অষুধ-টষুধ খাইছো কুনদিন?
অষুধ আছে? আপনার কাছে?
হাসলেন আরজান কবিরাজ। অষুধ নেই আবার! সব রোগের অষুধ আছে। সাপের বিষ আছে না? সাপের বিষ দিয়া অষুধ হয়। সেই অষুধে অমৃত পয়দা হয়। সেই অষুধে হয় না হেনো কাজ নেই। কতো মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে তার অষুধ।
অষুধ, বিচিত্র গন্ধ এবং নেপথ্যের খিলখিল করা বুকে-তালা মারা হাসি তারু মিয়াকে বিদিশা করে ফেলেছিল। এবং আরেকদিন যখন হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোয় নদিনাকে দেখল আর হুঁশ রইল না তার। তার দীর্ঘ শক্ত সমর্থ ধ্বটা দেহ যেন সাপের বিষের ভারে অবশ হয়ে গিয়েছিল।
বাতাসে টিম টিম করে ঝিমানো হ্যারিকেনে কাঁপন লাগে, মাঝে-মধ্যে দপ করে জ্বলে ওঠে, কিন্তু তাতে কোন সাহায্য হয় না। পর্দার আড়াল থেকে করে জ্বলে ওঠে, কিন্তু তাতে কোন সাহায্য হয় না। পর্দার আড়াল থেকে মধ্যে মধ্যে নদিনা কথা বলে, মাঝে মধ্যে বলে ওর মা। কি একটা পান বানিয়ে দেয় নদিনা, নাকি তার মা, মুখে দিলে মিলিয়ে যায়। আর রাজ্যের গন্ধ; মুখের ভিতরে যেন একেবারে বেচায়েন অবস্থা। হুঁকোর গুড়ুক গুড়ুক শব্দ। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসতে আসতে একদিন এসে দেখল কবিরাজ চাচা গেছে সদরে অষুধ আনতে। সেই কথা বলল নদিনা। দরমার দরজা ভেদ করে একেবারে দোকান ঘরে এসে হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোয় নদিনাকে দেখামাত্র বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যেতে পারলে যেন শান্তি পেত তারু মিয়া, সন্তানহীন সুখি কৃষক; গরব্বিী সুরুয বানুর প্রাণের মানুষ তারু মিয়া।
কিয়ের অষুদ লাগবো কন।
কান লাল হয়ে গেল তারু মিয়ার। তাহলে জানে, কিসের অষুধের জন্য রোজ এখানে তামাক খায় এসে সে। কিন্তু চাষা-ভূষা মানুষ কি কথা কইবে সে! কথা তো কতো কিছুই বলতে চাইল, জমা রইল পেটে, কিন্তু মুখের আব্রু ভেদ করে কথাকে বাইরে আনা কী যে কষ্ট সে নদিন বুঝবে না।
–হর হর কইরা কথা কয় বাবার সাথে, আমার সাথে একটা কথাও কইতে পারে না-কি মানুষ।
ভিতর থেকে ওর মা সাহায্য করে, তুমি বইসো বাবা, নদি তামুক দে বাবারে।
তামাক নিয়ে আসে নদিনা। পান নিয়ে আসে। ওর বাবার গদিতে গিয়ে বসে। তারু মিয়া চোখ মুখ বন্ধ করে পান চিবোয় আর হুঁকোয় টান দেয়। যা একখানা শরীর কাঁপানো আরাম লাগছে না তার! তার মধ্যে কি কথা?
নদিনা আস্তে আস্তে সরল গলায় বলে, একটু বা ফিসফিসানির টান আছে গলায়, ফিসফিসানির বাতাস বুঝিবা মুখের পানের গন্ধের সঙ্গে কানে এসে লেগে যায়, বলে, অষুদে কোন কাজ হইলো?
লজ্জা নেই শরম নেই কিছুই আটকায় না তার মুখে। ওকি জানে কিসের অষুদের জন্য তারু মিয়া এখান আসে যায়?
জান? জিজ্ঞেস করবে তাকে? দূর, তাও কি সম্ভব?
নদিনাই, বলে, আবার দোষ কার, ঘরের না বাইরের সেইটা আগে বাইর করেন, বুঝছেন? তারপর জায়গা মতো অষুদ দেন। আতারে পাতারে খালি গুতাগুতি করলে লাভ হইবো না।
বলে কি! ছি ছি ছি। হুঁকো থেকে মুখ তুলে ওর দিকে তাকালো যখন তারু মিয়া, দেখল অন্ধকারে জ্বল জ্বল করছে এক জোড়া চোখ, দেখল ঘাড় পেঁচানো শাড়ির আঁচল দুই হাতের আঙুলে কুটছে বটে, কিন্তু চোখ তার তারই দিকে ধরে কেমন রহস্যময় এলোমেলো বাউরি বাতাসের মতো উদাসকরা।
নদিনা বলে, ধরেন আরেকটা পান খান।
অনেক রাতে ও যখন ওদের ঘর থেকে বের হয়ে পথে নামল, জেলা বোর্ডের রাস্তার দুধারে ধান ক্ষেতে তখন মিঠে বাতাস। ওর লুঙ্গি উড়িয়ে নিচ্চে। পাঞ্জারি বুকে ওম দিচ্ছে কইর পাখি। একটা গান ধরল, তারু মিয়া ও জ্বালায়ে চান্দের বাতি, জেগে রব সারারাতি গো, কর কথা শিশিরের সনে ওর ভমরা; নিশিতে যাইয়া ফুলবনে। না, গলা ছেড়ে নয়, চাপা গলায়, এমন করে, যেন সে গান সে কেবল নদিনাকেই শোনাচ্ছে।
হঠাৎ ওর মনে হলো, কে যেন পেছন পেছন আসছে। পায়ের শব্দ। কে! নদিনা! অসম্ভব! মনের ভুল।
একটু পর আবার পষ্ট শব্দ। মনের ভুল নয়। দাঁড়িয়ে পড়ে, তাকায় পেছন দিকে। সাবধানে পরিষ্কার গলায় বলে, কেডায়?
একটা দলাদলা অন্ধকার কাছে এল। এসে একটা মানুষের আকৃতি নিল। চিনতে পারল না তারু মিয়া, প্রশ্ন করল একটু জোরে, কেডা?
আমি।
আমি-র নাম নাই?
আমি-র নাম মদন, আপনের শালা।
মদন!
বিস্ময়ের পার নেই। মদন, শ্বশুরবাড়ির লোক। কিছুদিন হলো তাদের বাড়িতে এসেছে। বাইরের ঘরে থাকে খায়। ড্যাবড্যাবে চোখ, উনিশ বিশ বছর বয়স কিন্তু গায়ে গতরে আছে বেশ।
তুমি মদন! কই গেছিলা?
বাজারে। বুজির লই অযুদ আনতে গেছিলাম।
এত রাত্রে? কিয়ের অষুদ?
মাথা ধরার।
এত রাত্রে?
মদন সে কথার জবাব দেয় না। পাল্টা প্রশ্ন করে সন্দেহবিহীন গলায়, আপনে কই গেছিলেন এত রাত্রে দুলা ভাই?
প্রশ্নটাকে বিশ্বাস করে না তারু মিয়া। প্রশ্নটা মিথ্যা। মাথা ধরা, অষুদ এবং এই প্রশ্ন সবগুলো ভুয়া। ফাঁকি। আসলে সুরুয বানু তার পেছনে চর লাগিয়েছে। ছোঁকরা চালাক চতুর বেশ। নিশ্চয়ই আড়ি পেতে সব শুনেছে। সুরুয বানুর কাছে গিয়ে বলবে, রিপোর্ট করবে সব। মনে মনে বিপদ গুনল তারু মিয়া। সুরুয বানুর কোন সন্তান হয়নি, এটিই তার একমাত্র দোষ, ওর আর সব গুণ। বড়লোক বাপ, অঢেল সম্পত্তি। একমাত্র মেয়ে। বাপ মরলে সব সম্পত্তি এই সুরুয বানুর। এটা খুব হাল্কা চিন্তার কথা নয়। অবশ্য সম্পত্তি তারু মিয়ারও আছে অনেক, তা থাকলেই বা। আছে বলে আরও হবে না কেন? আরও হবে, সঙ্গতভাবে যা পাবার সব পবে। তবে, কোন ওয়ারিশ যদি না থাকল তাহলে কার জন্যে করবে এত সম্পত্তি? আর এটা কি রকম কাজ হলো? সুরুয বানু তার পেছনে নোক লাগিয়েছে।
