আমি বাধা দিয়ে বললাম, এতে যে ধূমকেতুর উল্লেখ আছে তার থেকেই তো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আমি একবার হিসাব করে দেখেছিলাম, ছিয়াত্তর বছর পর পর যদি হ্যালির ধূমকেতু আসে, তা হলে আজ থেকে ঠিক পাঁচহাজার বছর আগে একবার সেই ধূমকেতুর আবির্ভাব ঘটেছিল-অর্থাৎ ৩০২২ বিসি-তে।
ক্রোল প্ৰচণ্ড উৎসাহের সঙ্গে সায় দিয়ে বলল, আমারও হিসেব তোমার সঙ্গে মিলছে। প্যাপাইরাসে বলছে দৈবজ্ঞের যখন অন্য গ্রহের মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তখন আকাশে ধূমকেতু ছিল। সেটা ৩০২২ হওয়া এই জন্যই সম্ভব কারণ তখন ঈজিপ্টে মেনিসের রাজত্বকাল, আর সেটাকেই বলা হয় ঈজিপ্টের স্বর্ণযুগের শুরু। সব মিলে যাচ্ছে, শঙ্কু!
ডেক্সটার বলল, কিন্তু এর উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা চলে কি? এক-আধা বছরও কি এদিক ওদিক হতে পারে না?
ফ্ৰান্ডিং তার চুরুটে একটা লম্বা টান দিয়ে বলল, আমার ধারণা, এতে কোনও ভুল নেই, কারণ আমি এখানে আসার আগের দিনই এপসাইলন ইন্ডি থেকে সংকেত পেয়েছি। তাতে বলা হয়েছে যে আগামী অমাবস্যায় তাদের দূত পৃথিবীতে এসে পৌঁছাচ্ছে, এবং তারা যেখানে নামবে সে জায়গাটা হল এখান থেকে আন্দাজ দুশো কিলোমিটার পশ্চিমে।
তার মানে মরুভূমিতে? ডেক্সটার প্রশ্ন করল।
সেটাই স্বাভাবিক নয় কি?
কিন্তু কী ভাষায় পেলে এই সংকেত? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
টেলিগ্রাফের ভাষা, বলল ফল্ডিং, মর্স।
তার মানে পৃথিবীর সঙ্গে তারা যোগ রেখে চলেছে এই গত পাঁচ হাজার বছর?
সেটা আর আশ্চৰ্য কী, শঙ্কু। ভুলে যেও না তাদের সভ্যতা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর।
তা হলে তো তারা ইংরেজিও জানতে পারে।
কিছুই আশ্চর্য নয়। তবে আমি ইংরেজ কি না সেটা হয়তো তাদের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না, তাই তারা মর্স কোড ব্যবহার করেছে।
তা হলে আমাদের গন্তব্যস্থল হল কোথায়? আমি প্রশ্ন করলাম।–তারা তো আর এই হোটেলে এসে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে না।
ফীল্ডিং হেসে বলল, না, সেটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আমরা যাব বাওয়িতি—এখান থেকে দুশো ত্ৰিশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। রাস্তা আছে, তবে তাকে হাইওয়ে বলা চলে না। অবিশ্যি তাতে কোনও অসুবিধা হবে না। ক্রোলের গাড়িটা তো তুমি দেখেছ।
তা দেখেছি। এয়ারপোর্ট থেকে ক্রোলের গাড়িতেই এসেছি। বিচিত্র গাড়ি-যেন একটি ছোটখাটো চলন্ত হোটেল। সেইসঙ্গে মজবুতও বটে। অটোমোটেল নামটা ক্রোলেরই দেওয়া।
ডা. থার্নিক্রফটও আসছেন কাল সকালে, বলল ফ্ৰান্ডিং, তিনিও হবেন আমাদের দলের একজন।
এ খবরটা জানা ছিল না। তবে থার্নিক্রফটের আগ্রহের কারণটা স্পষ্ট। হাজার হোক তিনিই তো প্যাপাইরাসের পাঠোদ্ধার করেছেন।
তোমার অ্যানাইহিলিনটা সঙ্গে এনেছ তো? ক্রোল জিজ্ঞেস করল।
আমি জানিয়ে দিলাম যে এই ধরনের অভিযানে সেটা সব সময়ই সঙ্গে থাকে। আমার তৈরি এই আশ্চৰ্য পিস্তলের কথা এরা সকলেই জানে। যত বড় এবং যত শক্তিশালী প্রাণীই হোক না কেন, তার দিকে তাগ করে এই পিস্তলের ঘোড়া টিপলেই সে প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সবসুদ্ধ বার দশেক চরম সংকটের সামনে পড়ে আমাকে এই অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে। প্যাপাইরাসের বিবরণ থেকে এই ভিনগ্রহের প্রাণীকে হিংস্র বলে মনে হয় না, কিন্তু এবার যারা আসবে তাদের অভিপ্ৰায় যখন জানা নেই, তখন আত্মরক্ষার জন্য প্ৰস্তুত হয়ে থাকলে ক্ষতি কী?
আমরা চার জনে পরস্পরের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে রইলাম যেন আমাদের এই আসন্ন অভিযানের কথা ঘুণাক্ষরেও কেউ না জানে।
আমরা উঠে যে যার ঘরে যাবার তোড়জোড় করছি, এমন সময় দেখি হোটেলের ম্যানেজার মি. নাহুম আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। এখানে বলে রাখি। যে এই কাণকি হোটেল থেকেই মৰ্গেনস্টার্ন উধাও হয়েছেন, এবং এই মি. নাহুমকেই মৰ্গেনস্টার্নের হাতে লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়েছিল।
নাহুম জানালেন যে মৰ্গেনস্টার্নের আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। কাজেই ধরে নিতে হয় মৰ্গেনস্টার্ন শহর থেকে বেরিয়ে গিয়ে নাইলের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন।
আর কোনও শকুনাটকুনি এসে কোনও ঘরের জানলায় বসছে না তো? ব্যঙ্গের সুরে প্রশ্ন করল ক্রোল।
জিভ কাটার অভ্যাস ঈজিপসীয়দের থাকলে অবশ্যই মি. নাহুিম জিহ্বা দংশন করতেন। তার বদলে তিনি আমাদের কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বললেন, আপনাদের বলতে দ্বিধা নেই—আমাদের হোটেলের ত্ৰিসীমানার মধ্যে কেউ কোনওদিন শকুনি দেখেছে বলে শুনিনি। তবে বেড়াল কুকুর যে এক আধটা দেখা যাবে না তার ভরসা দিতে পারছিনা, হে হে।
আমরা ঠিক করেছি। কাল লাঞ্চের পরেই রওনা দেব। কী আছে কপালে জানি না, তবে আমি মনে করি ঈজিপ্টে আসার মধ্যেই একটা সার্থকতা আছে। এখানে এসে দু মিনিট চুপ করে থাকলেই চারপাশের আধুনিক শহরের সব চিহ্ন মুছে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেই প্রাচীন যুগের মিশর। ইমহোটেপ, আখেনাতন, খুফু, তুতানখামেনের দেশে এসে নামবে ছায়াপথের কোন এক অজ্ঞাত সৌরজগতের প্রাণী? ভাবতেও অবাক লাগে।
৫ই নভেম্বর
আজ মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটো ঘটনা আমাদের সকলকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এখনও তার জের সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
একটু ঘুরে আসব। গিরিডিতে রোজ ভোরে উশ্রীর ধারে বেড়ানোর অভ্যাসটা আমার বহুকালের।
