মানুষটা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, নতুন এসেছ বুঝি?
হ্যাঁ।
কী কর?
সুহান একটু ইতস্তত করে বলল, নিরাপত্তা প্রহরীর একটা চাকরি পেয়েছি।
সাবধান। তুমি নতুন এসেছ, এখনো কিছু জান না। তোমার গুদাম লুট করে নেবার জন্য এরা যা কিছু করতে পারে। মানুষটা ধরেই নিয়েছে সে কোনো একটা গুদামের দারোয়ান। সে যে আসলে একটা সরকারি তথ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রহরী, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে শুরু করে স্টান্ট বোমা পর্যন্ত ব্যবহার করা শিখছে প্রয়োজনে রাত কাটানোর জন্য তার যে নিজ্বস্ব একটা ঘর রয়েছে, সেই ঘরটাতে পৃথিবীর সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে–—এই বিষয়গুলো মানুষটা চিন্তাও করতে পারবে না। সুহান মানুষটাকে এগুলো জানানোর কোনো চেষ্টা করল না, আবার জিজ্ঞেস করল, আছে কোনো হোটেল?
হোটেল তুমি কোথায় পাবে? মিলিনা একটা সরাইখানার মতো চালায়, তার কাছে একটা ঘর থাকতে পারে। তবে বুড়ির মেজাজ খুব গরম, ব্যবহার খুব খারাপ।
আজকে এখন পর্যন্ত সে যেরকম ব্যবহার পেয়ে এসেছে তার তুলনায় এখানকার যে কোনো ব্যবহারই মনে হয় মধুর মতো মনে হবে! সুহান জিজ্ঞেস করল, মিলিনার সরাইখানাটা কোথায়?
সোজা চলে যাও। ল্যাম্পপোস্টের ওখানে গিয়ে ডানদিকে যাও, আধ কিলোমিটারের মতো গেলে একটা ছোট বাজারের মতো পাবে। সেখানে কাউকে জিজ্ঞেস করলে তোমাকে দেখিয়ে দেবে।
ধন্যবাদ তোমাকে।
মানুষটা সুহানের কথার উত্তর দিল না। ভতাসূচক অর্থহীন কথাগুলোর মনে হয় এর কাছে খুব বেশি গুরুত্ব নেই।
সুহান ল্যাম্পপোস্টের দিকে হাঁটতে থাকে। রাস্তাটা খানাখন্দে ভরা, ফুটপাতটাও সেরকম। আবছা অন্ধকারে সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে, ফুটপাতে ভাঙা বোতল আর এলুমিনিয়াম ক্যান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। মাঝে মাঝে দুই একজন মানুষ কথা বলতে বলতে তাকে পাশ কাটিয়ে যায়, মানুষগুলোর কথার মাঝে এক ধরনের আঞ্চলিকতার টান। ল্যাম্পপোস্টের কাছাকাছি গিয়ে সে ডানদিকে হাঁটতে থাকে। দুই পাশে ঘিঞ্জি বাড়িঘর, ভেতরে মানুষের কথাবার্তা, মহিলাদের হাসি আর ছোট বাচ্চাদের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ করে একটা বাসা থেকে একজন মানুষ কুৎসিত ভাষায় গালাগাল করতে করতে বের হয়ে এল, পেছনে একটা মেয়ের কান্নার শব্দ শোনা যেতে থাকে। নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে বিলাপ করতে করতে মেয়েটা ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদছে।
সুহান শেষ পর্যন্ত বাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। জায়গাটা মোটামুটি আলোকিত, অনেকগুলো দোকানপাট, নাইট ক্লাব এবং রেস্টুরেন্ট। একটা বড় হলঘরের ভেতর থেকে গানবাজনা এবং মানুষের হৈ-হুল্লোড় শব্দ ভেসে আসছে। সুহান কাছাকাছি একটা দোকানের ভেতর ঢুকে জিজ্ঞেস করল, মিলিনার সরাইখানাটা কোথায় বলতে পারবে?
দোকানি মানুষটা ব্যস্তভাবে একটা কার্ড বোর্ডের বাক্স থেকে ছোট ছোট শুকনো খাবারের প্যাকেট বের করতে করতে বলল, সামনে ডানদিকে তিনটা দোকান পরে। বাইরে দেখবে বগনভিলা গাছ।
সুহান মানুষটাকে ধন্যবাদ দিয়ে বের হয়ে এল। রাস্তায় লোকজনের ভিড় পাশ কাটিয়ে সে কয়েক মিনিটে মিলিনার সরাইখানা পেয়ে যায়। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একটা খাবার জায়গা, মানুষ বসে নিচু গলায় কথা বলতে বলতে খাচ্ছে। পেছনে একটা কাউন্টারে মোটাসোটা মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দেখে মনে হয় সে বুঝি এখনই কারো ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। হলঘরের এক পাশে একটা বড় ভিডিস্ক্রিনে একটা সস্তা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান হচ্ছে এবং একন ভাড়ের স্থূল রসিকতার সাথে শব্দ করে একসাথে অনেকে হেসে উঠছে। সুহান টেবিলগুলো পাশ কাটিয়ে কাউন্টারের সামনে দাড়াল, মধ্যবয়স্ক মহিলাটা চোখ পাকিয়ে সুহানের দিকে তাকাল যেন সে একটা বড় অপরাধ করে ফেলেছে। সুহান ইতস্তত করে বলল, রাত কাটানোর জনা আমার একটা ঘর দরকার।
মধ্যবয়স্ক মহিলাটা সুহানের আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে বলল, আমি তোমাকে রুম দিই আর তুমি সবকিছু নিয়ে চুরি করে পালাও!।
কথাটা এত অবিশ্বাস্য এবং বিচিত্র যে সুহানের হাসি পেয়ে যায়, সে হাসি আটকে বলল, তোমার ভয় নেই আমি কিছু চুরি করে নিয়ে পালাব না।
তুমি কোথা থেকে এসেছ? কী কর?
সুহান বলল, আমি অনেক দূর থেকে এসেছি। এক জায়গায় নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ পেয়েছি।
কোনোরকম নেশা-ভাং কর না তো?
না, করি না।
মধ্যবয়স্ক মহিলাটা একটা মোটা খাতা বের করে খালি একটা পৃষ্ঠা বের করে বলল, নাও লিখ।
সুহান নিজের নাম-ঠিকানা রাত কাটানোর উদ্দেশ্য লিখতে খাকে। দেয়ালে ঝোলানো চাবিগুলো থেকে একটা চাবি বের করে নিয়ে বলল, তিন শ আট নম্বর রুম। এক রাতের জন্য দুই ইউনিট।
সুহান তার কার্ডটা বের করল না, এখানে এই কার্ডটা ব্যবহার করার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হল না। সে খুচরো দুটি ইউনিট বের করে টেবিলে রাখে, মুদ্রাগুলো চোখের কাছে নিয়ে পরীক্ষা করে মিলিনা বলল, সাতটার সময় নাস্তা দেওয়া হবে। দশটার মাঝে ঘর খালি করে দেবে।
ঠিক আছে।
তিন তলার তিন শ আট নম্বর ঘরটা ছোট। জানালা খুলতেই অন্য পাশে আরেকটা বড় বিল্ডিঙের পেছনের অংশ দেখা গেল। সেখানে লাগানো উজ্জ্বল নিয়ন আলো জ্বলছে এবং নিতছে, ঘরের ভেতরে সেই আলোর ছটা এসে পড়েছে। সুহান কিছুক্ষণ মন খারাপ করা এই কুশ্রী দৃশাটার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর টেবিলে রাখা ব্যাগ খুলে তার পরিষ্কার কাপড় বের করতে শুরু করে।