“আজ্ঞে। আমি হলুম গে হরিবাবুর ম্যানেজার। তাঁর বাবার আমল থেকেই যাতায়াত। মাঝখানে কয়েকটা বছর হিমালয়ে তপস্যা করতে যাওয়ায় সম্পর্কটা একটু ঢিলে হয়ে গিয়েছিল।”
সকলে বেশ সম্ভ্রমের চোখে পঞ্চানন্দের দিকে তাকায়।
কেঁদো বলে, “তা দাদার নামটা কী?”
“পঞ্চানন্দ। ওটি সাধনমার্গের নাম। ওতেই ডাকবেন।”
“আমাদের মাপ করে দেবেন। খুব অন্যায় হয়ে গেছে।”
পঞ্চানন্দ উদার গলায় বলল, “করলাম।”
১৮.
ছেলেগুলো এসে পঞ্চানন্দকে একেবারে ঘিরে ধরল। ভারি লজ্জিত তারা। ষন্ডামতো একটা ছেলে বলল, “পঞ্চানন্দদা আমরা যে আপনার সঙ্গে বেয়াদপি। করে ফেলেছি সে কথা গজদাকে বলবেন না।”
পঞ্চানন্দ একগাল হেসে বলল, “আরে না। তোমরা সবাই বুঝি গজ’র ছাত্র? বাঃ বাঃ। তা গজ একটু-আধটু-কুস্তি শিখেছিল বটে শেরপুরে থাকতে। আমিই শেখাতুম। অবশ্য আসল-আসল প্যাঁচগুলো শেখানোর সময়ই তো পেলাম না। হিমালয় থেকে আমার ডাক এসে গেল কিনা। তবে শুনেছি, গজ বেশ ভালই লড়েটড়ে।”
ছেলেগুলো একথায় মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল। ষভাটা বলল, তা হলে আপনিই কেন আমাদের আজ একটু তালিম দেন না!”
পঞ্চানন্দ জিব কেটে বলল, “ও বাবা, গুরুর বারণ। ঠিক বটে, এক সময়ে যারা ধর্ম কর্ম করত, তারাই নানারকম শারীরিক প্রক্রিয়া আর কূট পাঁচ আবিষ্কার করেছিল। এই যেমন যুযুৎসু, কুংফু আসন। কিন্তু আমার গুরু আমাকে ও লাইনে একদম যেতে বারণ করেছেন। আসলে হল কী জানো?”
“কী পঞ্চানন্দদা?”
“যার সঙ্গেই লড়তে যাই তারই ঘাড় ভাঙে কি হাত ভাঙে কি ঠ্যাং ভাঙে। যত মোলায়েম করেই ধরি না কেন, একটা কিছু অঘটন ঘটেই যায়। সেবার তো গ্রেট এশিয়ান সার্কাসের হাতিটা খেপে বেরিয়ে পড়ল। বিস্তর লোক জখম হল তার পায়ের তলায় আর শুড়ের আছাড়ে। অগত্যা আমি গিয়ে হাতিটাকে সাপটে ধরলুম। ও বাবা, মড়াত করে দুটো পাঁজর ভেঙে হাতিটা নেতিয়ে পড়ল। তারপরই গুরু বারণ করলেন, ওরে তোর শরীরে যে স্বয়ং শক্তি ভর করে আছেন। আর কখনও কুস্তিটুস্তি করতে যাস না।”
ছেলেগুলো মুখ তাকাতাকি করতে লাগল। ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে। না করলেও পঞ্চানন্দের ক্ষতি নেই। ছেলেগুলোকে অন্যমনস্ক রাখাটাই তার উদ্দেশ্য। হলঘরের ভিতর থেকে যে যান্ত্রিক শব্দটা আসছে সেটা ওদের কানে যাওয়াই ভাল। পঞ্চানন্দকে একাই ব্যাপারটা দেখতে হবে। ষটা বলল, “এক-আধটা প্যাঁচও কি শেখাবেন না দাদা?”
পঞ্চানন্দ গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল, “উপায় নেই রে ভাই। তবে এই বাড়িটা কিনে যদি সাধনপীঠ বানাতে পারি তখন দেখা যাবে।”
এ-কথায় ছেলেগুলো ফের মুখ-তাকাতাকি করল। কেঁদো চেহারার ছেলেটা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার বলল, “দাদা, একটা কথা বলব? আপনি যদি ডাইরেক্টলি আমাদের না শেখান তা হলেও ক্ষতি নেই। আমরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে কুস্তি করব, আর আমাদের কোথায় ভুল হচ্ছে তা আপনি দেখেদেখে বলে দেবেন, তা হলে কেমন হয়?”
সব ছেলেই একথায় সায় দিয়ে উঠল। পঞ্চানন্দ মাথা চুলকে বলল, “সেটা মন্দ হবে না। তা তাই হোক।”
বাড়ির পিছন দিকটায় মাটি কুপিয়ে কুস্তির আখড়া হয়েছে। ছেলেরা সেখানে একটা গাছতলায় পঞ্চানন্দকে বেশ খাতির করে বসিয়ে নিজেরা দঙ্গলে নামল।
পঞ্চানন্দ খুব মাথা নাড়তে লাগল কুস্তি দেখে। এক-এক বার বলে ওঠে, “উহুঁহুঁ, হল না। পা-টা একটু কেতরে নিয়ে বল্টান মারতে হয়……আরে আরে, ওরকম পটকান দিতে হলে যে শিরদাঁড়া শক্ত রাখতে হয়……আহা হা, ওরকম ঠেলাঠেলি করলে চলে? পট করে কঁধ ছেড়ে কোমরটা ধরে নাও এইবেলা….ওটা কী হল হে? ছ্যা, ছ্যা, গজটা যে একেবারে কিছুই শেখায়নি তোমাদের!”
ঘন্টা দেড়েক এরকম চালিয়ে পঞ্চানন্দ ছুটি পেল। ঝিমঝিম করছে দুপুর। পঞ্চানন্দ পা টিপে টিপে বাড়িতে ঢুকে আবার সেই হলঘরটার দিকে এগোল।
হঠাৎই সাক্ষাৎ এক ডাইনিবুড়ি কোত্থেকে যে বকবক করতে করতে এসে উদয় হল, তা বলা শক্ত। তবে পঞ্চানন্দ একটা থামের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে পরিষ্কার শুনতে পেল বুড়িটা আপনমনে গজগজ করছে, “রোজ আমি হিরুকে এইখানে ঘাস খেতে বেঁধে রেখে যাই, লক্ষী ছাগল আমার কোনওদিন পালায় না। আজ কোন অলপ্লেয়ে যে বাছাকে আমার গেরাস করতে এল গো!”
বলতে-বলতে বুড়ি হাঁটপাট করে চারদিকে ঘুরছিল। শনের মতো সাদা চুল, শরীরের চামড়ায় শতেক আঁকিবুকি, মুখোনা শুকনো, চোখ গর্তে, হাতে একখানা গাঁটওলা লাটি।
পঞ্চানন্দ একটু গলাখাঁকারি দিল।
“কে রে? কোন মুখপোড়া? হিরিকে কি তুই গেরাস করেছিস রে ড্যাকরা? আয়, সামনে আয় তো!”
পঞ্চানন্দ একবার বলবার চেষ্টা করল,”আমি নয় গো, আমি নয়।”
কিন্তু কে শোনে কার কথা! বুড়ি একেবারে লাঠি উঁচিয়ে ধেয়ে আসতে আসতে বলল, “তুই না তো কে রে মুখপোড়া? তোর মুখ দেখলেই তো বোঝা যায় গোরু-ছাগল চুরি করে করে হাত পাকিয়ে ফেলেছিস। চোখ দেখলেই তো
বোঝা যায় তুই এক নম্বরের পাজি। তোকে আজ ঝেটিয়ে বিষ নামাব……”
পঞ্চানন্দ পিছু ফিরে চো-চোঁ দৌড় দিল। এ-কাজটা সে খুব ভাল পারে। দৌড়ে একেবারে হরিবাবুদের বাড়ির কাঁঠালতলায় এসে পঞ্চানন্দ হাঁফ ছাড়ল, “খুব বাঁচা গেছে বাপ্। ওঃ, বুড়িটা কী তাড়াই না করেছিল!”
জামা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে পঞ্চানন্দ ধীরেসুস্থে বাড়িতে ঢুকতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ কাঁক করে কে যেন তার গর্দানটা বাগিয়ে ধরল খিড়কির দরজার কপাটের আড়াল থেকে।
