জোঁক নিশ্বাস নেয় তার শরীর দিয়ে। যে সকল জেক পানিতে থাকে তারা পানি থেকে অক্সিজেন নেয়, তাই পানিতে অক্সিজেন কমে গেলে তাদের উপরে উঠে আসতে হয়। নিম্নচাপের সময় পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন একটু কমে আসে বলে জেঁকেরা তখন উপরে ভেসে আসে। প্রাচীন আবহাওয়াবিদরা অনেক সময় এই জোঁকদের দেখে আবহাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করত।
তেলতেলে, পিছলে, আঠালো, কিলবিলে জোঁকের জন্য সাধারণ মানুষের ঘেন্নার শেষ নেই, চুষে খাওয়া, শোষণ করা এই ধরনের নেতিবাচক শব্দ তৈরি করতে হলে জোঁকের নামটাই সবার আগে জুড়ে দেয়া হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রায় তিন হাজার বছর আগে থেকে জোঁককে চিকিৎসার জন্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধারণা করা হয় এটা শুরু হয়েছিল আমাদের এই উপমহাদেশ থেকে। প্রাচীন পৃথিবীতে এই উপমহাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের গুরু ধন্বন্তরীর কাহিনীতে এক হাতে রয়েছে মধু অন্য হাতে জোঁক। প্রাচীন চীনা ছবিতে চিকিৎসার জন্যে জোক ব্যবহারের উদাহরণ আছে। গ্রিক এবং রোমান সভ্যতাতেও চিকিৎসার জন্যে জোঁকের ব্যবহার করা হয়েছে। এত হাজার হাজার বছর থেকে যে পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয়েছে তার মাঝে নিশ্চয়ই কিছুটা হলে সত্যতা রয়েছে এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও সেটা কিন্তু স্বীকার করে নিয়েছে।
আগে যেরকম সকল রোগের চিকিৎসায় জোক ব্যবহার করা হতো এখন সে রকম নয়! চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন শরীরের ভেতর কী হয় না হয় তার সবকিছু আরও ভালোভাবে জানে তাই জোঁককে সত্যিকার সমস্যা সমাধানে লাগাতে পারে। এরকম একটি সমস্যা হচ্ছে অস্ত্রোপচারে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুনঃস্থাপন। 1985 সালে যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন শহরে পাঁচ বছরের একটা ছোট বাচ্চার কান একটা কুকুর কামড়ে আলাদা করে ফেলেছিল। ডাক্তাররা দীর্ঘ সময় ধরে অস্ত্রোপচার করে তার কাটা কানটি পুনঃস্থাপন করেছিল–কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়! রক্ত সঞ্চালনের জন্যে ধমনি শিরা যতটুকু সম্ভব জোড়া দেয়ার চেষ্টা করা হলেও সেটা ঠিক করে কাজ করে না। ছিন্নভিন্ন ধমনি, শিরা-উপশিরাগুলো থাকে দুর্বল এবং তার ভেতর দিয়ে রক্ত সঞ্চালন হতে চায় না। কাজেই সেখানে রক্ত এসে জমা হয়, সেগুলো কোথাও যেতে পারে না। বস্টনের হাসপাতালের সার্জনেরা তখন বাচ্চার কানে কয়েকটা জোঁক লাগিয়ে দিলেন। ক্ষুধার্ত জোকগুলো জমা হয়ে থাকা রক্ত খেয়ে ক্ষতস্থানটাকে রক্ষা করে দিল। শুধু তাই নয়, জোঁকুগুলো রক্ত টেনে নিচ্ছিল বলে সেখানে রক্ত সঞ্চালিত হচ্ছিল তাই ক্ষতস্থানটা আরোগ্য লাভ করল অনেক দ্রুত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে অস্ত্রোপচারের পর ডাক্তাররা জোঁক পেলেন কোথায়? তারা কী তাদের অফিসের একজনকে পাশের ডোবায় পাঠিয়ে দিলেন জোঁক খুঁজে আনার জন্যে? সেই মানুষটি কী এঁদো ডোবায় পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে রইল জোঁক ধরার জন্যে? যখন জোক ধরল তখন টেনে সেটাকে ছুটিয়ে দৌড়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে এলো? আসলে এ রকম কিছু করার প্রয়োজন হয় না, কারণ চিকিৎসায় ব্যবহার করার জন্যে জোঁক কিনতে পাওয়া যায়। বর্তমান বাজার মূল্যে একটা হৃষ্টপুষ্ট (কিন্তু ক্ষুধার্ত) জোঁকের দাম সাত থেকে আট ডলার (প্রায় পাঁচশ টাকা!) চিকিৎসার জন্যে যে জোঁক ব্যবহার করা হয় সেগুলো খুব বড় নয়, তাই একটা জোক দিয়ে হয় না। পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া শেষ করতে গোটা পঞ্চাশেক জোঁক লেগে যায়। জোঁক একবার ভালো মতোন রক্ত খেয়ে নিয়ে পরের তিন-চার মাস পর্যন্ত কিন্তু খেতে হয় না বলে একটা জোঁককে বারবার ব্যবহার করা যায় না!
চিকিৎসার কাজে জোঁকের ব্যবহার আবার নূতন করে শুরু হতে যাচ্ছে–এটা আসলে বিচিত্র কিছু নয়। মানুষ অনেক কিছুই প্রাণিজগৎ থেকে শিখেছে কিছু কিছু কাজ এই প্রাণীগুলো মানুষের আধুনিক যন্ত্রপাতি থেকেও অনেক ভালোভাবে করে–কাজেই সেই প্রাণীগুলো ব্যবহার করতে দোষ কোথায়?
মানুষের শরীরের কোথাও যখন পচন ধরে যায় তখন অস্ত্রোপচার করে সেটা পরিষ্কার করা খুব সহজ নয়। তার চাইতে অনেক কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে মাছির ডিম ঢুকিয়ে দেয়া–সেই ডিম থেকে (লার্ভা) কৃমি বের হয়ে, সর্বগ্রাসী ক্ষুধা নিয়ে সেগুলো বেছে বেছে পচা মাংস খেয়ে একসময় মাছি হয়ে উড়ে বের হয়ে যায়! বর্ণনা শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যিই এটা করা হয়–মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা সত্যিকার ডাক্তাররাই করেন। এই মাছির ডিমও কিনতে হয়– রীতিমতো পয়সা খরচ করে! আমাদের চারপাশের পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, সাপ, ব্যাঙ, কেঁচো, জোঁক যে কত মূল্যবান সেটা যেন কেউ ভুলে না যাই!
১৩. এইডস এবং একটি মহাদেশের অপমৃত্যু
1981 সালে এইডস রোগটিকে চিহ্নিত করার পর থেকে এখন পর্যন্ত এই রোগটিতে আড়াই কোটি মানুষ মারা গেছে (25 million)। পৃথিবীর ইতিহাসে এখন এটাকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মহামারীগুলোর একটি বলে বিবেচনা করা হয়। যে ভাইরাসের কারণে এই রোগটি হয় তার নাম এইচ.আই.ভি (HIV)-2007 সালে এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন কোটি। যার অর্থ বর্তমান পৃথিবীতে প্রতি দুশো মানুষের মাঝে একজন তার রক্তে এইচ.আই.ভি, বহন করে যাচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে পৃথিবীতে এত বড় একটা বিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে ব্যাপারটা জেনে-শুনেও আমাদের বিশ্বাস হতে চায় না।
