আমি বললাম, জানি।
এ নিয়ে কিছু কাজ আমিও করেছি তা জান বোধ হয়।
জানি।
আমি তোমার কিছু লেখাও পড়েছি।
আমি শেষ লেখা লিখেছি। দশ বছর আগে। আমার আসল গবেষণা শুরু হয়েছে সেই লেখার পর। এই গবেষণার বিষয় একটি তথ্যও আমি কোথাও প্ৰকাশ করিনি।
আমি চুপ করে রইলাম। বোর্গেল্টও চুপ করে একদৃষ্টি তাঁর কোটরাগত নীল চোখ দিয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। কোথায় যেন একটা দুম দুম করে শব্দ হচ্ছে। বাড়িরই মধ্যে, কিন্তু কাছাকাছি নয়। পামার এত দেরি করছেন কেন? উনি কার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছেন?
বোর্গেল্ট বললেন, পমারের ফোনটা বোধ হয় জরুরি।
শুনি চমকে উঠলাম। আমি তো কিছু বলিনি ওঁকে। উনি আমার মনের কথা বুঝলেন করে?
এবার বোর্গেল্ট একটা প্রশ্ন করে বসলেন যেটা আমার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।
তোমার রোবোটা আমাকে বিক্রি করবে?
আমি অবাক হয়ে বললাম, সে কী কথা! কেন বলো তো?
বোর্গেল্ট গভীর গলায় বললেন, আমার ওটা দরকার। কারণ শুধু একটাই। আমার রোবো অঙ্ক কষতে জানে না, অথচ ওটার আমার বিশেষ প্রয়োজন।
তোমার রোবো কি এখানে আছে?
বোর্গেল্ট মাথা নেড়ে হ্যা বললেন।
থেকে থেকে গুম গুম গুম গুম শব্দ, আর পমারের ফিরতে দেরি—এই দুটো ব্যাপারেই কেমন যেন অসোয়াস্তি লাগছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বোর্গেল্টের রোবো। এই বাড়িতেই আছে জেনে, আর তাকে হয়তো দেখতে পাব। এই মনে করে, একটা উত্তেজনার শিহরন অনুভব করলাম।
বোর্গেল্ট বললেন, আমার রোবোর মতো রোবো। আজ পর্যন্ত কেউ তৈরি করতে পারেনি। আমি-গটফ্রীড বোর্গেল্ট-যা সৃষ্টি করেছি। তার কোনও তুলনা নেই। কিন্তু আমার রোবোর একটি গুণের অভাব। সে তোমারটার মতো অত সহজে অঙ্ক কষতে পারে না। অথচ তার এই অভাব পূরণ করা দরকার। তোমার রোবোটা পেলে সে কাজটা সম্ভব হবে।
আমার ভারী বিরক্ত লাগল। এমন জিনিস কি কেউ কখনও পয়সার জন্য হাতছাড়া করে? আমার এত সাধের নিজের হাতের তৈরি প্রথম রোবো—এটা আমি হাইডেলবার্গের আধপাগলা বৈজ্ঞানিককে বিক্রি করে দেব? কীসের জন্য? আমার এমন কী টাকার দরকার পড়েছে। আর ওই অঙ্কের ব্যাপারটাতেই তো আমার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। বোর্গেল্ট যেমন রোবোই তৈরি করে থাকুন না কেন, উনি নিজে যাই বলুন, আমি জানি আমার চেয়ে আশ্চর্য কোনও যান্ত্রিক মানুষ তিনি কখনওই তৈরি করেননি।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, মাপ করো, বোর্গেল্ট। ও জিনিসটা আমি বেচিতে পারব না। সত্যি বলতে কী, তুমি যখন এত বড় বৈজ্ঞানিক—তখন আরেকটু পরিশ্রম করলে আমি যে জিনিসটা করেছি সেটা তুমি করতে পারবে না কেন?
তার কারণ— বোর্গেল্ট সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন—সবাই সব জিনিস পারে না। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। চেষ্টা করলে যে পারি তা আমিও জানি, কারণ আমার অসাধ্য কিছু নেই। কিন্তু সময় কম। আমার টাকা পয়সাও যা ছিল সবই গেছে। আমার বাড়ি দেনার দায়ে বাঁধা পড়ে আছে। সব কিছু গেছে আমার ওই একটি রোবো তৈরি করতে। কোটি কোটি মার্ক খরচ করেছি। আমি ওটার পিছনে। কিন্তু ওই একটা গুণের অভাবে ওটা নিখুঁত হয়নি। ওটা আমার চাই। ওটা পেলে আমি আমার রোবো থেকেই আমার সমস্ত টাকা আবার ফিরে পাব। লোকে বলবে, হ্যাঁ—বোর্গেল্ট যা করেছে তার বেশি কিছু করা মানুষের সাধ্য নয়। আমার সিন্দুকে কিছু সোনার গেন্ড রাখা আছে—চারশো বছরের পুরনো। সে গোল্ড আমি তোমাকে দেব; তুমি রোবোটা বিক্রি করে দাও।
সোনার লোভ দেখাচ্ছেন আমাকে! লোভ জিনিসটা যে কতকাল আগে জয় করেছি তা তো আর বোর্গেল্ট জানেন না! এবার আমিও আমার গলার স্বর যথাসম্ভব গম্ভীর করে বললাম, তোমার কথাবাতার সুর আমার ভাল লাগছে না, বোর্গেল্ট। সোনা কেন—হিরের খনি দিলেও আমার রোবুকে বিক্রি করব না।
তা হলে আর তুমি কোনও রাস্তা রাখলে না আমার জন্য।
এই বলে বোর্গেল্ট প্রথমেই যে কাজটা করলেন সেটা হল সোজা গিয়ে সিঁড়ির দিকের দরজাটা বন্ধ করে দেওয়া। তারপর উলটো দিকে যে দরজাটা ছিল—বোধ হয় খাবার ঘরে যাবার—সেটাও তিনি বন্ধ করে দিলেন। কাচের জানলাগুলো এমনিতেই বন্ধ। খোলা রইল শুধু লাইব্রেরির দরজা। রোবু রয়েছে ওই লাইব্রেরিঘরে, আর এই প্রথম আমার মনে হল যে, আমি হয়তো আর রোবুকে দেখতে পাব না। হয়তো সে আর কয়েকদিনের মধ্যেই অন্য মালিকের হয়ে কাজ করবে, তার হয়ে কঠিন কঠিন অঙ্কের সমাধান করবে। আর পমার? আমার মনে বিন্দুমাত্ৰ সন্দেহ নেই যে, পমারের সঙ্গে বোর্গেল্ট ষড় করে আমার সর্বনাশ করতে চলেছে।
দুম দুম দুম দুম—আবার সেই শব্দ শুনতে পেলাম। মনে হয় মাটির নীচ থেকে আসছে সে শব্দটা। কীসের শব্দ? বোর্গেল্টের রোবো?
আর ভাববার সময় নেই। বোর্গেল্ট আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। আবার সেই নিষ্পলক দৃষ্টি। এমন নিষ্ঠুর চাহনি আমি আর কারও চোখে দেখিনি।
এবার যখন বোর্গেল্ট কথা বললেন তখন দেখলাম তাঁর গলায় আর সে মোলায়েম ভাবটা নেই। তার বদলে একটা আশ্চর্য ইস্পাতসুলভ কাঠিন্য।
প্ৰাণ সৃষ্টি করার চেয়ে প্ৰাণ ধ্বংস করা কত বেশি সহজ সেটা তুমি জান না। শঙ্কু? গলার স্বর বন্ধ ঘরে গম গম করে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। একটি মাত্র ইলেকট্রিক শক। কত ভোল্টের জান? তোমার রোবু জানতে পারে। …আর সে শাক দেওয়ার পন্থটিও ভারী সহজ….
আমার গায়ে সেই শক-রোধ করা কাবোঁথিনের গেঞ্জিটা পরা আছে। শকে আমার কিছু হবে না। কিন্তু গায়ের জোরে এই জামানের সঙ্গে পারব কী করে?
