বরদাকান্ত মুখে একটা বিরক্তিকর ধ্বনি তুলে সিগারেটটা ছুড়ে দিলেন বাইরে আর বললেন, নে চল।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে অবনী বলল, কোথায় বড়োবাবু?
বরদাকান্ত বললেন গ্রেট ইস্টার্নে। ব্রেকফাস্ট করব।
অবনী গাড়ি ছোটাতে বরদাকান্ত ওঁর গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগ থেকে দিনের কাগজটা বার করে পড়া শুরু করলেন।
দরজা খুলেছিল মণিবালা। চপলাকান্ত মণিবালাকে দেখে দু-দন্ড স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। আহা রে, সেই চোখ, সেই চাহনি, সেই স্নিগ্ধ হাসির ছোঁয়া ঠোঁটে, গালে সেই টোল। ঘোমটা-টানা নত মুখে মণিবালা যখন নিম্নস্বরে বলল ‘আসুন!’ চপলাকান্ত তখনও মণিবালার মধ্যে মঞ্চ ও রুপোলি পর্দার সেই নায়িকাকেই দেখছিলেন। মনে পড়ল বন্ধু রঘুনাথের সঙ্গে ‘সীতা’ আর ‘ষোড়শী’ নাটকে মণিবালাকে দেখে কী মুগ্ধই না হয়ে পড়েছিলেন দু-জনে। তারপর কার মুখে শুনলেন ‘মিশরকুমারী’ নাটকেও আবনের কন্যার ভূমিকায় মণিবালা নাকি শ্বাসরুদ্ধকর কাজ করেছে। ব্যাচেলর চপলাকান্তের মুখে মণিবালার রূপ ও অভিনয়ের প্রশংসা শুনে তাস খেলতে খেলতে আনমনে বরাদাকান্ত একদিন বলে বসেছিলেন, কার কথা এত বলছিস রে চপলা ক-দিন যাবৎ?
লজ্জায় পড়ে চপলাকান্ত যেন প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছিলেন।
আর আজ সেই মণিবালা সাক্ষাৎ ওঁর সামনে দাঁড়িয়ে। ঘোমটা টেনে একেবারে বাড়ির বউটি। বউদিও হয়তে এইভাবেই দেখেছিল ওকে, সবাইকে লুকিয়ে যখন ভাগনের নায়িকা। বউ দেখতে আসে।
চপলাকান্ত কিন্তু কোনো উত্তর করলেন না। মণিবালাকে পাশ কাটিয়ে ওদের শোওয়ার ঘরে ঢুকে দেখলেন শ্রীমান সবে ঘুম থেকে চড়ে পাজামার গিট বাঁধতে বাঁধতে খাট ছাড়ছেন। ছোটোমামাকে দেখেই বলল, তুমি?
খাটে বসতে বসতে চপলা বললেন, অগত্যা।
ন্যাপার মুখটা শুকিয়ে গেল। কোনো মতে উগরোতে পারল, বড়োমামা জানেন?
চপলাকান্ত এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না। পরিবর্তে কিছুটা খেদের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, তুই যে এখানে এসে উঠেছিস সেটা জানাবারও প্রয়োজন বোধ করলি না?
ন্যাপা গুটি গুটি ছোটোমামার পাশে এসে ওঁর হাতে দুটো হাত চাপা দিয়ে নীচু গলায় বলল, বিশ্বাস করো ছোটোমামা, কোথাও একটা দু-কামরার ফ্ল্যাট খুঁজে পাচ্ছিলাম না। একজায়গায় তো একমাসের ভাড়া আগাম দিয়ে উঠেও পড়েছিলাম। একদিন বাদে টাকা ফেরত করে বাড়িওলা বললে, আপনারা বায়োস্কোপের লোক আগে জানাননি। আমাদের অসুবিধা আছে। স্রেফ বড়োমামার কথা ভেবে এই বাড়িওলা ঘর দিয়েছে। না হলে কোথায় যেতুম বলো তো?
চপলাকান্ত এক টিপ নস্যি নিলেন। কী সব আকাশ-পাতাল ভাবলেন। শেষে নৈঃশব্দ্য ভাঙলেন, তা এখন কোথায় যাবি ভাবছিস?
ন্যাপার চোখ ফেটে জল এল। ও জোরে জোরো মাথা ঝাঁকাতে লাগল। আমি সত্যিই জানি না, ছোটোমামা। যে দিকে দু-চোখ যায় চলে যাব। বউ নিয়ে তো আর বড়োমামার ওখানে উঠতে পারব না।
চপলাকান্ত বললেন, সে যেখানে যাবি যাস। তার আগে দাদার সঙ্গে একবারটি দেখা করিস। বেচারা বড় দুঃখ পেয়েছে।
ন্যাপা বলল, সে কি আর আমি জানি না মামা?
–জেনে লাভ তো কিছু হল না দেখছি!
–আমার কপাল।
চপলাকান্ত খাট থেকে উঠতে উঠতে বললেন, তোর কপাল না দাদার কপাল। এমন গুণধর ভাগনে ক-জনার কপালে জোটে?
বিব্রত স্বরে ন্যাপা বলল, যা বলেছ।
চপলাকান্ত বুক পকেটের লুকোনো গর্ত থেকে একটা একশো টাকার নোট বার করে ন্যাপার হাতে দিয়ে বললেন, দৈবাৎ নতুন বউয়ের মুখ দেখে ফেলেছি। এটা তোর বউকে দিস।
ন্যাপা একটু পিছিয়ে গিয়ে বলল, সে কী! যে বউকে ঘরে তোলা যাবে না তার মুখ দেখে…
চপলাকান্ত ঘরের বাইরে পা বাড়াতে বাড়াতে বললেন, সে তুই বোঝ।
.
সন্ধ্যের তাসখেলাটা আর কিছুতেই জমছে না বরদাকান্তর। ভালো ডিল পেলেন পর পর দু-বার, কিন্তু খেলা সাজতে পারলেন না। শেষে দুই জুনিয়র শরদিন্দু আর মৃগেনকে বললেন, তোমরা আজ যাও। তাসে মন বসছে না। দেখি চপলার সঙ্গে একটা দাবা চলে কি না।
দাবাটাও যে খুব খেলতে ইচ্ছে করছে বরদাকান্তর তাও নয়। তবে শরদিন্দু, মৃগেনরা গেলে দাবার ছকে মুখোমুখি বসে কিছু প্রশ্ন তলব করা যায় চপলাকে।
মন্ত্রীর সামনের বোড়েকে এক ঘর বাড়িয়ে বরদাকান্ত ভাইকে জিজ্ঞেস করছিলাম ন্যাপার কথা।
চপলাকান্তও ওঁর মন্ত্রীর বোড়ে বাড়াতে বাড়াতে বললেন, কী আর করবে দাদা? এরকম রাসকেল ভাগনেরা তো সমস্যা হয়ই।
বরদাকান্তও ওঁর ঘোড়াকে বার করতে করতে উত্তেজিত স্বরে বললেন, তার মানে। চোখের সামনে ভাগনেটা উচ্ছন্নে যাবে আর মামা হয়ে আমি সেইটা অ্যাপ্রুভ করব?
চপলাকান্ত আরেকটা বোড়ে বার করলেন। কিন্তু দাদা, তোমার অন্য ভাগনেটি—নিতু– সে তো মানুষ হচ্ছে।
ও! নিতু পড়াশুনো চালিয়ে যাচ্ছে বলে ন্যাপাকে স্কাউজ্জ্বেল হয়ে উঠতে হবে?
ঠিক তা নয়… চপলাকান্ত ছকের দিকে গভীর মনোনিবেশ তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন, হাতের সব আঙুল তো আর সমান হয় না।
বরদাকান্ত বললেন, তা বলে অন্যের অপোগন্ড ছেলে মানুষ করার সব দায়িত্ব তো একা আমার হতে পারে না। আমি সুমিত্রাকে বলেছিলাম তোমার ছেলেদের আমি মানুষ করে দেব, কিন্তু তাদেরও চেষ্টা করতে হবে মানুষ হওয়ার জন্য। মানুষ হওয়ার এই লক্ষণ। এক পয়সা রোজগার নেই, ছেলে বিয়ে করে বসলে! তাও কিনা …
