নরবার্ট বলে চলল, বাবা বারবার আদেশ সত্ত্বেও হাইল হিটলার বলতে রাজি হননি। তখন পুলিশ তাঁকে আক্রমণ করে। বেপরোয়াভাবে প্রহার করে পুলিশ যখন চলে যায়, তখন বাবা অর্ধমৃত। তাঁর সবাঙ্গ রক্তাক্ত, মাথা ফেটে গেছে। বার্লিনের কোনও হাসপাতালে ইহুদিদের ঢুকতে দেয় না। আমাদের বাড়ির ডাক্তার হুবারমানও ইহুদি—তিনি বাড়ি থেকে বেরোন না। পরিচযা যেটুকু করার সেটা করেছি। আমার বোন আর আমি। কিন্তু বাবা যে অবস্থায় রয়েছেন, ভুল বকছেন, গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে—তাতে মনে হয় না। তিনি আর দুএক দিনের বেশি বাঁচবেন। গতকাল কাগজে আমি প্রোফেসর শঙ্কু আর মিরাকিউরলের কথা পড়লাম।
নরবার্টের কাতর দৃষ্টি এবার আমার দিকে ঘুরল।
এক, যদি আপনি বাবাকে বাঁচান…
সন্ডার্স বলল, তুমি কি প্রোফেসরকে বার্লিন নিয়ে যেতে চাইছ?
না হলে বাবা বাঁচবেন না, মিঃ সন্ডার্স! আর বাবা হলেন সত্যিকার ভারতপ্রেমিক। সাতবার ভারতবর্ষে গেছেন। বলেন, সংস্কৃত ভাষায় যে ঐশ্বর্য আছে তেমন আর কোনও ভাষায় নেই। …আমি টাকা নিয়ে এসেছি। কাল দুপুরে হেস্টন থেকে বার্লিনের প্লেন ছাড়বে সাড়ে এগারোটায়, বিকেল সাড়ে চারটায় বার্লিন পৌঁছোবে। আমাদের বাড়িতেই থাকবেন। প্রোফেসর। আমিই আবার দুদিন পরে ওঁকে প্লেনে তুলে দেব। ওঁর এক পয়সা খরচ লাগবে না।
কিন্তু ওঁর নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা হবে?
ভারতবাসীদের উপর তো নাৎসিদের কোনও আক্রোশ নেই বলল নরবার্ট। ওঁর কোনও ক্ষতি হবে না। এ আমি জোর দিয়ে বলতে পারি।
সন্ডার্স কয়েক মুহুর্ত চুপ থেকে বলল, তোমার বাবাকে কি দেখলে ইহুদি বলে বোঝা যায়?
তা যায়।
ওঁর চুল কি কালো?
হ্যাঁ।
তা হলে তোমার চুল সোনালি হল কী করে? তোমার মা-র চুল কি তোমার মতো?
না, মা-র চুলও কালো ছিল উনি মারা গেছেন। পাঁচ বছর আগে। এই বলে নরবার্ট তার চুলের একটা অংশ ধরে টান দিতে সোনালি পরচুলা খুলে গিয়ে কালো চুল বেরিয়ে পড়ল।
এবার বুঝতে পারছি কেন আমি স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াতে পারি? আর তা ছাড়া স্টাইনার নাম শুধু ইহুদিদের হয় না, অন্যদেরও হয়। আমি বলছি ওঁর কোনও বিপদ হবে না।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম। বাবা বেঁচে থাকলে বলতেন, তুই যা রে তিলু। একজন মনীষীর ত্ৰাণিকতা হতে পারলে তোর জীবন ধন্য হবে।
সন্ডার্সকে দেখেই বুঝতে পারছিলাম ও সবিশেষ চিন্তিত। এবার ও আমার দিকে ফিরে বলল, তোমার কী মত, শঙ্কু?
আমি বললাম, এত বড় একজন ভারততাত্ত্বিককে মৃত্যুর কবল থেকে উদ্ধার করতে পারলে আমার আত্মা শান্তি পাবে।
তবে যাও, বলল সন্ডার্স, কিন্তু দু দিনের বেশি কোনওমতেই থাকবে না। তোমাকেও বলছি, নরবার্ট—যদি ঈশ্বরের কৃপায় এবং মিরাকিউরলের গুণে তোমার বাবা পুনর্জীবন লাভ করেন, সে খবরটা তুমি ঢাক পিটিয়ে লোককে বলতে যেও না। তা হলে প্রোফেসরকে আরও ডজনখানেক মুমূর্ষ ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য অনির্দিষ্টকাল বার্লিনে থেকে যেতে হবে।
আমি কথা দিচ্ছি সেটা হবে না।
নরবার্ট উঠে পড়ে বলল, আমি কাল সকাল দশটায় ট্যাক্সি নিয়ে এখানে এসে হাজির হব।
নরবাট চলে গেলে সন্ডার্স আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি মিরাকিউরলের কোটা বড়ি এনেছ?
চবিবশটা।
সেগুলো কোথায় থাকে?
আমার সুটকেসে একটা শিশির মধ্যে। কারুর চিকিৎসা করতে যাবার সময় আমি চারটে বড়ি সঙ্গে নিয়ে নিই। তবে বার্লিনে অবিশ্যি আমার সঙ্গে সব বড়িই থাকবে; চারটে থাকবে পকেটে, আর বাকি ব্যাগে।
যে ব্যাপারে আমার সবচেয়ে বেশি ভয় করছে সেটা হল এই-জামনিতে তোমার খবর পৌঁছে গেছে সে তো তুমি দেখলেই; ধরে যদি বার্লিন গিয়ে তুমি নাৎসিদের খপ্পরে পড়? তাদের মধ্যে তো অনেকেরই দুরারোগ্য ব্যাধি থাকতে পারে। তাদের কেউ তোমার ওষুধের উপকারিতা ভোগ করছে এটা ভাবতে আমার আপাদমস্তক জ্বলে যায়।
তুমি কোনও চিন্তা করো না, সন্ডার্স। খবরের কাগজের ছবি থেকে মানুষ চেনা অত সহজ নয়। তা ছাড়া বার্লিনে আমার বয়সি আরও অনেক ভারতীয় আছে, যারা সেখানে পড়াশুনো করছে। আমাকে কেউ মিরাকিউরলের শঙ্কু বলে চিনবে না, দেখে নিও।
সন্ডার্স একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে, তবে এটা জেনো যে তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার সোয়াস্তি নেই।
সন্ডার্স একটা জীবতত্ত্ববিষয়ক পত্রিকার জন্য একটা প্ৰবন্ধ লিখছিল, বলল, যাও, তুমি আর ডরথি একটু ঘুরে এসো।
কোনও বিশেষ জায়গায় যাবার ছিল না। তাই ডরথি আর আমি হ্যাম্পাস্টেডেই এদিক ওদিক একটু ঘুরে দেখলাম। একটা রেস্টোরান্টে বসে কফি খেতে খেতে ডরথি বলল, আমার জার্মানি আর জার্মান জাতটার উপর এমন ঘূণা ধরে গেছে যে কেউ ওখানে যাচ্ছে শুনলেই আমি বাধা না দিয়ে পারি না। অবিশ্যি তোমার ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছি। হাইনরিখ স্টাইনারের প্রতি তোমার শ্রদ্ধার ভাব থাকাটা স্বাভাবিক।
আমি বললাম, ভারতবর্ষের শিল্প সাহিত্য সম্পর্কে অনেক জামানই শ্রদ্ধাশীল। আর সেটা আজ থেকে নয়। দুশো বছর থেকে। আমাদের বিখ্যাত প্রাচীন সংস্কৃত নাটক শকুন্তলা জামানে অনুবাদ হয়েছে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায়।
তখন মধ্যাহ্নের সূর্য জার্মানির মাথার উপরে, শঙ্কু। এখন সে দেশে অন্ধকার, লোকেরা সব অন্ধ, তাই তো হিটলারের স্বরূপ তারা দেখতে পায় না।
ডিনারের পর বৈঠকখানায় বসে কফি পান ও গল্পগুজব করে আমার ঘরে চলে গেলাম জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে। সুটকেসটা সবে বিছানার উপর তুলেছি, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। খুলে দেখি সন্ডার্স।
