আমরা আমাদের সমবয়সী ছেলেমেয়েদের সাথে স্কুলে লেখাপড়া করি বলে আমাদের প্রতিভার বিকাশ হচ্ছে। রিকির প্রতিভা বিকাশের কোনো সুযোগ নেই কারণ সে কখনো স্কুলে যেতে পারে না। সময় কাটানোর জন্য সে জঙ্গল পাহাড় এবং হ্রদে ঘুরে বেড়ায়, বানরের সাথে তার বন্ধুত্ব। যার বানরের সাথে বন্ধুত্ব তার বুদ্ধিমত্তা নিশ্চয়ই খুব কম।
রিকি কোনো অ্যালজেবরা জানে না, কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে না, টাচ প্যাড ব্যবহার করে ছবি আঁকতে পারে না, রকেট মেশিন বা অন্য কোনো খেলা জানে না। এরকম কোনো ছেলে থাকা সম্ভব আমরা সেটি জানতাম না, রিকিকে নিজের চোখে দেখে এটা আমরা জানতে পেরেছি…
হাসি-খুশি শিক্ষিকা পুরো রিপোর্টটি মন দিয়ে পড়ে একটু বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। রিপোর্টটিতে একটুও ভুল তথ্য নেই কিন্তু পড়ে কেমন যেন অস্বস্তি হয়। মনে হয় এখানে যা লেখা হয়েছে তার বাইরেও কিছু একটা আছে। পুরো রিপোর্টটি যেন এক ধরনের তামাশা ছোট ছোট বাচ্চাগুলো যেন বড় মানুষদের নিয়ে এক ধরনের তামাশা করছে।
ঠিক কোথায় সেটা ধরতে পারছে না।
হাসি-খুশি শিক্ষিকা অনেক দিন পর হঠাৎ করে একটু বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে না ঠিক কোথায় কিন্তু মনে হতে থাকে কোথায় যেন একটা কিছু ঠিক নেই।
১৩.
স্কুল বাসটি সময়মতো ছেড়ে দিল। আজ রবিবার, বারো জন অত্যন্ত প্রতিভাবান শিশুকে স্থানীয় নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে নিয়ে যাবার কথা। বারো জন শিশু তাদের বাসে শান্ত হয়ে বসে আছে, তাদের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবাই অত্যন্ত উত্তেজিত। সবাই পরিকল্পনা করে অজি রিকির কাছে পালিয়ে যাবে।
বাস ড্রাইভার তার জি.পি.এসে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের ঠিকানা প্রবেশ করিয়ে বাসটি চালাতে শুরু করে। যেদিকে যাবার কথা বাসটি সেদিকেই যেতে থাকে, ড্রাইভার স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে বাসটাকে শুধু নিয়ন্ত্রণের মাঝে রাখে।
নীল এরকম সময়ে তার পকেট থেকে ছোট কম্পিউটারটা বের করে, আজকে তার সাথে সে একটা ওয়্যারলেস ইন্টারফেস লাগিয়ে এনেছে। বাসের পিছনে বসে সে বাস ড্রাইভারের জি.পি.এসে গন্তব্য স্থানটি পাল্টে দিল-নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের পরিবর্তে নগর কেন্দ্রের রেলস্টেশন। বাস ড্রাইভার জানতেও পারল না সে বারোটি অসম্ভব প্রতিভাবান বাচ্চাকে রেলস্টেশনে নিয়ে যাচ্ছে।
নীল এবারে সবাইকে কাছাকাছি ডাকল-তারা কাছে আসতেই সে ফিসফিস করে বলল, সবার মনে আছে তো কী করতে হবে?
মাতিষ ঝঙ্কার দিয়ে বলল, মনে থাকবে না কেন?
নীল মুখটা গম্ভীর করে বলল, এটা আমাদের প্রথম অ্যাডভেঞ্চার কাজেই কোনো যেন ভুল না হয়। রেলস্টেশনে থামতেই আমি ইলেকট্রনিক বোতাম টিপে দরজা খুলে দেব এক দৌড়ে সবাই নেমে যাবে। যাবার সময় বলব আমরা যাচ্ছি শপিং সেন্টার আসলে শপিং সেন্টারের পাশ দিয়ে যাব রেলস্টেশন।
মাতিষা বলল, জানি। আমরা সব জানি।
নীল মাথা নেড়ে বলল, তবু আরেকবার পুরোটা ঝালাই করে নেই। স্টেশন কাউন্টারে গিয়ে সবাই ভিড় করে দাঁড়াবে, হইচই করে টিকেট কিনবে বিনোদন পার্কের। মনে আছে তো?
মনে আছে। মনে আছে।
ঠিক এই সময়ে আমি আর কিয়া ঘুরে ঘুরে মেশিনগুলো থেকে তেতাল্লিশ নম্বর স্টেশনের টিকেট কিনব। সেটা হচ্ছে রিকির এলাকার স্টেশন। ঠিক আছে?
ঠিক আছে!
তারপর আমরা সবাই মিলে একসাথে ছুটতে ছুটতে হাসতে হাসতে বিনোদন পার্কের কথা বলতে বলতে যাব-কাজেই সবাই ধরে নেবে আমরা যাচ্ছি বিনোদন পার্কে। পরে যখন আমাদের খোঁজ করতে আসবে সবাই যাবে বিনোদন পার্কে।
কিয়া হিহি করে হেসে বলল, কী মজাটাই না হবে!
হ্যাঁ। নীল গম্ভীর হয়ে বলল, যদি সবকিছু ঠিক ঠিক করে করতে পারি তা হলে অনেক মজা হবে।
লন বলল, এবারে বাকিটা আরেকবার বলে দাও।
বাকিটা সোজা। একসাথে আমাদের বারো জনকে দেখলেই সেটা সবাই মনে রাখবে তাই আমরা প্ল্যাটফর্মের দিকে রওনা দেবার সময় আলাদা হয়ে যাব। চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের সাত নম্বর ট্র্যাক। আমরা সেখানে পৌঁছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাব, যেন কেউ কাউকে চিনি না। সবাই উঠব আলাদা আলাদা বগিতে। কেউ আমাদের আলাদা করে লক্ষ করবে না।
নীল হাতের কম্পিউটারটা একবার দেখে বলল, তেতাল্লিশ নম্বর স্টেশনে নেমে সবাই বাইরে চলে আসবে রিকি বলেছে বাকি দায়িত্ব তার।
মাতিষা বলল, যদি রিকি বাকিটা করতে না পারে?
পারবে না কেন? নিশ্চয়ই পারবে। সেদিন দেখ নাই রিকির কত বুদ্ধি? আমাদের সবার যত বুদ্ধি রিকির একার তত বুদ্ধি।
মাতিষা মাথা নাড়ল। বলল, তার অনেক সুবিধা-সে বনে জঙ্গলে ঘুরে মাথার বুদ্ধি বাড়াতে পারে। আমরা শুধু একটা ঘরে বসে থাকি আমাদের কপালটাই খারাপ।
লন বলল, আর কপাল খারাপ থাকবে না। আমরাও এখন থেকে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াব।
নীল তার কম্পিউটারের দিকে চোখ রাখছিল, সে এবারে চাপা গলায় বলল, সবাই এখন নিজের সিটে যাও, আমরা রেলস্টেশনের কাছাকাছি চলে এসেছি। আর মনে রেখো সবার ভিডিফোন বন্ধ করে দাও কেউ যেন আমাদের ট্র্যাক করতে না পারে।
সবাই নিঃশব্দে নিজেদের সিটে গিয়ে বসল, তাদের মুখের দিকে তাকালে কেউ বুঝতেও পারবে না যে কিছুক্ষণের ভেতরেই তারা এত বড় একটা কাও কল্পতে যাচ্ছে।