এতে ব্যথা লাগবে না তো? সে দিনের ইঞ্জেকশনে কিন্তু ব্যথা লেগেছিল।
ব্যথা লাগবে না কথা দেওয়াতে সে যেন খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে শরীরটাকে পিছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে হাত দুটোকে চেয়ারের পাশে নামিয়ে দিল। তার ঘাড়ে একটা জায়গায় ক্ষতের উপরে প্লাস্টার ছাড়া শরীরের অনাবৃত অংশে আর কোথাও কোনও ক্ষতচিহ্ন দেখলাম না।
শেরিংকে হেলমেট পরাতে কোনও অসুবিধা হল না। তারপর লাল বোতামটা টিপতেই হেলমেট-সংলগ্ন ব্যাটারিটা চালু হয়ে গেল। শেরিং একটা কাঁপুনি দিয়ে শরীরটাকে কাঠের মতো শক্ত ও অনড় করে ফায়ারপ্লেসের আগুনের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
ঘরের ভিতরে এখন অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। এক শেরিং ছাড়া প্রত্যেকেরই দ্রুত নিশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ পাচ্ছি। ক্লারা দরজার মুখটাতে দাঁড়িয়ে আছে। নার্স খাটের পিছনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে শেরিং-এর দিকে চেয়ে আছে। বুশ ও উলরিখ শেরিং-এর চেয়ারের দু পাশে দাঁড়িয়ে উৎকণ্ঠায় ঝুকে পড়েছে সামনের দিকে। আমি বুশকে মৃদু স্বরে বললাম, তুমি প্রশ্ন করতে চাও? না আমি করব? তুমি করলেও কাজ হবে কিন্তু।
তুমিই শুরু করো।
আমি ঘরের কোণ থেকে একটা ছোট টুল নিয়ে শেরিং-এর মুখোমুখি বসলাম। তারপর প্রশ্ন করলাম
তোমার নাম কী?
শেরিং-এর ঠোঁট নড়ল। চাপা অথচ পরিষ্কার গলায় উত্তর এল।
হিয়েরোনিমাস হাইনরিখ শেরিং।
এই প্রথম–রুদ্ধ স্বরে বলে উঠল। বুশ-এই প্রথম নিজের নাম বলেছে।
আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলাম।
তোমার পেশা কী?
পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক।
তোমার জন্ম কোথায়?
অস্ট্রিয়া।
কোন শহরে?
ইন্স্ব্রুক।
আমি বুশের দিকে একটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিলাম। বুশ মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিল— মিলছে। আমি আবার শেরিং-এর দিকে ফিরলাম।
তোমার বাবার নাম কী?
কার্ল ডিট্রিখ শেরিং।
তোমার আর ভাইবোন আছে?
ছোট বোন আছে একটি। বড় ভাই মারা গেছে।
কবে মারা গেছে?
প্রথম মহাযুদ্ধে। পয়লা অক্টোবর, উনিশশো সতেরো।
আমি প্রশ্নের ফাঁকে ফাঁকে বিস্ময়মুগ্ধ বুশের দিকে চেয়ে তার মৃদু মৃদু মাথা নাড়া থেকে বুঝে নিচ্ছি, শেরিং-এর উত্তরগুলো সব মিলে যাচ্ছে।
তুমি লান্ডেক গিয়েছিলে?
হ্যাঁ।
কী করতে?
প্রোফেসর লুবিনের সঙ্গে কাজ ছিল।
কী কাজ?
গবেষণা।
কী বিষয়?
বি-এক্স থ্রি সেভন সেভন।
বুশ ফিসফিস করে জানিয়ে দিল, এটা হচ্ছে গবেষণাটির সাংকেতিক নাম। আমি প্রশ্নে চলে গোলাম।
সেই গবেষণার কাজ কি শেষ হয়েছিল?
হ্যাঁ।
সফল হয়েছিল?
হ্যাঁ।
গবেষণার বিষয়টা কী ছিল?
আমরা একটা নতুন ধরনের আণবিক মারণাস্ত্র তৈরি করার ফরমুলা বার করেছিলাম।
কাজ শেষ করে তোমরা ওয়ালেনস্টাট আসছিলে?
হ্যাঁ।
তোমার সঙ্গে গবেষণার কাগজপত্র ছিল?
হ্যাঁ।
ফরমুলাও ছিল?
হ্যাঁ।
পথে একটা দুর্ঘটনা ঘটে?
হ্যাঁ।
কী হয়েছিল?
বুশ আমার কাঁধে হাত রাখল। আমি জানি কেন। কিছুক্ষণ থেকেই লক্ষ করছি, শেরিং-এর মধ্যে একটা চাপা উশখুশে ভাব। একবার জিভ দিয়ে ঠোঁটটা চাটল। একবার যেন চোখের পাতা পড়ে পড়ো হল। কপালের শিরাগুলোও যেন ফুলে উঠেছে।
শেরিং-এর কথা বন্ধ হয়ে গেল। তার দ্রুত নিশ্বাস পড়ছে। আমার বিশ্বাস, গোপনীয় গবেষণার বিষয়টা প্ৰকাশ করে ফেলে ওর মধ্যে একটা উদ্বেগের ভাব জেগে উঠেছে।
আমি সবুজ বোতাম টিপে ব্যাটারি বন্ধ করে দিলাম। এই অবস্থায় আর প্রশ্ন করা উচিত হবে না। বাকিটা কাল হবে।
হেলমেট খুলে নিতেই শেরিং-এর মাথা পিছনে হেলে পড়ল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে পরমুহুর্তেই আবার চোখ খুলে এদিক ওদিক চেয়ে বলল, চুরুট…একটা
আমি শেরিং-এর কপালের ঘাম মুছিয়ে দিলাম। বুশ যেন অপ্রস্তুত। গলা খাকরিয়ে বলল, চুরুটতো নেই। এ-বাড়িতে কেউ চুরুট খায় না। সিগারেট খাবে?
উলরিখ তার পকেট থেকে সিগারেট বার করে এগিয়ে দিয়েছে। শেরিং সিগারেট নিল कf।
হ্যাঁ, ছিল। বলল শেরিং। সে যেন ক্লান্ত, অস্থির।
কালো রঙের কেস কি?
হ্যাঁ, হ্যাঁ।
তা হলে সেটা উইলির কাছে আছে। ক্লারা, একবার খোঁজ করে দেখবে কি?
ক্লারা তৎক্ষণাৎ তার ছেলের খোঁজে বেরিয়ে গেল।
নার্স শেরিং-এর হাত ধরে তুলে, তাকে খাটে শুইয়ে দিল। বুশ খাটের দিকে এগিয়ে গিয়ে হেসে বলল, এবার তোমার মনে পড়েছে তো?
উত্তরে শেরিং যেন অবাক হয়ে বুশের দিকে চাইল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল, কী মনে পড়েছে?
শেরিং-এর এই পালটা প্রশ্ন আমার মোটেই ভাল লাগল না। বুশও যেন হতভম্ব। সে নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে সহজভাবেই বলল, তুমি কিন্তু আমাদের প্রশ্নের জবাব ঠিকই দিয়েছ।
কী প্রশ্ন? কী প্রশ্ন করেছ আমাকে?
এবার আমি গত কয়েক মিনিট ধরে যে প্রশ্নোত্তর চলেছে, তার একটা বিবরণ শেরিংকে দিলাম। শেরিং কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর তার ডান হাতটা আলতো করে নিজের মাথার উপর রেখে আমার দিকে ফিরে বলল, আমার মাথায় কী পরিয়েছিলে?
কেন বলো তো?
যন্ত্রণা হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন অজস্র পিন ফুটছে।
তোমার মাথায় এমনিতেই চোট লেগেছিল। পাহাড়ের গা দিয়ে গড়িয়ে পড়ার সময় তুমি মাথায় চোট পাও, তার ফলে তোমার পূর্বস্মৃতি লোপ পায়।
শেরিং বোকার মতো আমার দিকে চেয়ে বলল, কী সব বলছি তুমি। পাহাড় দিয়ে গড়িয়ে পড়ব কেন?
আমরা তিনজন পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।
ক্লারা ফিরে এসেছে। তার হাতে আমার দেখা চুরুটের কেস। সে সেটা শেরিং-এর হাতে দিয়ে বিনীতভাবে বলল, আমার ছেলে কখন যেন এটা নিয়ে নিজের ঘরে রেখে দিয়েছিল। তুমি কিছু মনে কোরো না।
