১০.
কেউ তাড়া করছে না দেখে ঘড়ি আর আংটি দৌড়ের গতি কমিয়ে দিল। কুয়াশা এবং গাছগাছালির জন্য জোরে দৌড়নো সম্ভবও নয়। অন্ধকার হয়ে। এসেছে। দুলকি চালে দৌড়াতে দৌড়াতে ঘড়ি বলল, “খুব বেঁচে গেছি। লোকটার গায়ে ভীষণ জোর।” আংটি বলল, “শুধু জোরই নয়, যে-দুটো সাঙ্ঘাতিক ক্যারাটের মার হজম করল, তাতেই বোঝা যায় মারপিটের লাইনের লোক। রাজা-ফাজা কিছু নয়।
বড় বড় গাছ সংখ্যায় কমে আসছে। জঙ্গলটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ক্রমে। ঘড়ি সামনের দিকে চেয়ে বলল, “আমরা বড় রাস্তার কাছাকাছি এসে গেছি। মনে হচ্ছে।”
বাস্তবিকই তাই। সামনে একটা বড়-বড় ঘাসের জঙ্গল। তারপরই বড় রাস্তা। সামনে লরি মেরামত হচ্ছে। এক-আধটা সাইকেলও যাচ্ছে আসছে।
লোকজন দেখে দুই-ভাই নিশ্চিন্ত হয়ে রাস্তায় উঠে এল। দু’পাশে তাকিয়ে দেখল, মহারাজার গাড়ির কোনও চিহ্নই নেই। এ জায়গাটা ঘড়ি বা আংটির চেনা জায়গা নয়। এদিকটায় তারা কখনও আসেনি।
হাট সেরে কয়েকজন পেঁয়ো লোক ফিরছিল। ঘড়ি তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করল, “এ জায়গাটার নাম কী?”
“হরিহরপুর।”
“আমরা শহরের দিকে যাব। কী ভাবে যাওয়া যায়?”
লোকটা একটু অবাক হয়ে বলল, “তার ভাবনা কী? একটু বাদেই বাস গাড়ি এসে যাবে। চেপে বসলেই শহরে নিয়ে গিয়ে তুলবে। ওই বোধহয় আসছে, এ পাশটায় দাঁড়িয়ে হাত তুলুন।”
ঘড়ি আর আংটি দেখল সত্যিই একটা বাস আসছে। খুবই লজ্রঝড়ে চেহারা। ভিড়ে ভিড়াক্কার। ভিড় দেখে তারা আজ খুশিই হল।
বাসে উঠে দুই ভাই ভিড়ের ভিতর সেঁদিয়ে দাঁড়াল। এতক্ষণে একটু নিশ্চিন্ত লাগছে।
দুতিনটে স্টপ পার হওয়ার পর কিছু লোক হুড়মুড় করে নেমে যেতে বাসটা হঠাৎ বেশ ফাঁকা হয়ে গেল।..
হঠাৎ আংটি চাপা স্বরে বলল, “দাদা, পিছনে দ্যাখ।”
ঘড়ি তাকিয়ে দেখে থ হয়ে গেল। পিছনের সিটে জানালার ধারে একটা সুড়ঙ্গে লম্বা লোক বসে বসে ঢুলছে। বাসের আবছা আলোতেও লোকটার চেহারা ভুল হওয়ার নয়। রাজা নরনারায়ণের সেক্রেটারি।
লোকটা কী করে বাসের মধ্যে এল বুঝতে পারল না ঘড়ি। তবে সে চাপা স্বরে বলল, “মুখ ঘুরিয়ে রাখ। দেখতে পাবে।”
লোকটা অবশ্য দেখল না। বসে-বসে যেমন ঢুলছে তেমনই ঢুলতে লাগল। আড়চোখ চেয়ে ঘড়ি মাঝে-মাঝে দেখছিল, নোকটার ঘাড় লটপট করছে। মাথাটা বাসের ঝাঁকুনিতে মাঝে-মাঝে জোরসে ঠুকে যাচ্ছে জানালায়। তবু কী ঘুম বাবা!
একটুও চোখ মেলল না।
বাস থামছে। লোকজন নামা-ওঠা করছে। সেক্রেটারি নির্বিকার ঘুমোচ্ছ বসে বসে।
আংটি চাপা স্বরে বলল, “দাদা, লোকটা বোধহয় আমাদের দেখতে পেয়েছে। ঘুমের ভান করে নজর রাখছে।”
ঘড়ি তীক্ষ্ম চোখে আর একবার দেখে নিয়ে মাথা নেড়ে বলল, “তাও হতে পারে, তবে সাবধানের মার নেই। মুখটা আড়াল করে থাক।”
একটু বাদে কয়েকজন নেমে যাওয়ার পর দুই ভাই বসবার জায়গা পেয়ে গেল। বসে দুজনেই মাথা নামিয়ে রেখে আড়ে-আড়ে নজর রাখতে লাগল।
আশ্চর্যের বিষয়, সুড়ঙ্গে সেক্রেটারি একবারও চোখ মেলল না বা তাদের দিকে তাকাল না। সেক্রেটারির পাশে বসে লোকটা মাঝে-মাঝে বিরক্ত হয়ে ধমক নিচ্ছিল,”ও মশাই, গায়ের ওপর ওরকম হেলে পড়ছেন কেন? সোজা হয়ে বসুন না।
কিন্তু সেক্রেটারির তাতে ভূক্ষেপ নেই।
পাশে বসা লোকটা পেঁয়ো প্রকৃতির। বেশ জোরে জোরেই গজগজ করে বলতে লাগল, “সেই হরিহরপুর থেকেই এমন কাণ্ড শুরু করেছে যে, অতিষ্ট হয়ে গেলাম! এমন গায়ে-পড়া লোক জন্মে দেখিনি বাবা। কতবার সোজা হয়ে বসতে বলছি, তা ইনি কথাটা কানেই তুলছেন না। চাষার ঘুমকেও হার মানিয়ে দিয়েছেন।”
ঘড়ি আর আংটি সবই শুনল। পরস্পরের দিকে একটু তাকিয়ে নিল দুজনে।
সামনের একটা গঞ্জে বাসটা দাঁড়াতেই পেছনের সিট থেকে সেক্রেটারির পাশে বসা লোটা একটা পুঁটুলি নিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং নেমে পড়ল। সেক্রেটারি জানালায় হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে।
অনেকে নেমে যাওয়ায় সেক্রেটারির পাশে আর কেউ বসল না। বাস প্রায় ফাঁকা। আর দুমাইল দূরে শহর।
বাসটা আবার ছাড়তেই হঠাৎ পেছনের সিটে একটা বিকট শব্দ শোনা গেল। সকলে চমকে চেয়ে দেখে, সুড়ঙ্গে সেক্রেটারি মেঝের ওপর পড়ে আছে সটান হয়ে।
হৈহৈ করে ওঠে লোজন, “পড়ে গেছে……অজ্ঞান হয়ে গেছে…..জল…পাখা…।
ঘড়ি আর আংটি খানিকটা থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি অন্য সব লোকজনের সঙ্গে মিলেমিশে এগিয়ে গিয়ে দেখল।
যা দেখল, তাতে তাদের চোখ চড়কগাছ। এরকম ঘটনা তারা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।
লোকজন প্রচণ্ড চেঁচাতে লাগল, “রক্ত…..রক্ত……উরেব্বাস রে….. খুন……খুন….”
খুন যে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সেক্রেটারি উপুড় হয়ে পড়ে আছে। সমস্ত পিঠটা রক্তে ভাসাভাসি মাখামাখি।
বাস থেমে গেল। লোকজন সব নেমে পড়তে লাগল দুড়দাড় করে। বাইরে চেঁচামেচি শুনে আবার লোকজন জুটেও গেল অনেক।
এই চেঁচামেচি আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঘড়ি মাথা ঠাণ্ডা রেখে চটপট যা দেখার দেখে নিল। সেক্রেটারির পরনে সেই নীলচে ধূসর রঙের স্যুটটাই রয়েছে। লোকটার মাথার চুল পাতলা। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। পায়ে বেশ ঝচকচকে একজোড়া জুতো।
রক্তে-মাখা পিঠটার ঠিক মাঝামাঝি মেরুদণ্ডের ওপর একটা ছ্যাদা লক্ষ্য করল ঘড়ি। বন্দুক বা পিস্তলের গুলিই হবে, ঘড়ি আরও লক্ষ করে, যেখানে সেক্রেটারি বসেছিল ঠিক সেইখানে বাসের পেছন দিককার সিটেও একটা ফুটো। সন্দেহ নেই কেউ পিছন থেকে গুলি চালিয়েছে; সেই গুলি বাস ফুটো করে সেক্রেটারির শরীরে ঢুকে গেছে। সম্ভবত মৃত্যুও হয়েছে তৎক্ষণাৎ। কিন্তু কোণের দিকে ভিড়ের চাপে সেঁটে বসে ছিল বলে এতক্ষণ পড়ে যায়নি।
