বিকেলবেলায় গাঁয়ের কোনো কুয়োতলায় দাঁড়ালে এইরকম দৃশ্য। এ সময়টাই বৌঝিদের সংসার জীবন থেকে কিছুটা মুক্তি, খবরের আদান-প্রদান। রটনা-ঘটনা।
এ গাঁয়ে কুয়ো বলতে একটাই। অন্য দুটোর জল তেমন ভালো নয়। একটার পাড় চুইয়ে পুকুরের জল ঢোকে। অন্যটায় লক্ষ্মী ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল, তাই সে জল আর কেউ নেয় না। এ কুয়োর বয়েস কেউ জানে না। যারা জানতো তারা মরে গেছে। যারা জানে তারা ঠিক-বেঠিক মিশিয়ে জানে।
সেই কবে লালমুখো সাহেবের বন্দুক নিয়ে কাছার পাড়ে পাখি-মারা, তারপর কী একটা কাগজে লিখে টিপসই। তারপর কুয়ো। কুয়োর কপিকল বার কয়েক বদলেছে। মাথার উপর পাতানো কাঠ দেখলে মালুম হবে কাঠটা কত পুরনো দিনের সাক্ষী। গায়ে তার, অসংখ্য দড়ির দাগ। সবাই বলে, এ কুয়ো পীরের থানের বলেই এর জল এত ভালো। কুয়োর থামের পাশে লেখা ‘এলাহি, ভরসা, মিস্ত্রী সেখ কাবাতুল্লা, সাকিন রসুলপুর।’ ‘সন’ কথাটার পর থেকে চটা উঠে গেছে। কুয়োয় গোল মেঝের উপর সিমেন্টের চিহ্ন নেই। বৌ-ঝিদের প্রতিদিনের সুখ-দুঃখের গল্প শুনতে শুনতে সেও অনেকটা দুঃখী মানুষের মতো সহনশীল ও নিথর।
সারি সারি কলসী বসেছে কুয়োতলায়, হরেক রকমের কলসী। কোনোটা ঝকঝকে, কোননোটার গায়ে পড়েছে সময়ের ময়লা, কোনোটার কানা বাঁকা। কোথাও কোনোটার গা বেড়ানো, অতীত দিনের অসাবধানতায় পড়ে টাল খেয়ে যাওয়া, নয়তো কোনো অত্যাচারের কাহিনী। এরই মধ্যে বেমানান মাটির কলসী। কলসী দেখ আর কলসীর মালিককে দেখ! ঠিক আটকাল করতে পারবে কলসীর সঙ্গে মানুষের কত যোগ। কে কেমন, তার কলসী কেমন? যে কেমন কলসী তার তেমনি। কুয়োতলায় কলসীই মানুষদের মুখের কথা বলে।
মনসারামের বৌ কলসীবালতি-দড়ি নিয়ে হাজির হয়। সুখী-সুখী মুখ। এখনও একবছর পুরো হয়নি বিয়ের। মনসা এই একটু আগে বেরিয়ে গেল কুয়োতর রাস্তার পাশ দিয়ে। যাচ্ছে কালীপুর মোকামে। সাইকেলের ফ্রেমে বাঁধা কাপড়ের পাড়। বিয়ের যৌতুক। মনসারামের সাইকেলের ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে পথের বাঁকে।
হারুর পিসি ফুট কাটল বালতিতে গিট মারতে মারতে মনসার বৌ-এর দিকে তাকিয়ে। ‘হ্যাঁ লো লাতবৌ আজকাল কি সাইকেল চেপে জল আনতে এসিস? লাতি গেল এই দেখানু’ মনসার বৌ হাসি লুকোয়।
–দিদিমা, আমার একটু তাড়া আছে। আমায় একটু আগে জল তুলতে দাও।
—তাতো বটেই। লাতি কি এখুনি ফিরে পড়বে? সাঁঝ পহরেই শুয়ে পড়বি নাকি?
ফুলীমামী রশিতে টান দিতে দিতে যোগ করল কথার পিঠে কথা, ছেলে, ছেলো, আমাদেরও রঙের গা ছেলো বয়েসকালে।
তিলু মার খেয়েছে বেদম, গেল-মঙ্গলবারে শাশুড়ীর হাতে। এ আর নতুন খবর কী? কিন্তু মারের কারণ শুনে হাঁ হয়ে গেল দু এক জনা। তিলু নাকি ভূষণের সঙ্গে আছে। কুয়োতলার অনেকেই তিলুর হয়ে গাইল। কেউ দজ্জাল শাশুড়ীর কথা। উড়িয়ে দিল, কেননা তিলুর শাশুড়ী মিথ্যে খবর রটানোতে একবারে জাঁহাবাজ।
মনসার বৌ কথাটা শুনে গেল। গাঁয়ের মধ্যে আপাতত ওরা সুখী-জোড়। রতির মার কথায়, যেমন হাঁড়ি তেমনি সরা। ভগমানের মিলিয়ে রাখা।
কথাটা কানে গলে মনসার বৌ-এর। পীরের থানের দিকে এক হাত তুলে গড় করল। ঘরের পথটুকুতে তিলুর কথা ভাবতে ভাবতে ও ঘরে ফিরল। ও বিশ্বাস করতে পারছিল না। তিলু এ গাঁয়ের মেয়েদের কাছে একটা বিশ্বাসের সিন্দুক।
বেলা চলে যাচ্ছে দ্রুত।
কপিকলের একদিকে রতির মার বালতি নামছে। অন্যদিকে কাঠ বেয়ে সন্ধ্যার বালতি। দুটো বালতি দুদিক থেকে। কির কির করে কপিকলে শব্দ উঠছে।
ঝনাক, একটা শব্দ হলো।
ছর ছর করে জল পড়ল। কুয়োর জল কুয়োতেই। কুয়োর পাট চুইয়ে জল পড়ছে। ব্যাস অমনি শুরু হয়ে গেল।
—তোর মাগী উদোম বাই। দেখতে পাসনু আমার বালতি উঠছে? অত যদি তাড়া তবে সন্দের পোঁদে বাতি দিয়ে ক্যানে? বেলাবেলি আসতে পারুসনি?
কথার পিঠে কথা পড়ছে। শুরু হচ্ছে বচসা।
সাবিত্রী থামায় ওদের দুজনকে।
ছবি এল। ফ্রকের পিছনে সেফটিপিন আঁটা। সামনের দিকে বুকের উপর তেলচিটে ময়লা দাগ, সন্ধের করুণ আলো। পিতলের কলসী বড় বিবর্ণ। মাজা হয়নি অনেকদিন। কলসী বাঁধা দিয়ে অভাবের দিন পার করেছে। এই কদিন হলো কলসী মহাজনের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
কলসীর দিকে তাকিয়ে সারি বলল সই, কলসী মাজুনি ক্যানে?
পরশু ছাড়িয়ে এনেছে পালেদের ঘর থেকে। একদম অপসোর নাই। ধান সিজোনো হচ্ছে।
কুয়োতলায় লম্বা লাইন। মেয়েরা ভাগ ভাগ হয়ে গল্প করছে।
দ্রুত পায়ে সেজোপিসি আসছে। যেন প্রেসমার্কা গাড়ি।
সবাই তাকায়। সবাই জানে সেজোপিসি এসে এমন একটা খবর দেবে যে সবাই সে খবরে বেবাক বোকা বনে যাবে। এই খবর রবারের গড়ির মতো টানতে টানতে বাড়াবে সেজোপিসি। আর সেই ফাঁকে জল তুলে নিয়ে যাবে। আসবে সবার শেষে, আর যাবে সবার আগে। যাবার সময় গল্প শেষে বলবে, এই যা। উনুনে দুধ আছে।
আজকে কোনো গুরুতর সংবাদ হবে। সেজোপিসির শাস দ্রুত।
একটা জটলা হয় সেজোপিসিকে ঘিরে। সারি বলে, কী, দিদিমা ছুটে ছুটে এসচো, দাদু লাছে দাঁড়িয়ে আছে নাকি?
—তোর মাগী রঙের গা। বর দেখা হচ্ছে তো!
সেজোপিসিকে কালোর মা একদম দেখতে পারে না। বলে, সেজোপিসি গোটা গাঁয়ের লেগে খপোর বিয়োয়।
সুও যে বিয়োতে জানে সে মজা বোঝে। না হলে ঘর গেরস্থালীর কাজ ছেড়ে জল তোলা ভুলে সবাই ঘিরে ধরে কেন সেজোপিসিকে!
