আমি বললাম, তা তো দেখতেই পাচ্ছি, কিন্তু তোমার মনিবের কেন এত দেরি হচ্ছে বলতে পার?
ইয়া, ইয়া।
কেন?
এর শ্লেফ্ট।-অৰ্থাৎ তিনি ঘুমোচ্ছেন। অর্থাৎ আমার ধারণা নির্ভুল।
আমি চাকরকে বললাম ব্রেকফাস্ট টেবিলের উপর রেখে দিতে। চাকর ট্ৰে সমেত রিসেপশন রুমে ঢুকে গেল।
কপালজোরে এই সুযোগ জুটেছে। এটার সদ্ব্যবহার না করলেই নয়।
আমি হল থেকে বেরিয়ে বাইরে এলাম।
ওই যে ডাইমলার দাঁড়িয়ে আছে, গাড়ির চালক পকেটে হাত দিয়ে তার পাশে পায়চারি করছে।
আমি এগিয়ে গেলাম। কী করব তা স্থির করে ফেলেছি।
আমায় আসতে দেখে ড্রাইভার দাঁড়িয়ে পড়ল। পকেট থেকে তার হাত দুটো বেরিয়ে এল। সে অবাক হয়েছে। আমার আসাটা তার হিসেবের বাইরে।
আমি এগিয়ে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, আমাকে বার্লিন নিয়ে চলো। যেখান থেকে এসেছি সেখানে।
ড্রাইভার হাঁ-হাঁ করে উঠল।
নাইন! ইখ্ কান এস্ নিখ্ট–না, আমি তা করতে পারি না।
এবার পার?
আমি পকেট থেকে সন্ডার্সের দেওয়া লুগার অটোম্যাটিকটা বার করে ড্রাইভারের দিকে উঁচিয়ে ধরেছি।
ড্রাইভারের মুখ মুহুর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
ইয়া, ইয়া, ইয়া। ড্রাইভার নিজেই দরজা খুলে দিল। আধা ঘণ্টার মধ্যে সতেরো নম্বর ফ্রীডরিখস্ট্রাসেতে পৌঁছে গেলাম।
স্টাইনার পরিবারের তিনজনই আমার জন্য গভীর উৎকণ্ঠায় সময় কাটাচ্ছিল। প্রোফেসর স্টাইনার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। নরবার্ট বলল, কী ব্যাপার? কোথায় নিয়ে গিয়েছিল তোমাকে?
আমি সংক্ষেপে ঘটনাটা বলে বললাম, তোমরা এক্ষুনি তোড়জোড় শুরু করো। কালই প্যারিস চলে যাও। কেউ তোমাদের বাধা দেবে না। আমি আজই বিকেলের প্লেনে লন্ডনে ফিরে যাব। নরবার্ট, তুমি দয়া করে বুকিং-এর ব্যবস্থাটা করে দাও।
বিকেলে চারটের ফ্লাইটে উড়ন্ত প্লেনে বসে বুঝলাম, মনের মধ্যে দুটো বিপরীত ভাবের দ্বন্দ্ব চলেছে। অন্তত একটা ইহুদি পরিবারকে নাৎসি নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছি বলে যেমনই আনন্দ হচ্ছে, তেমনই অভক্তি হচ্ছে ভেবে যে, আমার ওষুধের ফলে দুটি নরপিশাচ ব্যারামের হাত থেকে রেহাই পেল।
সন্ডার্স ভাবতে পারেনি। আমি এত তাড়াতাড়ি ফিরব। বার্লিনে কী হল জানবার জন্য সকলেই উৎসুক। তোমার যাত্রা সফল কি না সেটা আগে বলো।
আমি বললাম, একদিক দিয়ে অভাবনীয়ভাবে সফল। স্টাইনার সুস্থ এবং তাদের সমস্ত সমস্যা দূর।
ব্রাভো!
কিন্তু সেইসঙ্গে আরেকটা ব্যাপার আছে, যেটা শুনে তুমি মোটেই খুশি হবে না।
কী?
তোমার অনুমানে ভুল ছিল না, সন্ডার্স!
তোমাকে নাৎসিদের খপ্পরে পড়তে হয়েছিল?
হ্যাঁ।
আমি ব্ল্যাকশার্ট-গোয়রিং সংক্রান্ত ঘটনার একটা রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা দিয়ে বললাম, চারটে করে মিরাকিউরলের বড়ি যদি শুধু ওদের ঘুম পাড়িয়ে আমাকে পালাবার সুযোগ করে দিত তা হলে কথা ছিল না। কিন্তু সেইসঙ্গে ওই দুই পাষণ্ডের দুই বিশ্ৰী ব্যারাম সারিয়ে দিল ভাবতে আমার মনটা বিষিয়ে উঠছে। তুমি বিশ্বাস করো, সন্ডার্স। কিন্তু এ কী! সন্ডার্সের ঠোঁটের কোণে হাসি কেন? এবার সে তার প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে আমার অচেনা একটা শিশি বার করল, তাতে সাদা বড়ি।
এই নাও তোমার মিরাকিউরল।
মানে?
খুব সহজ। সেদিন তুমি আর ডরথি বেরোলে, আমি প্ৰবন্ধ লেখার জন্য রয়ে গেলাম। সেই ফাঁকে আমি তোমার বাক্স খুলে তোমার শিশি থেকে মিরাকিউরল বার করে তার জায়গায় অব্যর্থ ঘুমের ওষুধ সেকেন্যালের বড়ি ভরে দিয়েছিলাম। একসঙ্গে চারটে সেকেন্যালের বড়ি যে মারাত্মক ব্যাপার-দশ মিনিটের মধ্যে নিদ্রা অবধারিত!… মাই ডিয়ার শঙ্কু-তোমার মহৌষধ বিশ্বের হীনতম প্রাণীর উপকারে আসবে এটা আমি চাইনি, চাইনি, চাইনি!
আমার মন থেকে সব অন্ধকার দূর হয়ে গেল। সন্ডার্সের হাতটা মুঠো করে ধরলাম—মুখে কিছু বলতে পারলাম না।
আনন্দমেলা। পূজাবার্ষিকী ১৩৯৭
হিপনোজেন (প্রোফেসর শঙ্কু)
৭ই মে
আমার এই ছেষট্টি বছরের জীবনে পৃথিবীর অনেক জায়গা থেকে অনেকবার অনেক রকম নেমন্তস্ন পেয়েছি; কিন্তু এবারেরটা একেবারে অভিনব। নরওয়ের এক নাম-না-জানা গণ্ডগ্ৰাম থেকে এক এক্সপ্রেস টেলিগ্রাম; টেলিগ্রাম মানে চিঠির বাড়া; গুনে দেখেছি, একশো তেত্ৰিশটা শব্দ। যিনি করেছেন তাঁর নাম আগে শুনিনি। নতুন কোনও চরিতাভিধানে তাঁর নাম খুঁজে পাইনি। এনসাইক্লোপিডিয়াতেও নেই। পাঁচিশ বছরের পুরনো এক জামান হুজ হু-তে বলছে-আলেকজান্ডার ক্রাগ নামে এক ভদ্রলোক ব্রোজিলের এক হিরের খনির মালিক ছিলেন; তিনি নাকি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। সুতরাং এই আলেকজান্ডার ক্ৰাগ নিশ্চয়ই অন্য ব্যক্তি। কিন্তু ইনি যে-ই হন না কেন, আমাকে এর এত জরুরি প্রয়োজন কেন সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। টেলিগ্রাম বলছে প্লেনের টিকিট চলে আসছে আমার নামে-প্ৰথম শ্রেণীর টিকিট-আমি যেন সেটা পাওয়ামাত্র নরওয়ে রওনা দিই। অসলোর বিমানঘাঁটিতে গাড়ি অপেক্ষা করবে, সে গাড়ির নম্বর ও ড্রাইভারের নাম দেওয়া আছে টেলিগ্রামে। সেই গাড়িই আমাকে নিয়ে যাবে এই রহস্যময় মিঃ ক্রাগের বাসস্থানে। সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগবে পৌঁছাতে সে কথাও বলা আছে, এবং আরও বলা আছে যে যাওয়াটা আমার পক্ষে লাভজনক হবে, কারণ সেখানে নাকি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ-অন্যতম শ্রেষ্ঠ নয়, একেবারে শ্রেষ্ঠ-বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন। মিস্টার ক্ৰাগ। কে এই অত্যাশ্চর্য খামখেয়ালি ভ আমার সঙ্গে পরিচিত হবার ইচ্ছেটা তেমন প্রবল না হলে সে অত খরচ করে তার করবে কেন?
