“দাদা, এই লোকটাই।”
পঞ্চানন্দ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “আমি না। কালীর দিব্যি, আমি কিছু করিনি।”
আংটি বলল, “তুমি নয় তো কে চাঁদু? কাল মাঝরাতে দাদুর ল্যাবরেটরির কাছে ঘুরঘুর করছিলে, দেখিনি বুঝি?”
কপাটের আড়াল থেকে আর-একজনও বেরিয়ে এল, ঘড়ি। খুব ঠান্ডা চোখে পঞ্চানন্দকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলল, “খুব গুলগপ্পো ঝেড়ে আমার বাবাকে বশ করে ফেলেছ কেমন?”
পঞ্চানন্দ অমায়িক হেসে বলল, “আজ্ঞে, অনেক কথার মধ্যে এক-আধটা বেফঁস মিথ্যে কথা বেরিয়ে যেতে পারে বটে, কিন্তু সে তেমন না ধরলেও চলে। হরিবাবুকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন, আমি তাঁকে আগেভাগেই সাবধান করে দিয়েছিলুম কি না যে, লোক আমি তেমন সুবিধের নই।”
“বটে! তা হলে তো ধর্মপুর যুধিষ্ঠির। বাবাকে একটা চাবি দিয়েছ শুনলাম, আর নাকি গুপ্তধনের সংকেত!”
জিব কেটে পঞ্চানন্দ মাথা নাড়ল, “আজ্ঞে ওসব বুজরুকি কারবার আমার কাছে পাবেন না। গুপ্তধনের কথা শিবুবাবু আমাকে বলতে বলেননি, আমিও বলিনি।”
“তাহলে কথাটার মানে কী?”
পঞ্চানন্দ কাঁচুমাচু হয়ে বলে, “ সে কি আমিই জানি? যেমন শুনেছি তেমনি বলেছি। তা ঘাড়খানা এবার ছেড়ে দিলে হয় না? বড় টনটন করছে। আমার আবার একখানা বই দু’খানা ঘাড় নিই।”
আংটি একটু হেসে একখানা ঝাঁকুনি দিয়ে ঘাড়টা ছেড়ে বলল, “একটা কথা শুনে রাখো। আমার বাবা বেজায় ভাল মানুষ। তাকে যদি বোকা বানানোর চেষ্টা করো, তা হলে মাটিতে পুঁতে ফেলব ওই কেয়াঝোঁপের তলায়।”
পঞ্চানন্দ উদাস মুখে বলল, “তিনটে লাশ ছিল, চারটে হবে।”
“তার মানে?”
“আজ্ঞে সে এক বৃত্তান্ত। কিন্তু আপনাদের যা ভাবগতিক দেখছি, বেশি বলতে ভরসা হয় না। হয়তো দিলেন কষিয়ে একখানা ঘুসো!”
ঘড়ি গম্ভীরভাবে বলল, “গুলগপ্পো যারা মারে তাদের মাঝে-মাঝে ঘুসো খেতেই হবে। এবার বলো তো চাঁদু, মাঝরাত্তিরে দাদুর ল্যাবরেটরিতে গিয়ে ঢুকেছিলে কেন?”
“আজ্ঞে ওই গজটার জন্য। কতবার পইপই করে বলেছি, ওরে গজ, মানুষ হ। পরে বাড়িতে ঢুকে ওসব করা কি ঠিক? তা ভাল কথায় কবেই বা কান দিয়েছে?”
“গজ মানে কি গজ-পালোয়ান? সে কেন আমাদের বাড়িতে ঢুকবে?”
“সেইটেই তো কথা। পেত্যয় না হয় ন্যাড়াবাবুর কাছ থেকেই শুনে নেবেন’খন।”
ঘড়ি ঠাণ্ডা চোখে আবার একবার তাকে জরিপ করে নিয়ে বলল, “তোমার স্যাঙাতরা কারা ছিল?”
“স্যাঙাত! আজ্ঞে কোনওকালেই আমার স্যাঙাত-ট্যাঙাত নেই। বারবার একাবোকা ঘুরে বেড়াই।”
“তবে কেয়াঝোঁপের আড়াল থেকে তিনটে লোক যে বেরিয়ে এল, তারা কি ভূত?”
পঞ্চানন্দ তাড়াতাড়ি হাতজোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলল, “ও কথা বলবেন না। এখনও বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করে। একেবারে জলজ্যান্ত তেনারা। আমার হাত দুয়েকের ভিতর দিয়েই হেঁটে গেলেন। গায়ে সেই বোঁটকা গন্ধ, উলটো দিকে পা, হাওয়ায় ভর দেওয়া শরীর….ওরে বাবা! ভাবতেও ভয় করে।”
ঘড়ি ভ্রূ কুঁচকে চিন্তিতভাবে পঞ্চানন্দের দিকে চেয়ে বলল, “আমরা ভূতটুত মানি না। ওসব বুজরুকি আমাদের দেখিও না। দাদুর ল্যাবরেটরির দিকে অনেকের নজর আছে, আমরা জানি। কিন্তু আমরাও বোকা নই, বুঝলে? ওই তিনটে লোক তোমারই দলের।”
পঞ্চানন্দ খুব গম্ভীর হয়ে বলল, “আজ্ঞে ভূত যদি নাও হয়, তা হলেও আমার সঙ্গে তাদের কোনও সাঁট নেই। তবে ওইখানে তিনটে লাশ বহুঁকাল আগে আমি আর শিবুবাবু মিলে পুঁতেছিলুম। তিনটেই সাহেব। গায়ে-গতরে পেল্লায়। বিশ্বাস না হলে জরিবাবু বা হরিবাবুকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।”
ঘড়ি বলল, “লাশ এল কোথা থেকে?”
পঞ্চানন্দ দু’পা হটে বলল, “আজ্ঞে রদ্দা-ফদ্দা চালিয়ে বসবেন না যেন। এই সময়টায় আমার বড় খিদে পায়। আর খিদের মুখে মারধোর আমার সয় না।”
“ঠিক আছে, মারব না। বলল।”
“আজ্ঞে শিবুবাবু নিজের জান বাঁচাতে ওই তিন সাহেবকে খুন করেন। তারপর আমরা ধরাধরি করে……
“মিথ্যে কথা!”
“আজ্ঞে খুনটা আমি স্বচক্ষে দেখেছি। তবে কিনা নিজের জান বাঁচাতে খুন করলে সেটা খুনের মধ্যে ধরা যায় না।”
‘জান বাঁচাতে কেন? ওরা কি দাদুকে মারতে চেয়েছিল?”
পঞ্চানন্দ বলল, “সে কে আর না চাইত বলুন। শিবুবাবু মরলে অনেকেরই সুবিধে ছিল।”
“খোলসা করে বলো।”
পঞ্চানন্দ বলল, “বলব’খন। আগে চানটান করে দুটো মুখে দিয়ে নিই, পিত্তি পড়লে আবার অনর্থ হবে’খন।”
কী ভেবে, যেন ঘড়ি আর আংটি এ-প্রস্তাবে আপত্তি করল না। বলল, ঠিক আছে।”
১৯.
হরিবাবুর খোকা দুটি যে বিশেষ সুবিধের নয়, তা পঞ্চানন্দ লহমায় বুঝে গেল। ওদের একজন হল গোমড়ামুখো গুণ্ডা, অন্যটা ছ্যাবলা গুণ্ডা। ছ্যাবলাদের তেমন আমল না দিলেও চলে, কিন্তু গোমড়াগুলোই ভয়জনক। কখন কী ভাবছে তা মুখ দেখে টের পাওয়া যায় না। তবে যতই গুণ্ডা হোক, পঞ্চানন্দ লক্ষ্য করেছে যে, ওরা ওদের বাপকে সাঙ্ঘাতিক ভয় পায়।
চানটান করে পঞ্চানন্দ যখন গিয়ে খেতে বসল, তখন দুপুর বেশ গড়িয়ে গেছে। এ-সময়ে গরম ভাতের আশা বৃথা। পঞ্চানন্দ ধরে নিয়েছিল, ঠাণ্ডা কড়কড়ে ভাত আর তলানি কিছু ডাল তরকারি জুটতে পারে।
কিন্তু খেতে বসার পর বামুনঠাকুর যখন ধোঁয়া-ওঠা ভাত আর গরম-গরম ডাল-তরকারি আর মাছের ঝোলের বাটি সাজিয়ে-দিল, তখন রীতিমত অবাক। ভাত ভাঙতে ভাঙতে বলল, “জরুরি একটা কাজে গিয়েছিলাম কিনা, তাই একটু দেরি হয়ে গেল।”
