তিলকের বউয়ের চোখে তখন ছুরির ধার। তিলক বউকে এবার গ্রাহ্য না করে সাহসী হয়ে যায়। লাহিড়ী, লাহিড়ীর বউ দুজনেই বাধা দিয়ে বলে, এই না খিচুড়ির মেনু হল? তবে আবার বাজার কেন?
তিলক বলে, শুধু খিচুড়ি খাওয়ালে আমার বউয়ের প্রেসটিজ থাকবে? সেই সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা যদি না হয়? এই বর্ষার বাজারে যা ইলিশ উঠছে না?
তিলকের বউ তাড়াতাড়ি বলৈ, টিফিন ক্যারিয়ারটা দিয়ে দিই? আসবার পথে অন্নপূর্ণা হোটেল থেকে কিছু কষা মাংসও নিয়ে এসো।
তিলক এবার বিপদে পড়ে যায়। ও মনে মনে গজরায়, মাসের শেষ। পকেট ফাঁকা। হোক গে প্রেমিকা…। তিলক ভালই জানে বউ ঝুটঝামেলা পছন্দ করে না। বাড়িতে মাংস রান্নার ঝামেলা তুললে ও সুড়সুড় করে লেজ গুটিয়ে পালাবে। তিলক বলে, রেস্তারাঁর মাংস খাওয়াবে? তার চেয়ে বাড়িতেই তুমি মাংসটা…। তোমার হাতের কষা মাংস তো চমৎকার।
তিলকের বউ কিন্তু খুশি হয়। হেসে বলে, থাক এদের সামনে আর স্ত্রৈণভাব দেখাতে হবে না। অন্নপূর্ণার কষা মাংস তো তোমার খুব প্রিয়। বন্ধু আর বন্ধু-পত্নীকে তোমার প্রিয় রেস্তরাঁর কষা মাংসের টেস্টটা করানোর সুযোগ যখন পেয়েইছো…।
লাহিড়ী, লাহিড়ী বউ আর একবার বাধা দেয়। তিলকের বউ ততক্ষণে স্বামীর হাতে টিফিন ক্যারিয়ার আর বাজারের ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়েছে। জোর করে সরু এক ফালি হাসি টেনে বেরিয়ে যায় তিলক। ভাবে, এক মাঘে শীত যায় না। ও দুপুরে এর শোধ তুলবে। বউকে সে চেনে।
তাসের আড্ডায় ওরা তিনজন দারুণ জমাবে। তিলকের বউ তাস চেনে না। খেলতে জানে না। লাহিড়ীর বউ তাসে ওস্তাদ। তিলক তাস খেলতে খেলতে লাহিড়ীর বউয়ের চোখে চোখ ফেলতে ফেলতে মাংসের খরচের টাকাটা তুলে নেবে।
বাজার নামিয়ে তিলক বলে, কই গো শুনছ? নাও তুমি তোমার অতিথিদের ইলিশ মাছ ভাজা খাইয়ে শখ মেটাও। আমরা তাসে বসি।
তিলকের বউ বলে, ওমা সেকি! ওর সঙ্গে দুটো সুখ-দুঃখের কথা কইব না? সেজন্যই তো আটকালুম। এসো, এসো, ভাই…। লাহিড়ীর বউয়ের হাত ধরে তিলকের বউ প্রায় টেনেই নিয়ে যায় রান্নাঘরে। মোড়ায় বসতে দেয়।
তিলক চাপা নিঃশ্বাস ছেড়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়। তিলকের মনে হয়, সংসারের এই ম্যারাথন রেসে তিলক আর তার বউ যেন অনবরত ছুটছে। তিলক যতই আগে ছুটতে চাইছে, ততই সে পিছিয়ে পড়ছে। এভাবে তাকে হারিয়ে দিয়ে তিলকের বউ বিজয়িনীর হাসি নিয়ে যেন তিলককে বলছে, বোকা, বোকা, বোকা…।
তিলক ভাঙা মন নিয়ে তাসের আসরে বসে। কিন্তু এখানেও সে হেরে যায়। বিবিহীন তাসের আসরে ওর যেন সব গোলমাল হতে থাকে। রান্নাঘর থেকে তখন ভেসে আসে, তিলকের বউয়ের অজস্র কথা আর হাসির টুকরো। লাহিড়ীর বউয়ের রিনরিনে গলা।…
ঠগের ঘর – সুবোধ ঘোষ
ওখানে আলিপুরের আদালতের কাছে পথের উপর একটি বটের ছায়া। আর এখানে বেহালার এক বস্তির মধ্যে একটি মাটির ঘরের দরজার কাছে একটি তুলসীর বেদী।
রোজ যেমন, আজও তেমনিই ওই তুলসীর বেদীতে একবার মাথা ঠেকিয়ে কাজে বের হয়ে গিয়েছে রাইচরণ। কাজের মধ্যে হলো ওই এক কাজ। এতদূর পথ হেঁটে এসে আদালতের কাছে এই বটের ছায়ায় চুপ করে বসে থাকা।
রাইচরণের হাতের কাছে থাকে একটি হস্তরেখা-বিচার, অনেকগুলি কড়ি আর একটি চার আনা দামের পঞ্জিকা। চোখের সামনে মাটির উপর পাতা থাকে দাবার ছক এর মতো একটি ছক। সেই ছকের মধ্যে নানারকম অঙ্ক কিলবিল করে। কোথায় শনি, কোথায় রাহু আর কোথায় মঙ্গল অবস্থান করলে অদৃষ্টচক্রের কোথায় কী যে ঘটে যাবে, তার সব উত্তর ওই একটি ছকের মধ্যে নীরব হয়ে রয়েছে। একবার কেউ এসে রাইচরণের চোখের সামনে তার হাতটা এগিয়ে দিলেই হয় অথবা কেউ এসে শুধু তার রাশিটার নাম বলে দিতে পারলেই হয়। রাইচরণ তখনই একটি স্লেটের উপর খড়ি দিয়ে দেগে অঙ্ক কষে তার জীবনের অবধারিত পরিণাম, আসন্ন পরিণামের আভাস, এবং আরও অনেক কিছু বলে দেবে।
মানুষের কররেখা আর কপালরেখা দেখে, এমন কি স্বপ্নের একটা বর্ণনা শুনেও রাইচরণ ভবিষ্যতের অনেক ভালোমন্দ সম্ভাবনার কথা বলে দিতে পারে। বেতের খাঁচার মধ্যে একটা তোতা আছে। এই তোতার কেরামতিও অসাধারণ। মামলায় জিত হবে কি হবে না–হ্যাঁ কিংবা না? একআনা পয়সা রেখে জিজ্ঞাসু ব্যক্তি রাইচরণের সামনে চুপ করে বসে থাকে। একটি কাগজে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-কে মিশিয়ে দিয়ে তোতার সামনে ফেলে দেয়। তোতার কানে একটি কড়ি কিছুক্ষণ চুইয়ে রাখে রাইচরণ; তারপর বিড়বিড় করে, “দেবীর আজ্ঞা, দেবতার আজ্ঞা, ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের আজ্ঞা। ছুঁয়ে ফেল, নিয়তির পাখি।”
তোতাটি এতগুলি কাগজের পুরিয়া নেড়েচেড়ে ঠিক একটি পুরিয়া ঠোঁট দিয়ে কামড়ে ধরে, হঁ্যা কিংবা না। ‘হ্যাঁ’ দেখে খুশি হয় জিজ্ঞাসু, ‘না’ দেখে বিমর্ষ হয়।
স্কুলের ছেলে চুপিচুপি এসে জানতে চায়, পরীক্ষায় পাস আছে না ফেল আছে? রাইচরণ বলে, “তিনটি ফুলের নাম বলো।” ফুলের নাম শুনেই রাইচরণ বলে দেয়, “পাস।” স্কুলের ছেলে খুশি হয়ে দুটো পয়সা রাইচরণের হাতে তুলে দিয়ে চলে যায়।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেশির ভাগ সময়ই শুধু বসে বসে ঝিমোতে হয়। পথের উপর দিয়ে মাঝে মাঝে ভিড় যেন স্রোতের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যায়। কিন্তু এই বিপুল জনতার ভেতর থেকে কজনই বা অদৃষ্টের কথা জেনে নেবার জন্য। শ্যত হয়? দু’পয়সা থেকে দু’আনা, এই তো গণনার দক্ষিণা। সন্ধ্যা হলে যখন পয়সা গোনে রাইচরণ, তখন বুকের ভেতরটা ভয়ে সিরসির করে ওঠে। মাত্র তেরো আনা! কী করে দিন চলবে?
