টেলিকার্ডিওস্কোপ যন্ত্র অবিশ্যি আপাতত বন্ধই আছে। সুমা এখন একাগ্রমনে চালিয়ে এগিয়ে চলেছে সেটা বোঝা যাচ্ছে ওই ফলের রাসায়নিক বিশ্লেষণ। তার কাজ যে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে চলেছে সেটা বোঝা যাচ্ছে মাঝে মাঝে তার হুংকার থেকে। আর আর সন্ডার্স উদগ্রীব হয়ে দেখছি সুমার গবেষণা। যে প্রক্রিয়াটা চোখের সামনে ঘটছে সেটা আমাদের অজানা নয়। এই ফলে যে ক্রমে ক্রমে সমস্তরকম ভিটামিনের অস্তিত্ব প্রকাশ পাচ্ছে, সেটা দেখতেই পাচ্ছি। মানরোর যুগে ভিটামিন কথাটাই তৈরি হয়নি। বিজ্ঞান তখন শিশু, আর খাদ্যদ্রব্যের চর্চা শুরু হতে তখনও আড়াইশো বছর দেরি।
সাড়ে তিনটের সময় চেয়ার ছেড়ে উঠে সুমা কেবল দুটি কথাই বলল। প্রথমে বলল অ্যামেজিং, আর তারপরে তার পকেটের রুমালটাকে সিকি ইঞ্চি ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল অ্যান্ড মিসটিরিয়াস।
ইতিমধ্যে ক্যালেনবাখ যে কখন তার বিছানা ছেড়ে উঠে আমাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সেটা বুঝতেই পারিনি। তার দিকে চোখ পড়তে সে হাত বাড়িয়ে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে আমার হাতটা ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, গ্রেট! তোমার ওষুধের কোনও তুলনা নেই। আমি সম্পূর্ণ সুস্থ!
সে কী? এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই?
দেখতেই তো পাচ্ছ, হেসে বলল বিল ক্যালেনবাখ।
আমার ওষুধ যে এমন অসম্ভব দ্রুত গতিতে অসুখ সারাতে পারে সেটা আমি নিজেও জানতাম না।
আর এই নাও— এটা আমার টেবিলের উপর ছিল।
সে কী! এ যে আমারই ওষুধের বড়ি!
রহস্য সমাধান হতে সময় লাগল না। জ্বরের ঘোরে। আমার বড়ি না খেয়ে ক্যালেনবাখ খেয়েছে টেবিলে রাখা সেই নীল ফলটি। আর তাতেই এই আশ্চর্য আরোগ্য লাভ। আর ফলের গুণ যে শুধু আরোগ্যেই প্রকাশ পাচ্ছে তা নয়; ক্যালেনবাখের চাহনিতে এই দীপ্তি এর আগে কখনও দেখিনি। সন্ডার্স সুমাকে বলল, তোমার গবেষণার আর কোনও প্রয়োজন নেই; এখন এই ফল যত পারা যায় সঙ্গে নিয়ে চলো দেশে ফিরে যাই। এর চাষ করে আমরা সব ডাক্তারি কোম্পানিকে ফেল করিয়ে দেব!
কথাটা সন্ডার্স রসিকতা করে বললেও সুমা জবাব দিল অত্যন্ত গভীরভাবে। সে বলল যে তাকে এখনও গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। অন্তত আরও একটা দিন। ভিটামিনের বাইরেও আরও অনেক কিছু রয়েছে এই ফলের মধ্যে, যেগুলোর নাগাল ও এখনও পায়নি।
ক্যালেনবাখের পীড়াপীড়িতেই সুমাকে তার কাজ বন্ধ করে টেলিকর্ডিওস্কোপটা চালু করতে হল। দেখা গেল প্রাণীটা ঠিক যেখানে ছিল সেখানেই আছে। বাট হিজ হার্টবিট ইজ স্লোয়ার, বলল সুমা।
সে তো শব্দ শুনেই বুঝতে পারছি। কাল ছিল পঞ্চাশ, আর আজ চল্লিশের নীচে।
সর্বনাশ! বলে উঠল ক্যালেনবাখ। এ কি মরে যাবে নাকি? এমন একটা প্ৰাণী এই দ্বীপে থাকতে তোমরা ওই ফলের পিছনে সময় নষ্ট করছ?
ফল তো পেয়েই গেছি, বিল, বলল সন্ডার্স। আমরা কালই দ্বীপের মাঝের অংশটার দিকে যাব। তুমি অসহিষ্ণু হয়ে না।
ক্যালেনবাখ তাও গজগজ করতে করতে তার ক্যাম্পের দিকে চলে গেল।
১৪ই মার্চ
আজ আর আমাদের বেরোনো হল না। সারাদিন ঝড় বৃষ্টি বাজপাত। ক্যালেনবাখ অগত্যা তার ক্যামেরা দিয়ে আমাদেরই ছবি তুলল, আর টেপ রেকডারের সাহায্যে আমাদের সকলের ইন্টারভিউ নিল।
দুপুরে লাঞ্চের পর ডেভিড আমাদের সকলকে জলদস্যুদের গল্প শোনাল। সত্যি, ছেলেটার আশ্চর্য স্টক আছে এই সব গল্পের।
একটা দুঃসংবাদ এই যে, সুমা বলল, ফলে ভিটামিন ছাড়া আর যাই থাক না কেন, সেটা এই খুদে ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণ করে বার করা সম্ভব না। সে কাজটা দেশে ফিরে গিয়ে বড় ল্যাবরেটরিতে করতে হবে। অবিশ্যি আমাদের এখানে আসার পিছনে যে প্রধান উদ্দেশ্য সে তো সফলই হয়েছে। কাজেই দেশে ফিরে যেতেও আর বেশি দিন বাকি নেই। আপাতত সুমা আমাদের এই ফল খেতে বিশেষ করে বারণ করে দিয়েছে। একটা ফলেই যদি ক্যালেনবাখের কঠিন ব্যারাম এক ঘণ্টার মধ্যে সারতে পারে তা হলে এই ফলের তেজ যে কী রকম সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। সুমার মতে এই ফল খেলে উপকারের সঙ্গে অনিষ্টও হওয়া কিছুই আশ্চর্য না। বিস্ময়কর রকম ক্ষুধাবৃদ্ধিটা অপকার কি না জানি না, কিন্তু ক্যালেনবাখ আজ লাঞ্চে একই তিন টিন হ্যাম খেয়ে ফেলেছে।
১৫ই মার্চ, সকাল সাতটা
দুঃসংবাদ।
ক্যালেনবাখ একা বেরিয়ে পড়েছে কাউকে কিছু না বলে।
ডেভিড মানরোই খবরটা দিল আমাদের। সে আর ক্যালেনবাখ একই তাঁবুতে রয়েছে, অন্য দুটোর একটাতে আমি আর সন্ডার্স, আরেকটাতে তার যন্ত্রপাতি সমেত সুমা। ডেভিড সাড়ে ছটায় ঘুম ভেঙে দেখে ক্যালেনবাখের বিছানা খালি, এবং টেবিলের উপর তার ক্যামেরার যে সরঞ্জাম ছিল সেগুলোও নেই। তৎক্ষণাৎ তাঁবুর বাইরে এসে ডেভিড বারকয়েক ক্যালেনবাখের নাম ধরে ডাক দেয়। কিন্তু কোনও সাড়া পায় না। অবশেষে তার কুকুর রকেটের সাহায্য নেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্যালেনবাখের বালিশের পাশে পড়ে থাকা রুমালটা নিয়ে রকেটকে শোকায়। যখন দেখে যে রকেট সেই দূরের টিলাগুলোর দিকে ধাওয়া করেছে, তখন আবার তাকে ডেকে ফিরিয়ে আনে।
সুমা সারারাত কাজ করে সকালের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল; তাকে তুলে খবরটা দেওয়া হয়। সে তৎক্ষণাৎ তার টেলিকর্ডিওস্কোপ চালু করে হলদে বাতির স্পন্দন দেখিয়ে প্রমাণ করে দিল যে, ক্যালেনবাখ ক্যাম্প থেকে তিন কিলোমিটার দূরে রয়েছে এবং ওই টিলাগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
আমরা আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই রওনা দেব। আজ দিন ভাল। আজ চার জনেই যাব। সন্ডার্সের আক্ষেপের শেষ নেই; বারবার বলছে, কী কুক্ষণেই না বেপরোয়া লোকটাকে সঙ্গে এনেছিলাম।
