অনেকেই সন্দেহ করেন আসলেই পশুরা সত্যি সত্যি কোনো মানবশিশুকে লালন করতে আগ্রহী কিংবা সক্ষম কি না। পশুরা মানুষের মতো সহমর্মিতা বা স্নেহ-মমতা দেখাতে পারে কি না এটা নিয়ে অনেকের ভেতরেই একধরনের সন্দেহ ছিল।
তবে ১৯৯৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একটি চিড়িয়াখানায় বিচিত্র ঘটনা সবাইকে নূতন করে ভাবতে শিখিয়েছিল। সাড়ে তিন বছরের একটা বাচ্চা সেই চিড়িয়াখানার গরিলাদের জন্যে সংরক্ষিত জায়গায় উঁচু থেকে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।
চিড়িয়াখানার কর্মীরা যখন শিশুটিকে উদ্ধার করার জন্যে ছোটাছুটি করছে তখন তারা সবিস্ময়ে দেখল সেখানকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহিলা গরিলাটি এসে বাচ্চাটিকে খুব সাবধানে কোলে তুলে নিয়ে এক কোনায় গিয়ে বসে থাকে। উদ্ধারকারীরা এসে শিশুটিকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত গরিলা মাতাটি এই শিশুটিকে নিজের সন্তানের মতো পরম মমতায় কোলে নিয়ে বসেছিল।
আমরা মানুষ এবং পশুকে খুব স্পষ্টভাবে বিভাজন করে রাখি–কিন্তু ভালোবাসা এবং মমতার জগতে অনেক জায়গাতেই সেই বিভাজনের দাগটি অস্পষ্ট, পার্থক্যটুকু অনেক সময়ই মিলিয়ে যায়।
১৯. সলিটন
প্রায় দেড়শ বছর আগে জন স্কট রাসেল নামে একজন ইঞ্জিনিয়ার এডিনবার্গে একটা খালের নৌকার একটা ডিজাইন নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। সরু খালের ভেতর দিয়ে নৌকাটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে দুটি ঘোড় টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে দড়িটা ছিঁড়ে গেল। নৌকাটা সাথে সাথে থেমে গেল কিন্তু তখন অত্যন্ত বিচিত্র একটা ব্যাপার ঘটল। নৌকার সামনে জমে থাকা জলরাশি থেকে অত্যন্ত বিচিত্র ধরনের একটা ঢেউ প্রচণ্ড বেগে সামনের দিকে ছুটে যেতে থাকে।
এটাকে ঢেউ বলা ঠিক নয় কারণ ঢেউ উপরে উঠে আর নিচে নামে কিন্তু এখানে কোনো কিছু নিচে নামছে না। খানিকটা পানি উঁচু হয়ে সামনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, পানির ঢেউয়ের বেগ কত হতে পারে সেটা সম্পর্কে সবারই একটা ধারণা আছে। পুকুরে ঢিল মারলে ঢেউটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে, সেটাই হচ্ছে ঢেউয়ের বেগ কিন্তু এখানে উঁচু হয়ে থাকা জলরাশি ছুটে যাচ্ছে ঘণ্টায় প্রায় দশ মাইল বেগে। বিস্মিত এবং কৌতূহলী ইঞ্জিনিয়ার স্কট রাসেল একটা ঘোড়ায় চড়ে সেই বিচিত্র ঢেউয়ের পিছু পিছু ছুটে চললেন এবং তার জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়টা আবিষ্কার করলেন। একটা ঢেউ যখন ছুটে যেতে থাকে তখন ছুটে যেতে যেতে সেটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানে এর একটা গালভরা নাম আছে ডিসপার্সান, কিন্তু এই বিচিত্র ঢেউটির কোনো ডিসপার্মান নেই। এটা যে রূপ নিয়ে তৈরি হয়েছিল হুবহু সেই রূপ নিয়ে ছুটে যেতে থাকল, এটা ছড়িয়ে গেল না, ভেঙে গেল না কিংবা থেমে গেল না। বিস্মিত স্কট রাসেল মাইল দুয়েক এর পিছনে ছুটে গেলেন কিন্তু আঁকাবাকা খালের তীর দিয়ে বেশি দূর ছুটে যেতে পারলেন না। হতবাক ইঞ্জিনিয়ার স্কট রাসেল এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পেলেন না–কিন্তু একজন খাঁটি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের যেটা করা উচিত সেটাই করলেন। বাসার পেছনে ত্রিশ ফুট লম্বা পানির একটা চৌবাচ্চা তৈরি করে সেটা নিয়ে গবেষণা শুরু করে দিলেন। তিনি এটার নাম দিলেন সলিটারি ওয়েভ বা একাকী তরঙ্গ। তার গবেষণার ফলাফল জার্নালে প্রকাশ করলেন এবং বিজ্ঞানে যা হয় তাই হলো, কেউ সেটাকে কোনো গুরুত্ব দিল না। স্কট রাসেলকে বিজ্ঞানী মহল মনে রাখল তার অন্য কাজের জন্যে একাকী তরঙ্গের জন্য নয়।
তারপর একশ’ বিশ বছর কেটে গেল, 1960-এর দশকে বিজ্ঞানীদের হাতে শক্তিশালী কম্পিউটার এসেছে, তারা সেটা দিয়ে নন-লিনিয়ার মাধ্যমে তরঙ্গের প্রবাহ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন এবং হঠাৎ করে তারা আবার নূতন করে স্কট রাসেলের একাকী তরঙ্গকে আবিষ্কার করলেন, এর নাম দেয়া হলো সলিটন এবং বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন আমাদের চারপাশের জগতের সবকিছুতে ছড়িয়ে আছে সলিটন। তরল পদার্থের প্রবাহ থেকে আলোকবিদ্যা, প্লাজমা থেকে শক ওয়েভ, টর্নেডো থেকে বৃহস্পতি গ্রহের লাল দাগ, বস্তু জগতের কণা থেকে প্রোটিনের সংবেদনশীলতা, সুনামী থেকে টেলি যোগাযোগসোজা কথায় এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে সলিটন নেই। বলা যেতে পারে বর্তমানে বিজ্ঞানের জগতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটা হচ্ছে সলিটন।
সলিটনের গতি প্রকৃতি বোঝার জন্যে আমাদের কিছু পারশিয়াল ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশান সমাধান করতে হয়, আমরা সেই পথে এগুব না। ব্যাপারটা কেমন করে ঘটে সেটা তরঙ্গের স্বাভাবিক নিয়ম থেকে বোঝার চেষ্টা করব। আমাদের খুব পরিচিত তরঙ্গ হচ্ছে আলো এবং সেই আলো থেকে তৈরি রংধনু সবাই দেখেছে। বৃষ্টি হবার পর হঠাৎ করে যদি রোদ ওঠে তাহলে আমি সবসময় বাইরে ছুটে যাই রংধনু দেখার জন্যে এবং অবধারিতভাবে রংধনু দেখতে পাই। তখন আকাশে পানির বিন্দুগুলো থাকে এবং সূর্যের আলো সেই পানির ভেতর প্রতিফলিত হয়ে বের হয়ে আসার সময় তার রংগুলোতে ভাগ হয়ে যায় (19.3 নং ছবি)। আলোর ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যকে আমরা আসলে ভিন্ন ভিন্ন রং হিসেবে দেখি। তাই আমরা মোটামুটি বৈজ্ঞানিক ভাষা ব্যবহার করে বলতে পারি আলোর প্রতিসরাঙ্ক নির্ভর করে তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের উপরে, তাই একটা মাধ্যমের ভেতর দিয়ে যাবার সময় কোন আলো কতটুকু বেঁকে যাবে সেটা নির্ভর করে তার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কত। আলোর এই বাঁকা হয়ে যাবার কারণে আমরা রংধনু দেখি, প্রিজমে রং ভাগ হয়ে যেতে দেখি। কিন্তু সেটা না করে আমরা যদি একটা আলোকে একটা মাধ্যমের ভেতর দিয়ে সোজা সামনের দিকে যেতে দিই তাহলে কী দেখব?
