি বাড়ি থাকব না, আমার ছেলে আপনাকে খেতে দেবে এখন।’ ব্রাহ্মণ রাজি হইয়া বাড়ি গিয়া বিকাল বেলার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল।
রসুয়ে বামুনের সেই ছেলেটা ভাল লোক ছিল না; একটা চোরের সঙ্গে তাহার বন্ধুতা ছিল। রসুয়ে বামুন ফলারে বামুনের জন্য লুচি, সন্দেশ ইত্যাদি তয়ের করিয়া তাহার ছেলেকে বলিল, ‘সেই লোকটি এলে তাকে বেশ ক’রে খাওয়াস।’ তাহার ছেলে বলিল, ‘তার জন্যে কিছু চিন্তা করো না, আমি তাকে খুব যত্ন ক’রে খাওয়াব এখন।’ রসুয়ে বামুন রাজবাড়ির রান্না করিতে চলিয়া গেল; আর তাহার ছেলে ফলারে বামুনের খাবারের আয়োজনে মন দিল। দু সেরের বেশি লুচি আর তাহার মত তরকারি মিঠাই ইত্যাদি প্রস্তুত হইয়াছিল। খানচারেক লুচি আর খানিক তরকারি ফলারে বামুনের জন্য রাখিয়া, আর সমস্ত সেই হতভাগা তাহার সেই বন্ধু আর নিজের জন্য রাখিয়া দিল। ফলারে বামুন আসিলে পর সে সেই চারখানা লুচি তাহাকে খাইতে দিল। সে বেচারা জন্মেও লুচি খায় নাই, তাহাতে আবার এমন চমৎকার লুচি-রাজার বামুন ঠাকুর তয়ের করিয়াছে। এমন জিনিস দু-চারখানি মাত্র খাইয়া তাহার পেট ত ভরিলই না, বরং তাহার ক্ষুধা বাড়িয়া গেল। সে খালি দুঃখ করিতে লাগিল, ‘আহা! আর যদি খানকতক দিত।’
