নো টেন্তু, বোয়ানা। নো টেন্ধু, নো কিবোকো।
অর্থাৎ হাতিও না, হিপোও না।
তবে কী বলতে চাও তুমি? বিরক্ত ভাবে জিজ্ঞেস করল ম্যাহোনি।
মোকেলে-মবেম্বে, বোয়ানা! বায়া সানা, বায়া সানা।
বায়া সানা-অৰ্থাৎ ভেরি ব্যাড।
ম্যাহোনি তো রেগে টং।–আবোল তাবোল বকবে তো ঘাড় ধরে বের করে দেব তোমাকে।
কিন্তু আমি তো জানি! আমি তো শুনেছি তার গর্জন।
এ সব কী বলছি কাহিন্দি? কী বলতে চাও খুলে বলো তো? কী শুনেছ। তুমি?
আমি তো বোয়ানা সান্তিনির দলেও কুলির সদর ছিলাম।
এ খবরটা অ্যাদ্দিন চেপে রেখেছে। কাহিন্দি। সে নিরুদিষ্ট ইটালিয়ান দলটার সঙ্গেও ছিল।
কাহিন্দি এবার খুলে বলল ব্যাপারটা। মুকেফুর পাদদেশে একটা খোলা জায়গায় রাত্তিরে ক্যাম্প ফেলে সান্তিনির দল। আমরা যেখানে আছি, তার আরও কিছুটা উত্তরে। মাঝরাত্তিরে একটা গর্জন শুনে কাহিন্দির ঘুম ভেঙে যায়। সে তাঁবু ছেড়ে বাইরে এসেই কিছু দূরে মাটি থেকে প্রায় আট-দশ হাত উপরে অন্ধকারে এক জোড়া জ্বলন্ত চোখ দেখতে পায়। তারপর কাহিন্দি আর সেখানে থাকেনি। মাইলখানেক দৌড়ে তারপর হেঁটে ফিরে আসে সভ্য জগতে। তার অভিজ্ঞতার কথা সে অনেককে বলেছে, কিন্তু সাহেবরা কেউ বিশ্বাস করেনি। কাহিন্দির নিজের ধারণা, ইটালিয়ান দলের সকলেই এই দানবের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে।
তা হলে তুমি আমাদের সঙ্গে এলে কেন? প্রশ্ন করল ম্যাহোনি। নাকি আমাদের দল থেকে পালাবার মতলব করছিলে?
কাহিন্দি মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, এসেছি রুটির জন্য, বোয়ানা। আবার সে দানবকে দেখলে আবার পালাতাম—তবে এখন বোয়ানা শঙ্কুর অস্ত্র দেখে ভরসা পেয়েছি। আর পালাব না।
তা হলে তোমার কুলিদেরও সে কথা বলে দেবে। যারা একবার এসেছে, তারা আর দল ছেড়ে যেতে পারবে না, এই তোমায় বলে দিলাম।
চাঞ্চল্যকর ঘটনার শেষ এখানেই নয়। শ্বেতাঙ্গের লাশ আবিষ্কার আর কাহিন্দির স্বীকারোক্তির পর আবার রওনা দিয়ে দশ মিনিটের মধ্যে এক পিগমির দলের সামনে আমাদের পড়তে হল।
চার ফুট থেকে সাড়ে চার ফুট লম্বা এই পিগমিরা যে এত নিঃশব্দে চলাফেরা করে, সেটা আমার ধারণা ছিল না। দলটার সামনে পড়ার আগের মুহুর্ত পর্যন্ত তাদের অস্তিত্ব টের পাইনি। আর সামনে পড়া মাত্র তারা আমাদের ঘিরে ফেলল। ম্যাহোনি গলা তুলে বলল, ভয় নেই, এরা নিরীহ। তবে এদের কৌতূহলের শেষ নেই।
প্রত্যেকের হাতে তিরধনুক, আর তুণের সঙ্গে বাঁধা একটি করে চামড়ার থলি। তিরের ডগায় যে খয়েরি রং-সেটা যে বিষ, তা আমি জানি। বইয়ে পড়েছি, এরা কেবল ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য শিকার করে, এদের মধ্যে হিংস্রভাব এতটুকু নেই। এদের দেখেও সেটাই মনে হয়।
ম্যাহোনি এগিয়ে গিয়ে এদের সঙ্গে বান্টু ভাষায় কথা বলতে আরম্ভ করেছে। কয়েকজন এগিয়ে এসেছে রকেটের দিকে। আফ্রিকায় দুর্ধর্ষ শিকারি, বুনো কুকুরের অভাব নেই, কিন্তু এ জাতের কুকুর এরা কেউ কখনও দেখেনি।
ম্যাহোনির কথা তখনও চলেছে, এমন সময় দেখলাম। পিগমিরা তাদের থলি থেকে নানারকম জিনিসপত্র বার করতে শুরু করেছে।
আশ্চর্য! এ যে সবই আমাদের সভ্য জগতের জিনিস! বাইনোকুলার, কম্পাস, ক্যামেরা, ঘড়ি, ফাউনটেন পেন, জুতো, ফ্লাস্ক—এ সব এরা পেল কোথায়?
কথা শেষ করে ম্যাহোনি আমাদের দিকে ফিরে বলল, বেশ কিছু শ্বেতাঙ্গের মৃতদেহ এরা গত কয়েক মাসের মধ্যে এ অঞ্চলে দেখেছে। এ সব জিনিস কোত্থেকে পাওয়া, বুঝতেই পারছ।
তিনটি দলই যে প্ৰাণে মারা পড়েছে, সে বিষয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই।
ইতিমধ্যে আরেকটি পিগমি তার থলি থেকে আর একটি জিনিস বার করেছে, যেটা দেখে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল।
একটা বই-এবং সেটা আমার খুবই চেনা।
আমি এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়াতে বিনা বাক্যব্যয়ে পিগমিটি সেটা আমার হাতে তুলে দিল।
আমি ম্যাহোনিকে বললাম, জিজ্ঞেস করো তো এ বইটা আমি নিতে পারি কি না?
পিগমি এক কথায় রাজি হয়ে গেল। আমি আমার পকেটে ভরে নিলাম ইংরেজি গীতাঞ্জলির প্রথম সংস্করণ। ঘটনাটা এতই বিস্ময়কর যে, কিছুক্ষণ আমার মুখ দিয়ে কথা বেরোল না। ম্যাকফারসনও যে মৃত, সেটার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?
অতিকায় জানোয়ার সম্বন্ধে এরা কোনও খবর দিতে পারে কি?
ম্যাহোনি বলল, না। সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছি আমি। তবে এরা বলছে, আকাশে একটা অদ্ভুত জিনিস উড়তে দেখেছে।
পাখি? সন্ডার্স প্রশ্ন করল।
না, পাখি না। কোনও যান্ত্রিক যানও নয়, কারণ ওড়ার কোনও শব্দ ছিল না।
পিগমিরা চলে গেল। আমরা গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে আবার এগোতে শুরু করলাম।
সন্ধ্যা সাতটায় আমরা ক্যাম্প ফেললাম। কাছেই একটা খরস্রোতা নদীর শব্দ পাচ্ছি; কাল সেটা পেরোতে হবে আমাদের।
রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। কী আছে আমাদের কপালে, কে জানে।
বাইরে বিদ্যুতের চমক আর মেঘের গর্জন। সেই সঙ্গে হাওয়াও দিচ্ছে। এই বোধ হয় বৃষ্টি শুরু হল।
১০ই মে, রাত পৌনে বারোটা
সাংঘাতিক ঘটনা। আমার হাতে কলম স্থির থাকছে না এখনও।
গতবার ডায়রি লিখে মশারি তুলে বিছানায় উঠব, এমন সময় বাইরে থেকে চিৎকার।
ডেভিড আর রকেট ঘুমোচ্ছিল, দুজনেই এক মুহুর্তে সজাগ। তিনজনে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে এলাম। তাঁবুর বাইরে। ক্রোল, সন্ডার্স, ম্যাহোনি, সকলেই তাঁবুর বাইরে হাজির। আমাদের দৃষ্টি কুলিদের তাঁবুর দিকে, কারণ সেদিক থেকেই চিৎকারটা এসেছে। বাইরে দুর্ভেদ্য অন্ধকার। অন্যদিন তাঁবুর বাইরে আগুন জ্বলে, আজ বৃষ্টিতে সে আগুন নিবে গেছে।
