শিলাকে এবার বাসায় পাওয়া গেল।
‘আরে, ডক্টর,’ উদ্বেগ ফুটে উঠল শিলার কণ্ঠে আবরারের চেহারা দেখে। ‘আসুন, ভেতরে আসুন। কী হয়েছে?’
গম্ভীর চেহারা নিয়ে পুরো ঘটনা শিলাকে খুলে বললেন ডক্টর। তাকে কিছু ডিকটেশনও দিলেন। ঘণ্টাখানেক লাগল কাজটা শেষ করতে।
শিলা মুখ তুলে চাইল। ‘ডক্টর! এ স্টেটমেন্ট দুটো আপনার বন্ধুদের পাঠানোর পাশাপাশি শেরিফকেও ঘটনাটা জানানো উচিত নয় কি? আর শেরিফ ঘটনাটা সিরিয়াসভাবে না নিতে চাইলে এফ বি আইকে-ও বলতে পারেন।’
মাথা ঝাঁকালেন আবরার। ‘তাই করব ভাবছি। নিন, এবার চিঠি দুটো লিখে ফেলুন।
আবার ডিকটেশন শুরু হলো। শেষ হতে প্রায় পাঁচটা বেজে গেল। আবরার জানতে চাইলেন। টাইপ করতে কতক্ষণ লাগবে আপনার?’
‘ঘণ্টা চারেক। তবে এখুনি শুরু করব। আপনি এই ফাঁকে শেরিফের সাথে দেখা করে আসুন না—’
‘না, আমি তাঁকে ফুল স্টেটমেন্ট পড়ে শোনাতে চাই। আর আপনাকে না খেয়ে কাজ করতে হবে না। আমার সাথে চলুন। ডিনার করে আসবেন। আপনাকে আমি পৌঁছে দিয়ে যাব। রাতের মধ্যে কাজটা শেষ করতে পারলেই হলো। কাল সকালে আমি শেরিফের সাথে কথা বলব। আর চিঠি দুটো স্পেশাল এয়ারমেইল ডেলিভারিতে পাঠিয়ে দেব।’
‘কিন্তু আপনি আজ রাতে আবার ওই বাড়িতে যাবেন? আমার কেমন ভয় লাগছে।’
হাসলেন আবরার। ‘ভয় পেতে হবে না। আজ রাতে আমার কিছু হবে না, শিলা।’
ঠিকই বলেছেন ডক্টর। কারণ ভিনগ্রহের হন্তারক তখন অন্য কাজে ব্যস্ত।
সতেরো
বিরক্তিকর বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ভিনগ্রহের প্রাণী অবশেষে কোলদের খামার বাড়িতে নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে গেছে। এবার নিজের ওপর পুরোপুরি সন্তুষ্ট সে। বেড়াল হোস্টকে সে এতদূরে নিয়ে এসে ডুবিয়ে দিয়েছে যে কেউ হয়তো কোনদিন তার খোঁজ পাবে না। আবরার যদি শোনে বেড়াল তার আগের আস্তানায় ফিরে যায়নি, সামান্য অবাক হতে পারে। তবে সে কোনদিনই জানতে পারবে না আজ রাতে, যখন আবরার ঘুমিয়ে থাকবে তার ওপর ভর করতে চলেছে ভিনগ্রহের হন্তারক।
তার পরিকল্পনাটি সরল। বেড়াল হয়ে ঘুরঘুর করা ছাড়া তার আর কোনও কাজ ছিল না আবরারের বাড়িতে। তবে সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল যখন আবরার তাকে গুলি করবে বলেছিল। ফাঁদটা অবশ্য ঠিকই টের পেয়েছে সে। তাই ধরা দেয়নি ফাঁদে। সে টার্গেটে গিয়ে বসলে আবরারের মনে সন্দেহ জাগত। আবরার তাকে গুলি না করে যদি খাঁচায় পুরে রাখত তা হলে সর্বনাশের পোয়াবারো হত। না খাইয়েই হয়তো তাকে মেরে ফেলত আবরার।
যাক, সব ভালয় ভালয় গেছে। আজ রাতের পর সে পুরোপুরি বিপদমুক্ত হতে পারবে। সে এমন একজনকে তার হোস্ট বানাবে যে ছিল তার শত্রু কিন্তু হোস্ট হিসেবে অসাধারণ। এখন সবার আগে দরকার আবরারের বাড়িতে পৌঁছানো। তার তো আর নিজের চলাফেরা করার ক্ষমতা নেই। কাজেই একজনকে হোস্ট বানাতে হবে। সে-ই আবরারের বাড়িতে তাকে পৌঁছে দেবে।
হোস্টের খোঁজ করতে হলো না ভিনগ্রহের খুনীকে। জিম ব্রামার নিজেই হাজির হয়ে গেল হোস্ট হিসেবে। ছেলেটা রনির বয়সী, আগামী বছর কলেজে ঢুকবে। ইচ্ছে আছে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার। আপাতত ছুটিতে বাড়ি এসেছে। তার বাবা, মি. ব্রামার ছেলেকে বলেছেন তাদের প্রতিবেশী মিসেস কোহলের বাড়িতে ফুট ফরমাশ খাটতে। মিসেস কোহলের ব্রামারদের কাছে তার বাড়ি বিক্রি করে দেয়ার একটা সম্ভাবনা আছে।
জিম মিসেস কোহলের বাড়িতে এসেছে তাকে কী করতে হবে জানাতে। মিসেস কোল ওকে ক্ষেত থেকে কিছু ভুট্টা আর শসা নিয়ে আসতে বললেন। লাঞ্চে রান্না করবেন।
ক্ষেত থেকে জিনিসগুলো এনে জিম মিসেস কোহলের হাতে দিল। বেরিয়ে যাচ্ছে, মিসেস কোহল ডাক দিলেন। ‘দাঁড়াও, জিম। লাঞ্চের সময় তো হয়েই গেল। একটু জিরিয়ে নাও। তারপর আমার সাথে খাবে।’
আপত্তি করল না জিম। গোলাঘরে বিশ্রাম নেয়ার কথা বলে সে একটা খড়ের গাদায় শুয়ে পড়ল। মাঠে অনেক কাজ করেছে সে। একটু পরেই নাক ডাকতে লাগল। আর ওই সুযোগটাই কাজে লাগাল ভিনগ্রহের হন্তারক। ভর করল সে জিম ব্রামারের ওপর।
.
সেই রাতের ঘটনা। জিম ব্রামারদের নিজেদের বাড়ি। ডিনার শেষে নিজের ঘরে বসে খানিকক্ষণ ‘পপুলার মেকানিক্স’-এর পাতা উল্টাল জিম, রেডিও শুনল। রাত দশটার দিকে ওর বাবা-মা যখন ঘুমাতে যাচ্ছে, চট করে রেডিও বন্ধ করে ফেলল জিম। বাবা-মাকে জানতে দিতে চায় না সে জেগে আছে।
ঘণ্টাখানেক পরে, বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পেরে জামা-কাপড় পরল জিম, পায়ে জুতো গলিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল ঘর ছেড়ে।
ঝলমলে চাঁদনী রাত। জিম দ্রুত হাঁটা দিল মিসেস কোহলের বাড়ির দিকে। সরাসরি চলে এল কিচেনে, সিঁড়ির তলা থেকে বের করল কচ্ছপের খোলটাকে। শার্টের ভেতর পুরে সাবধানে বুজিয়ে দিল গর্ত। তারপর হনহন করে এগোল আবরারের বাড়ির দিকে
আবরারের বাড়ি অন্ধকার। সম্ভবত ঘুমুচ্ছে সে। তবে সাবধানের মার নেই, ভেবে জুতো খুলে ফেলল জিম। পা টিপে টিপে চলে এল রান্নাঘরে। রান্নাঘরের সিঁড়ির নীচে কচ্ছপের খোলটাকে লুকোবার চমৎকার জায়গা আছে। জিম খুবই সাবধানে সিঁড়ির নীচে গর্ত খুঁড়ে কচ্ছপ আকারের জিনিসটাকে কবর দিল। তারপর সতর্কতার সাথে বুজিয়ে দিল কবর। বোঝার উপায় থাকল না এখানে খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে। তারপর বাড়ি ফিরে চলল জিম।
