ঘড়ি চাপা গলায় বলল, “আংটি, চল, কেটে পড়ি। এখানে আর থাকা বিপজ্জনক।”
আংটি মাথা নেড়ে বলে, “সেই ভাল।” দুই ভাই নেমে পড়ল।
এ জায়গাটা তাদের চেনা। বহুবার এসেছে। লালমণিপুর। এখানে মন্টু নামে ঘড়ির এক বন্ধু থাকে; বেশ বড়লোক।
ঘড়ি বলল, “চল, মন্টুর মোটর সাইকেলটা নিয়ে ফিরে যাই।” মন্টুর বাড়ি বেশি দূর নয়। রাস্তার ওপরেই তাদের বিশাল বাগানঘেরা বাড়ি।
মন্টু বাড়িতেই ছিল। তারা যেতেই বেরিয়ে এসে বলল, “আরে! তোদের কী খবর বল তো! আজ এত বড় একটা ম্যাচ জেতার পর কোথায় গায়েব হয়ে গিয়েছিলি? সবাই তোদের খোঁজ করে অস্থির। কোন্ রাজা নাকি তোদের নিয়ে গেছে।”
ঘড়ি বেশি ভাঙল না। বলল, “পরে সব বলব। এখন তোর মোটর সাইকেলটা দে। বাড়ি ফিরতে হবে।
১১-১৫. দুই ভাই মোটরসাইকেল দাবড়ে
দুই ভাই মোটরসাইকেল দাবড়ে যখন বাড়ি ফিরল তখন বেশ একটু রাত হয়ে গেছে। বাড়ির লোক চিন্তা করতে শুরু করেছে। হরিবাবু বাইরের বারান্দায় পায়চারি করতে করতে স্বগতোক্তি করছেন, “মরবে…..মরবে, দুটোই একদিন বেঘোরে মরবে। ওসব বর্বর খেলার পরিণতি ভাল হওয়ার কথা নয়। ফাঁইনার সেন্স নষ্ট হয়ে যায়, বুদ্ধি লোপ পায়, হিংস্রতা আসে, মানুষ পশু হয়ে যায়…”
খেলাধুলো জিনিসটা যে এত খারাপ তা পঞ্চানন্দ জানত না। সে খুব গম্ভীর মুখে হরিবাবুর পিছু পিছু পায়চারি করছিল। আর মাঝে-মাঝে “খুব ঠিক কথা, “বেড়ে বলেছেন, সে আর বলতে”–এইসব বলে যাচ্ছিল।
হরিবাবু তার দিকে চেয়ে হঠাৎ বললেন, “তুমি তো অনেক ফিকির জানো। ছেলে দুটোর কী হল একটু দেখবে?”
পঞ্চানন্দ বিগলিত হয়ে বলল, “আজ্ঞে বৃথা ভেবে মরছেন। আপনার ছেলে দুটো তো আর দুধের খোকা নয়। ঠিক ফিরে আসবে?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হরিবাবু বললেন, “দুধের খোকা যে নয় তা আমি বিলক্ষণ জানি। দুটোই ভয়ংকর রকমের ডাকাবুকো গুন্ডা। প্রায়ই মারপিট করে আসে। ওদের শত্রুর অভাব নেই। তার কেউ যদি গুম-খুন করে বসে, তা হলে কী হবে?”
পঞ্চানন্দ মাথা চুলকে বলল, “তা হলে তো খুবই মুশকিল।”
হরিবাবু একটু কঠিন চোখে পঞ্চানন্দের দিকে চেয়ে বললেন, “ওবেলা তো দিব্যি ঘাট চালালে।”
পঞ্চানন্দ বিগলিত হয়ে বলল, “আজ্ঞে সে আর বলতে। মাংসটা কিন্তু মশাই খুব জমে গিয়েছিল। আর-একটু ঝাল হলে কথাই ছিল না। তারপর ধরুন পোলাওয়ের কথা! তারটা খুব উঠেছিল বটে, তবে কিনা জাফরান না পড়লে পোলাও ঠিক যেন পোলাও-পোলাও লাগে না। তবে ফুলকপির রোস্ট গিন্নিমা একেবারে সোনার ফ্রেমে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন বটে…..”হরিবাবু কঠিন গলায় বললেন, “ঘাট ফের এ-বেলাও তো চালাবে।”
পঞ্চানন্দ মাথা চুলকে বলল, “আজ্ঞে হিমালয়ে গিয়ে যখন থাকি, তখন দিনান্তে একটা পাকা হতুকি ছাড়া কিছুই জোটে না। এই আপনাদের কাছে যখন আসি-টাসি, তখনই যা আজ্ঞে, একটু ভালমন্দ জোটে। বলতে নেই আজ্ঞে শ্রীভগবানের আশীর্বাদে এ-বেলাও একটু ঘ্যাঁট চালানোর ইচ্ছে আছে।”
“তা চালাবে চালাও, কিন্তু বসে-বসে খাওয়া আমি অপছন্দ করি। যাও গিয়ে ছেলে দুটোর একটা হদিস করে এসো।”
পঞ্চানন্দ মাথা চুলকে বলল, “প্রস্তাবটা মন্দ নয়। হাঁটাহাটি দাপাদাপি করলে খিদেটাও চাগাড় দিয়ে উঠত। কিন্তু মুশকিল কী জানেন। আপনার ছেলেদের তো আমি চিনি না। আপনাদেরই সব ছোট-ছোট দেখেছি। সেই আপনারা বড় হলেন, ছেলের বাপ হলেন, ভাবতেও অবাক লাগে। ভাবি দুনিয়াটা হল কী!”
হবিবাবু যথেষ্ট রেগে গলা রীতিমত তুলে বললেন, “ওসব বাজে কথা ছাড়ো। তুমি না চিনলেও ঘড়ি আর আংটিকে তল্লাটের সবাই চেনে। জিজ্ঞেস করে করে খোঁজ নাও। শুনেছি, কোনও রাজা নাকি তাদের নিয়ে গেছে।”
পঞ্চানন্দ অবাক হয়ে বলে, “রাজা! এ তল্লাটে আবার রাজা-গজা কে আছে বলুন তো?”
“সে কে জানে। হাতরাশগড়ে একসময়ে রাজা ছিল একজন। সে কবে মরে হেজে গেছে। তা সে জমিদারি রাজত্বও কিছুই তো আর নেই। সব জঙ্গল হয়ে আছে। তাই ভাবছি হাতরাশের রাজা আবার কে এল ঘড়ি আর আংটিকে নিয়ে যেতে! কোনও বদমাশের পাল্লায় পড়ল না তো!”
পঞ্চানন্দ মাথা নেড়ে বলল, “আজকাল গুন্ডা-বদমাশের অভাব কী! চার দিকেই তো তারা—“
হরিবাবু খেঁকিয়ে উঠে বললেন, “সেইজন্যই তো খোঁজ নিতে বলছি।”
“যাচ্ছি আজ্ঞে”। ‘ তবে পঞ্চানন্দকে যেতে হল না। বারান্দা থেকে সে সবে সিঁড়িতে পা বাড়িয়েছে, এমন সময় বিকট শব্দে হুড়মুড় করে একটা বিশাল মোটরসাইকেল এসে গা ঘেঁষে ব্রেক কষল। পঞ্চানন্দ সড়াত করে পা-টেনে নিয়ে বলল, “বাপ রে!”
হরিবাবু কটমট করে ঘড়ি আর আংটির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। তারপর বিকট হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “কোথায় ছিলি?”
ঘড়ি আর আংটি খুবই দামাল আর দুরন্ত বটে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তারা তাদের নিরীহ কবি-বাবাকে ভীষণ ভয় পায়। হরিবাবু তাদের কখনও মারধর করেননি, এমনকী বকাঝকাও বিশেষ করেন না। বলতে কী, ছেলেদের খোঁজ খবরই, তিনি কম রাখেন। তবু ঘড়ি আর আংটি বাপের সামনে পড়লে কেমন যেন নেংটি ইঁদুরের মতো হয়ে যায়।
দুই ভাই মোটর সাইকেল থেকে নেমে কাঁচুমাচু হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। “কোথায় গিয়েছিলি? মোটরবাইকই বা কোথায় পেলি? কতবার বলেছি না মোটরবাইক, সাইকেল, এসব হল শয়তানের চাকা? দু চাকায় যে গাড়ি চলে তাকে কোনও বিশ্বাস আছে?”
