বিচারকের মতো গম্ভীর কণ্ঠস্বর আতিকের, ‘কেমন চমৎকার মিথ্যা’ গল্প ফাঁদলে তুমি, সোবহান ভাই বোটানিক্যাল গার্ডেনে গেছে। আমি একা একা বোরড় হচ্ছি।
সায়মার দিকে না ফিরেই বলে গেল, ‘এরপর তো আর আমাদের একসঙ্গে ধ্ব করা চলে না। এত বড় স্ক্যান্ডালের পর। এ লোকটাকে আমি চাকরি দিয়েছি নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়েছি। আর সে কিনা’ ঘৃণায় নাক শিটকায় আতিক চৌধুরী।
সারা ঘরময় থমথমে নীরবতা। অস্থিরভাবে পায়চারি করছে আতিক।দেয়ালের ঘড়িটা একটানা শব্দ করে যাচ্ছে টিক টিক টিক। সময় এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত তালে।
মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়ায় সোবহান। হাত দিয়ে চুল ঠিক করে। তারপর আস্তে আস্তে বলে, আপনি ঠিকই বলেছেন, এরপর এক সঙ্গে ঘর করতে পারবেন না আপনি সায়মাকে নিয়ে ওকে আমি ভালবাসি। ওকে আমি নিয়ে যেতে চাই। ওকে আমি বিয়ে করতে চাই।
একটু থেকে টেনে বলে, এ কলঙ্কের আঁচ একটুও আপনার গায়ে লাগবে না। ধ্ব দায়দায়িত্ব আমার আর সায়মার। সব স্ক্যান্ডাল মাথায় নিয়ে আমরা বেঁচে থাকতে চাই। এগুতে চাই। বলতে বলতে সায়মার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সোবহান। ওর গা ঘেঁষে।
হ্যাঁ, চলে যাও। তোমরা, আজই এক্ষুণি। ডাইভোর্সের ফরমালিটি আমি কালই সেরে ফেলব। আরও দ্রুত পায়চারি করছে আতিক চৌধুরী। রাগে দগদগে ঘায়ের মতো লাল হয়ে উঠেছে ওর চোখ দুটো।
.
আজ আর টেবিলের ওপর পা দুটোদুলে ঝুলন্ত বাদুড় হয়ে বসেনি আতিক চৌধুরী। লোদা হয়ে বসেছে টিল্টিং চেয়ারটা?। পায়ে আগের মতই চকচকে ব্যালি সু। দারুণ রিলা ওর চোখমুখ। টেলিফোন ডায়েল করে আস্তে আস্তে।
হ্যালো, ফাওজিয়া, আমি আতিক। …..এ কয়টা দিন ব্যস্ত ছিলাম। তাই ফোন করতে পারিনি। হাঁ চলে গেছে ওরা…..জানি না কোথায় উঠেছে…হয়তো সোবহানের দেশের বাড়িতে…আজ এসো সন্ধ্যার পর….বাসা তো খালি…আর কেউ নেই…ঠিক দাঁড়ানো পাবে আমাকে দরজার সামনে….আরে বাবা, ছয়টা মাস তো সময় দাও….নইলে লোকে আমাদের সন্দেহ করবে…হ্যাঁ, উইথ এ ক্লীন সেট…..।
ফোনটা নামিয়ে রেখে বলে আতিক, গুড।
ফাঁদ – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
রাত অনেক হলে বাগানের দিক থেকে ক্রাঁও ক্রাঁও করে একটা পেঁচা ডেকে ওঠে। মল্লিকদের কুকুরটা সন্দিগ্ধভাবে দু-একবার ডেকেই সপ্রশ্ন চুপ করে যায়। আমি জানি, এইবার তার আসার সময় হয়েছে।
আমাদের বাড়িটা বেশ বড়। লোকজন তত কিছু নেই। ওপরে-নিচে চারটে করে আটটা ঘর। নিচের দুটো ঘরে থাকেন দূর সম্পর্কের আত্মীয় আর তাদের মেয়ে শ্রাবন্তী। একটা ঘরে পুরনো আসবাবের আবর্জনা। বাকিটাতে বাড়ির সাবেক আমলের চাকর ষষ্ঠীদাস। তার বয়সও প্রায় সত্তর হয়ে এল। সারারাত খকখক করে কাশে আর একটু শব্দ হলেই ঘড়ঘড়ে গলায় বলে, যাঃ! যাঃ! আমি জানি, কাকে সে এমন করে তাড়াতে চায়।
ওপরের চারটে ঘরে আমার জীবনযাত্রা। আমার আর শ্রুতির। শ্রুতি বড় ঘুমকাতুরে। সে কিছু টের পায় না। এই যে আমি কাকে এত রাতে দরজা খুলে দিই, কার সঙ্গে কথা বলি, কিছু না। আমার আদরের ভেতর শ্রুতি কখন গভীর ঘুমে এলিয়ে যায়। তার শরীরের শ্বাসপ্রশ্বাস শুনতে শুনতে হঠাৎ চমক ভাঙে প্রাকৃতিক সংকেতের মতো পেঁচার চিৎকার। তারপর বাগানের দিকে শনশন করে ওঠে বাতাস। গাছপালা দুলতে থাকে। পুরনো জানলাটা খটখট করে শব্দ করে। তারপর সিঁড়িতে যেন পায়ের শব্দ। সে আসছে উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠি। সিঁড়িতে যেন পায়ের শব্দ। সে ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না।
দরজা খুলে আমি একটু সরে দাঁড়াই। টের পাই তার ঘরে ঢোকা তার শরীরের গন্ধ। গন্ধটা ছেঁড়া ঘাসের মত কিংবা ভিজে মাটির মত, অথবা পাখির বাসার মত ঈষৎ ঝঝাল, সঠিক বলা কঠিন, কারণ তার গন্ধটা যেন খুবই প্রাকৃতিক। হয়তো সে প্রকৃতির খুব ভেতর দিকে চলে গেছে বলেই। জীবজগতের অবচেনায় এই গন্ধ থাকে কি? বুঝতে পারি না। তার অশরীরী শরীরের কোন গন্ধ থাকার কথা নয়। তাকে প্রশ্ন করলে সে বলে তাই বুঝি? জানি না তো।
তাকে বলি, তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে।
সে বলে, আমি তো এরকমই।
না। তুমি এরকম ছিলে না।
সে একটু হাসে। তা ঠিক। ছিলাম না।
কেমন ছিলে সে তো মনে পড়ে তোমার, নাকি পড়ে না?
বোকা। মনে না পড়লে এলাম কেন?
তাহলে তুমি নিজেকে দেখাও। আমারও তো তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে।
তুমি ভয় পাবে।
তোমাকে আমি ভয় পাব না স্মৃতি! তুমি আমারই অপরাংশ হয়েছিলে একসময়।
একটু পরে সে বলে, পারছি না। আমার কষ্ট হচ্ছে।
তাহলে থাক।
বরং চলো আমরা বাগানে যাই।…
আমরা বাগানে গিয়ে বসে থাকি। কথা বলি। পুরনো সব কথা…অতীত থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে। দুঃখের কথা। সুখের কথা। কিন্তু কথা শেষ হবার আগেই ষষ্ঠীদাসের ডাক শুনতে পাই। সে লণ্ঠন হাতে আমাকে ডাকতে ডাকতে এগিয়ে। আসে। সে বড় ধূর্ত মানুষ। সব টের পায়। আমাকে বকাবকি করে। বলে, ঘুম হয় না তো ডাক্তার দেখাচ্ছ না কেন? এমনি করে হিমে বসে থাকলে যে উন্টে অসুখে পড়বে।…
হতচ্ছাড়া ষষ্ঠীদাসের দৌরাত্ম্যে অবশেষে বাগানে গিয়ে কথা বলা ছাড়তে হল। কিন্তু বুঝতে পারলাম, কেন স্মৃতি ঘরে বেশিক্ষণ থাকতে চাইত না। শ্রুতিকে ও ঈর্ষা করত। ঘুমন্ত শ্রুতির পাশে গিয়ে দাঁড়ালে আমার খুব ভয় হত। বলতাম, ওখানে কী করছ? এখানে এস। শ্রুতি জেগে যেতে পারে।
