পরদিন হনুমান মিশ্রর একটা ছাগল জ্যান্ত করার সময় আমার যন্ত্রে সাধুবাবার মন্ত্রটি রেকর্ড হয়ে গেল।
যন্ত্রটি হাতে নিয়ে সন্ধের দিকে যখন চোরের মতো বাড়ি ফিরলাম তখন টিপটপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। প্ৰহাদকে গরম কফি বানানোর আদেশ দিয়ে আমি আমার ল্যাবরেটরিতে ঢুকলাম। দু-এক ঝলক বিদ্যুতের চমক ও কিছু মেঘগর্জনের পর বৃষ্টির বেগ বেড়ে উঠল। আমি জানালাগুলো বন্ধ করে দিয়ে রেকডারটা টেবিলের উপর রেখে তারটা দেওয়ালের প্লাগে। লাগিয়ে দিলাম। আমার মতলব ছিল, প্ৰথমে সাধারণ স্পিন্ডে মন্ত্রটা বার কয়েক শুনে তারপর অর্ধেক স্পিডে সেটাকে চালাব। তা হলেই মন্ত্রটা পরিষ্কারভাবে ধরা পড়বে। বিজ্ঞানের কাছে এইখানেই ত্রিকালজ্ঞ সাধুবাবাকে পরাজয় স্বীকার করতে হবে।
সদ্য আনা গরম কফিতে একটা চুমুক দিয়ে রেকডারের সুইচটা টিপে দিতেই বাদামি রঙের ম্যাগনেটিক টেপ ঘুরতে আরম্ভ করল। বলো হরি হরিবোলাঁ। মনে পড়ল সাধুবাবার মস্ত্ৰোচ্চারণের কিছু আগেই একটি মড়া এসে পৌঁছেছিল শ্মশানঘাটে। এ তারই শব্দ।
তারপর এল শেয়ালের ডাক। তারপর এই সেই তক্ষকের ডাক। এইবার শুনব সেই মন্ত্র।
এই তো সেই তীক্ষ্ণ স্বর, সেই বিদ্যুদ্বেগে বিড়াবিড়োনি-ঠিক কনে যেমনটি শুনেছি–অবিকল সেই রকম।
কিন্তু এ কী? যন্ত্র হঠাৎ থেমে গেল কেন!
আর এই বিকট অট্টহাসি কার? এ তো আমার রেকর্ড করা কোনও হাসির শব্দ নয়। এ যে আমার ঘরের পাশেই..
আমার চোখ চলে গেল পুবের জানালার দিকে। জানালার বাইরে আমার বাগান এবং বাগানে গোলঞ্চগাছ।
বিদ্যুতের এক ঝলক আলোয় দেখলাম। সেই গোলঞ্চগাছের ডাল থেকে ঝুলে আছে শ্মশানের সেই সাধুবাবা—তাঁর হিংস্র দৃষ্টি আমার রেকডার যন্ত্রের উপর নিবদ্ধ।
ব্যাপারটা আমার কাছে এতই অস্বাভাবিক মনে হল যে আমি ভয় না পেয়ে সোজা জানালার কাছে গিয়ে সেটাকে এক ঠেলায় খুলে দিলাম।
কিন্তু কোথায় সে সাধুবাবা? গাছ রয়েছে, গাছের পাতা বৃষ্টির জলে চিক চিক করছে কিন্তু সাধুবাবা উধাও, অদৃশ্য।
ভুল দেখলাম নাকি?
কিন্তু চোখ, কান দুইই একসঙ্গে এমন ভুল করতে পারে। হাসিও যে শুনলাম সাধুবাবার-গলার স্বর তো চেনা হয়ে গেছে এই তিন দিনে।
যাকগো-ভেলকিই হোক আর সত্যিই হোক, চালেই যখন গেছে তখন আর ভেবে লাভ কী? তার চেয়ে বরং যন্ত্রটা চালানোর চেষ্টা করা যাক।
আশ্চর্য-এবার সুইচ টিপতেই দেখি যন্ত্র চলছে। কিন্তু শ্মশানের সেই শব্দ কোথায় গেল?
মন্ত্রের বদলে এই বিকট হাসি রেকর্ড হয়ে গেল কী করে?
বাধ্য হয়েই মনে মনে স্বীকার করতে হল যে কোনও অলৌকিক শক্তির বলে সাধুবাবাজি আমার গোপন অভিসন্ধির কথা টের পেয়ে প্রচেষ্টা ভণ্ডুল করে দিয়েছেন।
সঞ্জীবনীমন্ত্রটি আয়ত্ত করার আর কোনও উপায় নেই।
পরদিন অবিনাশবাবু এসে বললেন, শিমুলগাছে টু-লেট টাঙানো রয়েছে দেখে এলুম। সাধুবাবা পগার পর।
যেমন আকস্মিকভাবে এসেছিলেন, তেমনই আকস্মিকভাবে চলে গেছেন। সাধুবাবা। রেখে গেছেন শুধু তাঁর বিকট হাসি আর পুনজীবনপ্রাপ্ত কিছু পাখি আর জানোয়ার।
আরেকটি জিনিসকে সাধুবাবার দান বলেই বলব—সেটা হল হাড় সম্পর্কে আমার অনুসন্ধিৎসা। হাড়ের নেশা এর পর থেকেই আমাকে পেয়ে বসে। আমার বাড়ির যে ঘরটা খালি পড়ে ছিল। কয়েকমাসের মধ্যেই নানান পশুপক্ষীর কঙ্কাল দিয়ে সেটা ভরাট হয়ে যায়। হাড় সম্বন্ধে যা কিছু পড়ার তা পড়ে ফেলি। ত যত প্ৰাণী আছে তার সবের মধ্যেই যে একটা অস্থিগত সাদৃশ্য আছে তা জেনে একটা অদ্ভুত মনোভাব হয় আমার। যাবতীয় প্রাণীর কঙ্কালের প্রতি একটা বিচিত্র আকর্ষণ আমি অনুভব করতে থাকি। এক রকম চশমাও আমি আবিষ্কার করি যার মধ্য দিয়ে দেখলে জীবন্ত প্রাণীর রক্তমাংস না দেখে কেবল তার কঙ্কালটাই দেখতে পাওয়া যায়।
এই হাড় থেকেই জাগে প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ার সম্পর্কে কৌতুহল। অবিশ্যি এই দুই-এর মাঝখানে রয়েছেন শ্ৰীযুক্ত শ্রীরঙ্গম দেশিকাচার শেষাদ্রি আয়াঙ্গার বা সংক্ষেপে মিস্টার আয়াঙ্গার। ব্যাঙ্গালোরবাসী অমায়িক যুবক-ব্ৰাহ্মণ। আমার সঙ্গে আলাপ উশ্রীর ধারে। বেশ লাগল। ভদ্রলোকটিকে। গণিতজ্ঞ পণ্ডিত লোক-তাই কথা বলে বেশ আরাম পাওয়া যায়।
তাঁর বাড়িতেই একদিন বিকেলে চা খেতে গিয়ে বৈঠকখানায় দেখলাম এক অতিকায় গোড়ালি অর্থাৎ কোনও অতিকায় জানোয়ারের গোড়ালির হাড়।
হাড়টা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছি দেখে ভদ্রলোক বললেন, নীলগিরিতে এক বন্ধুর চা-বাগানে ছুটিতে গিয়েছিলাম। কাছাকাছি পাহাড়ে রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন ওই হাড়টা পাই। হাতি না গণ্ডার? বলুন তো কীসের হাড়?
মুখে বললুম, ঠিক বুঝতে পারছি না। মনে মনে বললুম তুমি গণিতজ্ঞ হতে পারো কিন্তু অস্থিবিদ নাও! এ হাড় হাতিরও নয়, গণ্ডারেরও নয়! এ হাড় যে জানোয়ারের, সে জানোয়ারের অস্তিত্ব অন্তত কোটি বছর আগে পৃথিবী থেকে মুছে গেছে।
আমি নিজে বুঝেছিলাম-হাড়টা ব্ৰন্টোসরাসের এবং তখনই মনে মনে স্থির করেছিলুম-নীলগিরিতে একটা পাড়ি দিতেই হবে।
সেইদিন থেকে তোড়জোড় শুরু করে আজ তিন সপ্তাহ হল। আমরা এখানে এসে পৌছেছি। আশ্চর্য সৌভাগ্যক্রমে, আমরা আসার চার দিন পরেই প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ারের হাড়ের সন্ধান পেয়েছি। এই গুহার মধ্যে। টুকরো ইতস্তত ছড়ানো হাড় এক জায়গায় স্তুপ করে রাখতে বিস্তর বেগ পেতে হয়েছে। সত্যি বলতে কী, স্থানীয় টোডাদের সাহায্য ও সহানুভূতি না থেলে এ কাজে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হত না।
