ক্যাডিলাক গাড়ি। সিলভার ক্যাডিলাক।
আমাদের মারসেডিস তার পাশে এসে দাঁড়াল। গাড়িটা কেন থেমে আছে, তার কারণটা এবার বুঝলাম। রাস্তার এক পাশে ছটকে গিয়ে সেটা একটা গাছের গুড়িতে মেরেছে। ধাক্কা। গাড়ির সামনের অংশ গেছে থেঁতলে।
কারেরাস বলল, সিনিয়র আর্গাসের গাড়ি। এ ছাড়া আরেকটা সিলভার ক্যাডিলাক আছে সানতিয়াগোতে। ব্যাঙ্কার সিনিয়র গালদামেসের গাড়ি। কিন্তু এটার নম্বর আমার চেনা।
গাড়ি তো রয়েছে, কিন্তু আর্গাস কোথায়?
আর আমার কর্ভাসই বা কোথায়?
ড্রাইভারের পাশের সিটে ওটা কী?
জানোলা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে দেখলাম, সেটা কর্ভাসের খাঁচা। দরজার চাবি আমারই তৈরি, আর সেটা রয়েছে আমারই পকেটে। আজ দুপুরে দরজায় চাবি দিইনি, শুধু ছিটিকিনিটাই লাগানো। কভার্স খাঁচা থেকে নিজেই বেরিয়েছে সন্দেহ নেই; কিন্তু তার পরে?
হঠাৎ একটা চিৎকার কানে এল। দূর থেকে। মানুষের গলা।
কারেরাস ও অন্য পুলিশটি বন্দুক উঁচিয়ে তৈরি। আমাদের ড্রাইভার দেখলাম ভিতু লোক। সে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে মেরিমাতার নাম জপ করতে শুরু করেছে। গ্রেনফেল ফিসফিস করে বলল, ম্যাজিশিয়ান জাতটা আমাকে বড় আনকামফােরটেবল করে তোলে। আমি বললাম, তুমি বরং আমাদের গাড়ির ভিতরে গিয়ে বোসো।
চিৎকারটা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। রাস্তার বাঁ দিক থেকে। কিছু দূরে কতকগুলো ঝোপড়া। দু-একটা বড় বড় গাছও রয়েছে। সেই দিক থেকেই আসছে। চিৎকারটা। কাল রাত্রে ফিসফিসে গলা শুনেছি, তাই চিনতে দেরি হল। এ গলা আর্গাসের। অকথ্য অশ্রাব্য স্প্যানিশে সে গাল দিয়ে চলেছে। কার উদ্দেশ্যে? ডেভিল বা শয়তানের স্প্যানিশ প্রতিশব্দটা বারিকয়েক কানো এল, আর তার সঙ্গে কর্ভাসের নামটা।
কোথায় গেল সে শয়তান পাখি? কিভাস! কিভােস। মুর্থ পাখি! শয়তান পাখি। নরকবাস আছে তোর কপালে। নরকবাস!–
আর্গাসের কথা আচমকা থেমে গেল–কারণ সে আমাদের দেখতে পেয়েছে। আমরাও দেখতে পাচ্ছি তাকে। তার দু হাতে দুটো রিভলভার। একশো হাত দূরে একটা ঝোপড়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে।
কারেরাস হুঙ্কার দিয়ে উঠল, সিনিয়র আগাঁস, তোমার অস্ত্ৰ নামাও! নইলে—
একটা কৰ্ণপটহ বিদারক শব্দে আমাদের মারসেডিসের দরজায় একটা রিভলভারের গুলি এসে লাগল। তারপর আরও তিনটে গুলির শব্দ। এ দিকে ও দিকে আমাদের মাথার উপর দিয়ে ছটকে বেরিয়ে গেল সেগুলি। কারেরাস দৃপ্ত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, সিনিয়র আর্গাস, আমাদের কাছে বন্দুক রয়েছে। আমরা পুলিশ। আপনি যদি রিভলভার না ফেলে দেন, তবে আমরা আপনাকে জখম করতে বাধ্য হব।
জখম? আর্গাস শুকনো গলায় আর্তনাদ করে উঠল। তোমরা পুলিশ? আমি যে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
আর্গাস এখন পচিশ হাতের মধ্যে। এইবার বুঝলাম তার দশটা। তার চশমাটি খোওয়া যাওয়াতে সে প্রায় অন্ধের সামিল হয়ে পড়ে যত্রতত্র গুলি চালিয়েছে।
আর্গাস হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে হোঁচটি খেতে খেতে এগিয়ে এল। কারেরাস ও অন্য পুলিশটি তার দিকে এগিয়ে গেল। আমি জানি, এ সংকটে আর্গাসের কোনও ভেলকিই কাজ করবে না। তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। কারেরাস এগিয়ে গিয়ে মাটি থেকে রিভলভার দুটো তুলে নিল। আর্গাস তখন বলছে, সে পাখি উধাও হয়ে গেল! দ্যাট ইনডিয়ান ক্ৰো! শয়তান পাখি…কিন্তু কী অসামান্য তার বুদ্ধি!
গ্রেনফেল কিছুক্ষণ থেকে ফিসফিস করে কী যেন বলতে চেষ্টা করছিল, এবারে তার কথাটা বুঝতে পারলাম।
শঙ্কু-দ্যাট বার্ড ইজ হিয়ার।
কী রকম? কোথায় কিভাস? আমি তো দেখছি না তাকে!
গ্রেনফেল রাস্তার উলটোদিকে নেড়া অ্যাকেসিয়া গাছটার মাথার দিকে আঙুল দেখাল।
উপরে চেয়ে দেখলাম— সত্যিই তো—আমার বন্ধু, আমার শিষ্য, আমার প্রিয় কর্ভাস গাছটার সবচেয়ে উচু ডালে বসে নিশ্চিন্তভাবে আমাদের দিকে ঘাড় নিচু করে দেখছে।
তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতেই সে অক্লেশে গোঁত খাওয়া ঘুড়ির মতো গাছের মাথা থেকে নেমে এসে বসল। আমাদের মারসেডিসের ছাদের উপর। তারপর অতি সন্তৰ্পণে–যেন জিনিসটার মূল্য সে ভালভাবেই জানে— তার ঠোঁট থেকে তার সামনেই নামিয়ে রাখল আর্গাসের মাইনাস বিশ পাওয়ারের সোনার চশমাটা।
আনন্দমেলা। পূজাবার্ষিকী ১৩৭৯
ডক্টর শেরিং-এর স্মরণশক্তি (প্রোফেসর শঙ্কু)
২রা জানুয়ারি
আজ সকালটা বড় সুন্দর। চারিদিকে ঝলমলে রোদ, নীল আকাশে সাদা সাদা হৃষ্টপুষ্ট মেঘ, দেখে মনে হয় যেন ভুল করে শরৎ এসে পড়েছে। সদ্য-পাড়া মুরগির ডিম হাতে নিলে যেমন মনটা একটা নির্মল অবাক আনন্দে ভরে যায়, এই আকাশের দিকে চাইলেও ঠিক তেমনই হয়।
আনন্দের অবিশ্যি আরেকটা কারণ ছিল। আজ অনেক দিন পরে বিশ্রাম। আমার যন্ত্রটা আজই সকালে তৈরি হয়ে গেছে। বাগান থেকে ল্যাবরেটরিতে ফিরে এসে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে যন্ত্রটার দিকে চেয়ে থেকে একটা গভীর প্রশান্তি অনুভব করছি। জিনিসটা বাইরে থেকে দেখতে তেমন কিছুই নয়; মনে হবে যেন হাল ফ্যাশানের একটা টুপি বা হেলমেট। এই হেলমেটের খোলের ভিতর রয়েছে বাহাত্তর হাজার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তারের জটিল স্নায়বিক বিস্তার। সাড়ে তিন বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। এই যন্ত্র। এটা কী কাজ করে বোঝানোর জন্য একটা সহজ উদাহরণ দিই।
এই কিছুক্ষণ আগেই আমি চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে আমার চাকর প্রহ্লাদ এসেছিল কফি নিয়ে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, গত মাসের ৭ই সকালে বাজার থেকে কী মাছ এনেছিলে? প্রহ্লাদ মাথাটাথা চুলকে বলল, এজ্ঞে সে তো স্মরণ নাই বাবু! আমি তখন তাকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে হেলমেটটা মাথায় পরিয়ে দিয়ে একটা বোতাম টিপতেই প্ৰহ্বাদের শরীরটা মুহুর্তের জন্য শিউরে উঠে একেবারে স্থির হয়ে গেল। সেই সঙ্গে তার চোখ দুটো একটা নিষ্পলক দৃষ্টিহীন চেহারা নিল। এবার আমি তাকে আবার প্রশ্নটা করলাম। প্রহ্লাদ, গত মাসের সাত তারিখ সকালে বাজার থেকে কী মাছ এনেছিলে? প্রশ্নটা করতেই প্ৰহাদের চাহনির কোনও পরিবর্তন হল না; কেবল তার ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে জিভটা নড়ে উঠে শুধু একটি মাত্ৰ কথা উচ্চারিত হল–ট্যাংরা।
