জয়ন্ত ইতস্তত করে কিরিচটা হাতে নিল, সাবধানে ধরে পরীক্ষা করে বলল, এইটা রাখব?
নিয়াজ বলল, রেখে দে। কখন কী কাজে লাগে।
যদি কোনো বিপদ দেখেন আগুন জ্বালাবেন।
আগুন?
হ্যাঁ। ম্যাচ আছে সাথে?
আছে।
দুইটা মোমবাতি নিয়ে যান
দিনের বেলা মোমবাতি দিয়ে কী করব?
সাথে রাখেন। বলে জব্বার দুইটা বড় বড় মোমবাতি বের করে দিল।
নিয়াজ মোমবাতিগুলো হাতে নেয়, হঠাৎ করে সে কেমন যেন আতঙ্ক অনুভব করতে থাকে। শুকনো গলায় বলল, আর কিছু লাগবে জব্বার ভাই?
দড়ি। আর লাঠি।
কেন? দড়ি আর লাঠি কেন?
জব্বার মিয়া বলল, জানি না। তবে মানুষ বিপদে পড়লে লাগে। আগে যে লোকটা খুন হল-
জব্বার মিয়া হঠাৎ করে থেমে গেল নিয়াজ ভয়ে ভয়ে বলল, যে খুন হল?
না, কিছু না। জব্বার মিয়া মাথা নেড়ে বলল, আপনারা যখন যাবেনই তখন ভয় দেখিয়ে লাভ কী?
তবু শুনি।
শোনার কিছু নাই। একটা গর্তের মাঝে পড়ে ছিল–সাথে দড়ি আর অন্য মানুষ থাকলে বের হতে পারত।
ও।
হ্যাঁ। সব সময় তিনজন একসাথে থাকবেন।
ঠিক আছে।
আমি অন্ধকার হবার আগেই আসব।
ঠিক আছে।
জব্বার ট্রলার থেকে একটা লম্বা বাঁশ এবং নাইলনের কিছু দড়ি বের করে দিল। বাঁশটা কেটে তিন টুকরা করে তিনজনের হাতে দিয়ে বলল, আল্লাহ মেহেরবান।
নিয়াজ ফিসফিস করে বলল, আল্লাহ মেহেরবান।
আর শোনেন– জব্বার মিয়া নিচুগলায় বলল, চোখগুলি সাবধান।
চোখ?
হ্যাঁ। চশমা থাকলে সবসময় চশমা পরে থাকবেন।
জয়ন্ত অবাক হয়ে বলল, কেন?
জব্বার মিয়া কোনো কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
জব্বারের ট্রলারটা শব্দ করে সমুদ্রের বুকে অদৃশ্য হয়ে যাবার পর ওরা তিনজন একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। জয়ন্ত দুর্বল গলায় বলল, কাজটা ঠিক করলাম কিনা বুঝতে পারলাম না।
শ্রাবণী বলল, ঠিক করিস নি। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই।
জয়ন্ত দ্বীপটার দিকে তাকাল। গাছপালা–ঢাকা নিঝুম একটা দ্বীপ। সমুদ্রের ঢেউ এসে তীরে আছড়ে পড়ছে, এছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। জয়ন্ত হাতের কিরিচটার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ভেতরে আর নাইবা গেলাম। বীচটাতে একটু হাঁটাহাঁটি করে দেখি।
শ্রাবণী মাথা নাড়ল, বলল, আমাদের জোর করে এখানে এনেছিস–এখন পিছাতে পারবি না।
তুই কী করতে চাস?
ভেতরে যাব।
ভেতরে যাবি?
হ্যাঁ।
জয়ন্ত কিছুক্ষণ শ্রাবণীর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, বেশ।
তিনজন হেঁটে হেঁটে যখন দ্বীপের ভেতরে ঢুকছিল তখন শরৎকালের রৌদ্র মাত্র সতেজ হতে শুরু করেছে।
.
যেখানে মানুষের জনবসতি আছে সেখানে পায়ে চলার পথ তৈরি হয়ে যায় এই দ্বীপটিতে দীর্ঘদিন কোনো মানুষ থাকে নি বলে কোনো পথঘাট নেই। ভেতরে ঢুকতে হলে ঝোঁপঝাড় ভেঙে ঢুকতে হয়, তিনজন সেভাবেই ঢুকেছে। সবার আগে জয়ন্ত। তার হাতে বড় কিরিচ–ঝোঁপঝাড় বা বুনোলতা বেশি থাকলে সেটা দিয়ে কেটে পথটা খানিকটা পরিষ্কার করছে। জয়ন্ত থেকে কয়েক হাত পেছনে শ্রাবণী। সবার পিছনে নিয়াজ। পা ফেলার আগে বাঁশের লাঠিটা দিয়ে মাঝে মাঝে পরীক্ষা করছে। ঠিক কী কারণে কারোই সঠিক জানা নেই। বালুবেলায় প্রখর রোদ ছিল, ভেতরে তার কিছু অবশিষ্ট নেই। বড় বড় গাছের ছায়ায় আলো–আঁধারি একধরনের আবছা অন্ধকার।
তিনজন চুপচাপ মিনিট দশেক হাঁটার পর শ্রাবণী হঠাৎ করে নিচুগলায় বলল, থাম।
অন্য দুজন সাথে সাথে থেমে যায়। নিয়াজ ভয়–পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
না, কিছু হয় নি।
তাহলে?
আমার শুধু মনে হচ্ছে কেউ আমাদের লক্ষ করছে।
শ্রাবণীর কথা শুনে জয়ন্ত আর নিয়াজ চারদিকে তাকাল–যতদূর চোখ যায় শুধু গাছ লতাপাতা ঝোঁপঝাড়। কেউ যদি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের লক্ষ করে সেটি বোঝার কোনো উপায় নেই। ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবার জন্য জয়ন্ত হাত নেড়ে বলল, কে এখানে লক্ষ করবে? তোর মনের ভুল।
আমি যখন ছোট ছিলাম একদিন রাতে ঘুম ভেঙে গেল। আমার শুধু মনে হতে লাগল কেউ একজন ঘরে আছে– আমাকে লক্ষ করছে। ভয়ে আমি গুটিশুটি মেরে শুয়ে রইলাম। সকালে উঠে দেখি চোর সবকিছু চুরি করে নিয়ে গেছে।
জয়ন্ত পরিবেশটা হালকা করার জন্য বলল, তোর যে এরকম অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা আছে। আগে কখনো বলিস নি তো!
আগে কখনো দরকার পড়ে নি।
ঠিক আছে ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখা যাক।
কীভাবে?
কিছুক্ষণ সামনে হেঁটে হঠাৎ করে ঘুরে পেছনদিকে তাকাই দেখি কাউকে দেখা যায় কিনা।
ঠিক আছে।
কথা না বলে তিনজনে বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে গেল এবং হঠাৎ করে পেছনে ঘুরে কয়েক পা ছুটে গেল। ওরা অবাক হয়ে দেখল সত্যি সত্যি কী একটা প্রাণী দুদ্দাড় করে পেছনে ছুটে গিয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
শ্রাবণী ভয়–পাওয়া গলায় বলল, দেখেছিস? দেখেছিস? আমি বলেছি না!
জয়ন্ত খানিকক্ষণ প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে বলল, এটা একটা বেজি। নেউল। ইংরেজিতে বলে উইজল।
নেউল? বেজি?
হ্যাঁ।
শ্রাবণী ভুরু কুঁচকে বলল, তুই কেমন করে জানিস?
আমি জানি কারণ আমি বেজি দেখেছি। আমাদের গ্রামের বাড়িতে একজন মানুষ ছিল। তার একটা পোষা বেজি ছিল।
ও।
অসম্ভব হিংস্র প্রাণী। কিন্তু সাইজটা বেড়ালের মতো। কাজেই আমার মনে হয় তোর ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
এরকম করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে কেন?
মনে হয় আগে কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখে নি।
