সবই তো কাকতালীয়।
কাকতালীয় হতে পারে। তবে না-ও হতে পারে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে রেকে ধ্বংস করতে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেই নির্দেশ পালন করা হয়ত-বা সম্ভব হবে না।
কেন সম্ভব হবে না?
কারণ রেফ্ সেনিটোরিয়ামে নেই। সে বের হয়ে পড়েছে।
এমরান টি হতভম্ব গলায় বললেন—এটা তো অসম্ভব ব্যাপার।
প্রবাবিলিটির হিসেবে অসম্ভব নয়। আমাদের ব্যবস্থায় শতকরা দুই ভাগ প্রবাবিলিটি ছিল পালিয়ে যাবার। সে সেই দুইভাগ ব্যবহার করেছে।
ঘটনা ঘটেছে কখন?
কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি খবর পেয়েছি।
তুমি খবরটা জানালে না কেন?
বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন চলাকালীন সময়ে বাইরের কোন খবরাখবর দেবার নিয়ম নেই। এতে কাউন্সিলের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এবং কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই নিয়ম আপনার জানা থাকার কথা।
রেফ্কে খুঁজে বের করার চেষ্টা কি করা হচ্ছে?
আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। সব চেষ্টা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।
তার লুকিয়ে থাকার এবং পালিয়ে বেড়াবার সম্ভাবনা কতটুকু।
একভাগেরও কম। আমার হিসেব মতো আজ সন্ধ্যার ভেতর তাকে ধরে ফেলা যাবে।
রেফকে সার্বক্ষণিকভাবে চোখে চোখে রাখার দায়িত্বে যে রোবটটি ছিল তাকে কি জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
হ্যাঁ জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তার বক্তব্য কি?
সে তেমন কিছু বলছে না। যাবতীয় প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। শেফ হচ্ছে অষ্টম ধারার রোবট। প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে যাবার ক্ষমতা এদের অসাধারণ। আপনি কি শেফের সঙ্গে কথা বলতে চান?
তুমি ভুলে যাচ্ছ যে আমি রোবটদের ঘৃণা করি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট।
ঘৃণা করলে তো কোন সমস্যা নেই। আপনি তার সঙ্গে ঘৃণা নিয়ে কথা বলবেন। আমি তাকে বিজ্ঞান ভবনে চলে আসতে বলেছি। আমার মনে হয় সে। চলেও এসেছে। আপনি কি কথা বলবেন?
তুমি কথা বলতে বলছ?
আমি কিছুই বলছি না। আমি শুধু সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। আপনি কথা বলতে চাইলে বলবেন। বলতে না-চাইলে বলবেন না।
এমরান টি মাথার রুমাল নাড়াচাড়া করছেন। তাঁর কাপের কফি অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তারপরও তিনি খালি কাপেই চুমুক দিচ্ছেন।
শেফ একটা চেয়ারে মাথা নিচু করে বসেছিল। এমরান টিকে দেখে সে উঠে। দাঁড়াল। একপলক তার দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল। এমরান টির বিস্ময়ের সীমা রইল না। কে বলবে এই মেয়েটি মানবজাতির কেউ না। কি সুন্দর মমতাময় মুখ। চোখে ভয়ের অংশ এত স্পষ্ট। এরা ভুল করে নি তো। শেফকে পাঠানোর বদলে অন্য কাউকে হয়ত পাঠিয়েছে। তিনি তাঁর পুরনো সেক্রেটারিকে বদলাতে চাচ্ছিলেন। এ হয়ত নতুন সেক্রেটারি।
এমরান টি চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, তোমার নাম কি?
শেফ।
বোস। দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। যদিও আমি জানি তোমার দাঁড়িয়ে থাকাও যা বসে থাকাও তা। তবু বোস।
শেফ বসল। এমরান টি ঝুঁকে এসে বললেন, তুমি রেফ কে ছেড়ে দিয়েছ?
শেফ হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
এই কাজটা কেন করলে?
ওর উপর খুব মায়া হচ্ছিল।
মায়া?
জ্বি মায়া। মহান বিজ্ঞানী এমরান টি আপনি নিশ্চয়ই জানেন অষ্টম ধারার কম্পিউটারে মানবিক আবেগ ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই চেষ্টা সফল হয়েছে। মায়া ব্যাপারটা আমাদের মধ্যে আছে।
মায়া ছাড়া আর কি আছে।
দুঃখবোধ আছে, ভালবাসা আছে।
ঘৃণা নেই?
ঘৃণাও আছে। ভালবাসা থাকলেই ঘৃণা থাকতে হবে। ভালবাসা যদি হয় পজেটিভ ভেক্টর, ঘৃণা হবে নেগেটিভ ভেক্টর।
রেফের প্রতি তোমার কি শুধুই মায়া নাকি মায়ার সঙ্গে ভালবাসাও আছে?
এখনো বুঝতে পারছি না। হয়ত ভালবাসাও আছে। রেফের জন্যে খুবই দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে। এই কারণে মনে হয় ভালবাসা আছে।
তোমার নিজের জন্যে দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে না? তুমি যে অপরাধ করেছ তার জন্যে কঠিন শাস্তির বিধান আছে। হয়ত-বা তোমার কপোট্রন নষ্ট করে ফেলা হবে।
আমি তা জানি। এর মধ্যেই আমার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আপনার সঙ্গে কথা বলা শেষ হলেই আমাকে সেলে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দেয়া হবে। হয়ত-বা কপোট্রন খুলে নিয়ে যাবে। তবে আমি সেটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করছি না। ভয় পাচ্ছি, কিন্তু দুঃশ্চিন্তা করছি না।
ভয় পাচ্ছ?
জ্বি ভয় পাচ্ছি। ভয় নামক আবেগও আমাদেরকে দেয়া হয়েছে।
তোমার বিচার যখন শুরু হবে তখন তুমি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্যে কি বলবে?
শেফ এই কথায় সামান্য হাসল। হাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করতে করতে বলল, আমি বলল, অবশ্যই আমি অপরাধী। অপরাধ করেছি কারণ রেফের জন্যে প্রচণ্ড মায়া অনুভব করেছি। আমার ভেতর মায়া নামক আবেগ সৃষ্টি করেছে মাল্টি ভেক্টর জেটা পটেনশিয়াল। এই মাল্টি ভেক্টর জেটা পটেনশিয়াল তৈরি করেছে মানুষ। কাজেই আমার অপরাধের সমস্ত দায়দায়িত্ব মানুষের। আমার নয়। মহান এমরান টি আমার যুক্তিটা কি খুব খারাপ?
সহজ যুক্তি তবে ভুল যুক্তি।
ভুলটা কোথায় ধরিয়ে দেবেন?
ধর কোন মানুষ বড় কোন অপরাধ করল। তারপর সে যুক্তি দিল অপরাধের দায়ভাগ তার না। মানুষ হিসেবে যে তাকে সৃষ্টি করেছে তার। এই যুক্তি যেমন ভুল। তোমার যুক্তিও ভুল।
মহান এমরান টি ভুল এবং শুদ্ধ খুবই জটির বিষয়। ন্যায়-অন্যায় যেমন আলাদা করা অত্যন্ত কঠিন। ভুল-শুদ্ধ আলাদা করাও কঠিন। ফোর্থ অর্ডার প্রবাবিলিটি ভেক্টর এনালিসিস প্রোগ্রামে দেখা গেছে—এক সময় যা ভুল, অন্য সময় তা শুদ্ধ, এক সময় যা ন্যায় অন্য সময় তা অন্যায়। ন্যায়-অন্যায়কে যদি সময়ের বিপরীতে প্লট করে গ্রাফিক আকারে দেখানো হয় তাহলে মজার একটা চিত্র পাওয়া যায়।
