পুরোদস্তুর ঝালমুড়ি-আড্ডা। আচ্ছা চলাকালীন কে যেন একবার হো-হো করে হেসে উঠে কথাটা বলেছিল। তারপরে সকলে। প্রবীর শুধু হাসেনি। সিরিয়াস স্বরে বলেছিল, ব্যাপারটাকে এরকম চিপ করে দাম না, ঝালমুড়ি-আড্ডা না বলে বল এই সময়ের আড্ডা। প্রবীর কবিতা লিখত। কথা বলত কবিতার মত। সমস্ত জীবনটাকে কবিতা করে নিতে চেয়েছিল। এমন এমন কথা বলে উঠত, আর গতি থেমে যেত। সকলেই চিন্তাশীল হয়ে উঠত। রুদ্র লক্ষ করেছে কয়েক মুহূর্তের জন্যে আড্ডা থামিয়ে সকলেই প্রবীরের কথাগুলো নিয়ে ভাবলেও শেষ পর্যন্ত প্রবীরের কথা বা প্রবীরের ব্যাপারে কেউই উৎসাহী হতো না। কাউকেই প্রবীর উৎসাহী করতে পারেনি কখনও তার প্রতি। মেয়েদের মধ্যে কোন আবেদনই তৈরি করতে সক্ষম হয়নি প্রবীর।
কিন্তু আজ রুদ্রের মনে হচ্ছে প্রবীর সম্পর্কে যা ভেবেছে, যা জেনেছে তা হয়ত সবই ভুল। লিপিকার হৃদয়ের গভীর আড়ালে প্রবীরের প্রতি ক্ষীণ একটা দুর্বলতা হয়ত আছে। রয়ে গেছে এখনও। হয়ত ভেবেছিল কবিতা-লিটিল ম্যাগাজিন গায় বাড়ি—কিছুই না করার ইচ্ছে-এমনকি একটা ছোট সম্পর্ক, একটু প্রেম প্রেম খেলা—সেই সরে ইচ্ছে নেই—ছন্দ মাত্রা শব্দ শরীর আর অপার ভাবাবেগের কথা শুধু মাঝেমাঝে কথা থামিয়ে ড্যান্ড্যা করে তাকাত লিপিকার দিকে। প্রবীরের। অনুপস্থিতিতে ওর কথা উঠলেই লিপিকা হাসতে হাসতে বলত, কিরকম ছাগলের মত চোখ দুটো না! কথাটা শেষ হলেও লিপিকার হাসি যেন শেষ হতে চাইত না।
কিন্তু আজ রুদ্রর মনে হচ্ছে ঐ হাসিটা নিখুঁত অভিনয় ছিল লিপিকার। মনের নিভৃত কোণে প্রবীরের ব্যাপারে রয়ে গিয়েছিল অন্য কোন ছোঁয়া। না হলে এমনভাবে। প্রশ্রয়টাকে বাড়িয়ে তুলছে কেন লিপিকা। প্রবীর দীর্ঘদিন পরে ওদের সঙ্গে দেখা করবে বলে হঠাৎ করে এবাড়িতে ঢুকে পড়ার পর থেকেই লিপিকার মধ্যে রুদ্রর প্রতি একটা প্রবল রাগ একটু একটু করে দানা বাঁধতে শুরু করেছে। এটা জানে রুদ্র। বুঝেছে রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। মেটাক না, যত খুশি রাগ মেটাক লিপিকা। কিন্তু অত তাড়ার কি আছে। আগে প্রবীর বাড়ি থেকে চলে যাক। একটা ছোট মিথ্যে গল্প, একটা কিছু সাজিয়ে আগে প্রবীরকে বাসে তুলে দিয়ে আসুক, তারপরে নয় হবে। অথচ তা না করে এ-মুহূর্তে প্রবীরকেই যেন একটা অস্ত্র করে নিয়ে তুলে ধরেছে তার বিরুদ্ধে সেই রাগটাকে মিটিয়ে নেওয়ার জন্যে। এটা কি শুধু রাগ মেটানো, নাকি
একভাবে পুরনো বন্ধুর প্রতি ঘুমিয়ে থাকা পুরনো রোমাঞ্চকে জাগিয়ে তোলা?
নিচে রিজার্ভারের চাবি বন্ধ করার জন্যে এ-ঘর থেকে যাওয়ার সময় দেখেছিল দুটি গ্লাসে দুটি পেগ বানিয়ে ফেলেছে প্রবীর। নিচে চাবিটা বন্ধ করে ওপরে ফিরে আসতে একটা বেশিই সময় নিয়েছিল রুদ্র। ওপরে ফিরে মদ ঢালা গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তো খাবো না…..
প্রবীর অবাক হয়ে বলল, খাবি না মানে।
খাবো না মানে এ-সময় আমি খাই না—
এ সময় তুই খাস্ না। কথাটা বলে প্রবীর হো হো করে হেসে উঠেছিল। লিপিকার চোখে তাকিয়ে নিয়ে বলল, বিয়ের পরে খুব উন্নতি হয়েছে রে, তোর….
রুদ্র চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল, উন্নতির কি হল এতে, সাতসকালে তুই ছাড়া দেশে মদ্যপান করেটা কে!
রুদ্র লক্ষ করল একথায় প্রবীরের মধ্যে সামান্য ভাবান্তও ভেসে উঠল না। নিজের গ্লাসে জল ঢেলে বলল, দেখ তোর গ্লাসে কতোটা জল ঢালব….
আমি খাবো না প্রবীর…। রুদ্রর স্বর এখন বেশ গম্ভীর। আড়চোখে তাকাল লিপিকার দিকে। আশা করেছিল লিপিকার দিক থেকেই সকালবেলাতেই মদ্যপানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসবে। অথচ রুদ্র দেখল লিপিকার দু-চোখে নীরতার ভিতরে শুধু প্রশ্রয়। খুব কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে প্রবীরের গ্লাসের মদে জল মেশানো দেখছে।
একটা গ্লাস উঁচু করে রুদ্রর দিকে তুলে ধরল প্রবীর। বলল, কফিহাউসের দিনগুলো মনে পড়ে, তখন তো কোন কোনদিন তুই আর আমি মদ দিয়ে মুখ ধুয়েছি…..
রুদ্র বলল, তাই বলে আজীবন সেগুলোকে রক্ষা করতে হবে নাকি, আর রক্ষা করতে না পারলেই কি সেটার নাম দিবি পালিয়ে আসা। বোগাস…যতসব….
প্রবীর গ্লাসটাকে রুদ্রর আরও কাছে এগিয়ে দেয়। বলে, ঝগড়া করছিস কেন! আমি কি তোর কাছে ঝগড়া করতে এসেছি!
ঝগড়া নয়, ঝগড়া নয়। কথা দুটো বলে প্রবীরের হাত থেকে ঝপ করে গ্লাসটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ঠক্ শব্দে নামিয়ে রাখল টেবিলের ওপরে। প্রবীরের মনে হল আজ রুদ্র তার সঙ্গে বসে মদ্যপানই করছে না, ডাক্তারের নির্দেশে কোন তেতো ওষুধ যেন গিলছে।
লিপিকা ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা বোসো তাহলে, দেখি পাশের পাড়া থেকে কিছু আনা যায় কিনা….
প্ৰবীর বলল, পাশের পাড়া কেন।
এ-পাড়ায় তো আজ সব দোকান বন্ধ। আজ সোমবার না, এ-পাড়ায় সব দোকান বন্ধ থাকে….
লিপিকা পায়ে স্লিপার দিয়ে বেরিয়ে গেল। আর রাগে গা রি-রি করে উঠল রুদ্রর। প্রবীরের প্রতি লিপিকার এতোটা আতিথ্যের হেতু! মাসের মধ্যে একদিন-দুদিন তার মুখ থেকে মদের গন্ধ যার কাছে অসহ্য, সে-ই এখন মদের চাটের জন্যে পাশের পাড়ার দোকানে ছুটছে!
সকালে হঠাৎ করে প্রবীর যখন ঢুকে পড়েছিল এ বাড়িতে, চমকে ওঠে রুদ্র। শেষ পর্যন্ত চলে আসবে কল্পনাতেও আনতে পারেনি। আজকাল তেলরঙের কাজ আর করে না রুদ্র। করে না বললে ভুল। আসলে ক্যানভাসের ওপরে তেলরঙের কাজে যে ছবি, স্রষ্টার এক একটি অনিন্দ্য সুন্দর ভাবনা ফুটে ওঠে, তা আর আজকাল রুদ্রর কল্পনার জগতে স্থান করে নিতে পারে না। আজকাল আর ভাবনার জন্ম হয় না তার মস্তিষ্কে। আর হয়েই বা কি লাভ! ছবিগুলো তৈরি হওয়ার পরে একজিবিসান করো। এখানে পাঠাও, ওখানে পাঠাও। সে অনেক পরিশ্রমের ব্যাপার। তার থেকে কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় বড়ো প্রকাশকের ঘরে বই-এর প্রচ্ছদ, লে-আউট করলে পয়সা খারাপ পাওয়া যায় না, পরিশ্রমও কম।
