রন মাথা নিচু করে বলল, আমরা জানি। সে জন্যেই আমরা আপনাদের কাছে এসেছি।
উগুরু তার কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল, তা হলে চলুন আমরা কাজ শুরু করি। ভেতরে আমাদের বড় ডিসপ্লে রয়েছে সেখানে আমরা পুরো প্রক্রিয়াটি সিমুলেট করতে পারি। আপনাদের দুজনের ক্রোমোজোমগুলো নিয়ে আপনাদের সামনেই আপনাদের সন্তানকে ডিজাইন করব। সন্তান জন্ম দেবার আগেই আপনারা আপনাদের সন্তানদের দেখতে পাবেন।
নিহা রনের হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। ফিসফিস করে বলল, চল রন। আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না!
রন বলল, চল। কিন্তু তোমার সন্তানের জন্য তোমাকে অন্তত নয় মাস অপেক্ষা করতে হবে।
০২.
রিশ গামলার পানি দিয়ে রগড়ে রগড়ে শরীরের কালি তুলতে তুলতে বলল, তিনা। আজকে রাতে আমরা কী খাচ্ছি?
রিশের স্ত্রী তিনা কাপড় ভাঁজ করে তুলতে তুলতে বলল, মনে নেই? আজ আমরা বাইরে খেতে যাব?
রিশের সত্যি মনে ছিল না, সে বলল, সত্যি?
হ্যাঁ। সে জন্য আমি কিছু রাধি নি।
কোথায় যাবে ঠিক করেছ?
তিনা হাসার ভঙ্গি করে বলল, আমরা কি আর পার্বত্য অঞ্চলে খেতে যাব? এই আশপাশে কোথাও বসে খেয়ে নেব।
রিশ একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেল। তারা নিম্নাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ, হঠাৎ করে খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে। আশপাশে অনেক মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে আছে এরকম সময় বাইরে যেতে যেতে এক ধরনের অপরাধবোধের জন্ম হয় কিন্তু দিন-রাত পরিশ্রম করতে করতে মাঝে মাঝেই দুজনের ইচ্ছে করে বাইরে কোথাও সুন্দর একটা জায়গায় বসে খেতে। অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কথা বলতে। হালকা কোনো বিনোদনে সময় কাটিয়ে দিতে।
রিশ তার তেলকালি মাখা কাপড় পাল্টে পরিষ্কার কাপড় পরে বলল, তিনা, আমিও রেডি। চল, যাই। যা খিদে পেয়েছে মনে হয় একটা আস্ত ঘোড়া খেয়ে ফেলতে পারব।
তিনা খিলখিল করে হেসে বলল, যদি খেতেই চাও তা হলে আস্ত ঘোড়া কেন, অন্য কিছু খাও! ঘোড়া কি একটা ধাওয়ার জিনিস হল?
রিশ বলল, এটা একটা কথার কথা! ঘোড়া কি কোথাও আছে? চিড়িয়াখানা ছাড়া আর কোথাও কি ঘোড়া দেখেছ কখনো?
সেজন্যই তো বলছি-দুই চারটে যা কোনোমতে টিকে আছে সেটাও যদি খেয়ে ফেলতে চাও তা হলে কেমন করে হবে?
.
কিছুক্ষণের মাঝেই তিনা বাইরে যাবার পোশাক পরে বের হয়ে এল। তাকে একনজর দেখে রিশ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তোমার খুব দুর্ভাগ্য যে তুমি নিম্নাঞ্চলে জন্ম নিয়েছ! যদি তোমার পার্বত্য অঞ্চলে জন্ম হত তা হলে নিশ্চয়ই সামরিক অফিসারের সাথে বিয়ে হত। গলায় হীরার নেকলেস পরে তুমি এক পার্টি থেকে আরেক পার্টিতে যেতে!
তিনা হাসতে হাসতে বলল, ভাগ্যিস আমার পার্বত্য অঞ্চলে জন্ম হয় নি! আমি পার্টি দুই চোখে দেখতে পারি না!
রিশ তিনার হাত ধরে বলল, আমার মাঝে মাঝেই মনে হয় তোমার খুবই দুর্ভাগ্য যে আমার মতো চালচুলোহীন একজন মানুষের সাথে বিয়ে হয়েছে! তোমার এর চাইতে ভালো একটা জীবন পাবার কথা ছিল।
তিনা রিশের মুখমণ্ডল স্পর্শ করে বলল, তুমি যখন নাটকের ব্যর্থ নায়কদের মতো কথা বল তখন সেটা শুনতে আমার ভারি মজা লাগে! অনেক হয়েছে-এখন চল।
ঘরে তালা লাগিয়ে দুজন যখন বাইরে এসেছে তখন শহরের রাস্তায় সান্ধ্যকালীন উত্তেজনাটুকু শুরু হয়েছে। ফুটপাতে মাদকসেবী ছিন্নমূল মানুষ বসে বসে বিড়বিড় করে কথা বলছে। উজ্জ্বল পোশাকপরা কিছু তরুণী কৃত্রিম ফুল বিক্রি করছে। পথের পাশে উত্তেজক পানীয়ের দোকানে হতচ্ছাড়া ধরনের কিছু মানুষের জটলা। পথের পাশে দ্রুতলয়ের সঙ্গীতের সাথে সাথে কিছু নৃত্যপ্রেমিক মানুষের ভিড়। উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করছে কয়েকটি দোকান চারদিকে অনেক মানুষ। খুব ভালো করে খুঁজলেও কিন্তু কোথাও একটি শিশুকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিম্নাঞ্চলে শিশুর খুব অভাব।
রিশ আর তিনা তাদের পছন্দের একটা ছোট রেস্টুরেন্টে জানালার পাশে একটা টেবিলে এসে বসে। টেবিলের প্যানেলে স্পর্শ করে খাবার অর্ডার দিয়ে তারা তাদের পানীয়ে চুমুক দেয়। রিশ চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, তিনা, তোমাকে আজকে খুব সুন্দর লাগছে!
তিনা খিলখিল করে হেসে বলল, আমি আগেও দেখেছি–পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দেবার সাথে সাথে তোমার আমাকে সুন্দর লাগতে থাকে!
এরকম সৌন্দর্য নিয়ে তোমার আমার মতো একজন কাঠখোট্টা মানুষকে বিয়ে করা ঠিক হয় নি। তোমার নাটকে কিংবা চলচ্চিত্রে অভিনয় করা উচিত ছিল!
তিনা রহস্য করে বলল, তার কি সময় শেষ হয়ে গেছে? আমি তো এখনো নাটকে না হয় চলচ্চিত্রে চলে যেতে পারি!
রিশ মাথা নেড়ে বলল, উঁহু! আমি তোমাকে এখন আর কোথাও যেতে দেব না। আমি সারা দিন ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। বড় মেশিনগুলো চালিয়ে চালিয়ে সময় কাটাই আর ভাবি কখন আমি বাসায় আসব আর কখন তোমার সাথে দেখা হবে!
তিনা বলল, আমাদের ফ্যাক্টরিতে একটা ছেলে কাজ করে, সে কী বলেছে জান?
কী বলেছে?
সে নাকি পড়েছে যে পুরুষ মানুষেরা কখনো একটি মেয়েকে নিয়ে সুখী হতে পারে! কত দিন পরেই তার মন উঠে যায় তখন তারা অন্য মেয়েদের পিছনে ছোটে। ভ্রমরের মতো।
রিশ বলল, হতে পারে। আমি তো আর বেশি লেখাপড়া করি নি তাই আমি জানি না পুরুষ মানুষদের কেমন হওয়া উচিত। আমি তাই আমার মতন রয়ে গেছি। এখনো ভ্রমরের মতো হতে পারি নি।