তারপর কানে এল এক পরিচিত পাখির কর্কশ। কণ্ঠস্বর ও ডানার ঝটপটানি।
পূর্বদিকের পাঁচিল বেয়ে উঠে তখন লোকটা পালাবার চেষ্টা করছে। কারণ পাঁচিলের গায়ের ফাটল থেকে যে অশ্বখের চারা বেরিয়েছিল সেটা চোখের সামনে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
আর সেই সময়ে শুনলাম এক মানুষের গলার আর্তনাদ।
এ গলা আমার চেনা গলা।
এ গলা প্রোফেসর গজানন তরফদারের।
অদৃশ্য ম্যাকাও অদৃশ্য প্রোফেসরকে আক্রমণ করেছে।
পাঁচিলের গা বেয়ে রক্তের ধারা নেমে আসছে বাগানের ঘাসের দিকে।
তারপর শব্দ হল-ধুপ।
প্রোফেসর তরফদার পাঁচিল টপকিয়ে ওপাশের জমিতে পড়েছেন।
তারপর সব শেষে পলায়মান পায়ের শবদ।
আমি জানালার পাশের চেয়ারটায় ক্লান্তভাবে বসে পড়লাম।
বুকে হাত দিয়ে বুঝলাম হৃৎস্পন্দন রীতিমতো বেড়ে গেছে।
এই বারে একটা ঠিং শব্দ শুনে মাথা তুলে দেখি ম্যাকাও-এর দাঁড়টা ঈষৎ কম্পমান।
বাবাজি ফিরে এসেছেন!
বুয়েনা দিয়া! বুয়েনা দিয়া!
আমি ইংরাজিতে উত্তর দিলাম, গুড মনিং! ব্যাপার কী?
ফিরেচি! ফিরেচি!
সে তো দেখতেই পাচ্ছি, থুড়ি, শুনতে পাচ্ছি!
চোর, চোর! জোচোর, জোচ্চোর, জোচ্চোর
কে?
তর্রফদার্র্!
তাকে তুমি চিনলে কী ভাবে?
ম্যাকাও যা বলল তাতে এক আশ্চর্য কাহিনী প্রকাশ পেল।
তরফদার গিয়েছিলেন ব্ৰেজিলে বছরখানেক আগে। সেখানে এক সাকাস থেকে এই পাখিটি তিনি নিয়ে আসেন, তাও চুরি করে। সতেরোটি বিদেশি ভাষা জানা, অলৌকিক স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন এই ম্যাকাওটিকে নিয়ে সেই সােকাঁসে খেলা দেখাত এক বাজিকর বা কাজেই তার বুদ্ধি ও বাকশক্তির ব্যাপারে তরফদারের কোনও কৃতিত্ব নেই।
যদিও ম্যাকাও বাংলা শিখেছে তরফদারের কাছেই।
তরফদার পাখিটিকে আমার গোলঞ্চগাছের ডালে রেখে যান যাতে সে আমার সঙ্গে থেকে, আমার ফরমুলা সংগ্রহ করে, তারপর তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে সেই ফরমুলা বলে দেয়।
অদৃশ্য হবার ওষুধের উপাদানগুলি ম্যাকাওটির কাছ থেকে জেনে নিয়ে তারপর তাই দিয়ে দশ ঘণ্টা অদৃশ্য থাকবার মতো একটা মিক্সচার তৈরি করে সেটা পান করে তরফদার নিজেকে অদৃশ্য করে ফেলেন।
সেই সময় ম্যাকাওটি তরফদারের হাবভাব লক্ষ করে বুঝতে পারে যে এবার তিনি তাঁর পোষা পাখিটিকে হত্যা করবার ফন্দি করেছেন। কারণ তাঁর হয়তো ভয় হয়েছে যে পাখিটি ভবিষ্যতে অন্য কোনও বৈজ্ঞানিকের কাছে ফরমুলাটি ফাঁস করে দিতে পারে। অদৃশ্য তরফদারের আলমারি খুলে যখন তার ভেতর থেকে বন্দুক এবং টোটা বেরিয়ে আসে। সেই সময় ম্যাকাওটি আত্মরক্ষার আর কোনও উপায় না দেখে ঠোঁটের এক কামড়ে ওষুধের বোতলটি খুলে ফেলে ঢাক ঢক করে খানিকটা ওষুধ গিলে ফেলে অদৃশ্য হয়ে যায়।
তরফদার এদিক ওদিক গুলি চালিয়ে ঘরের দেয়াল ক্ষতবিক্ষত করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। তারপর সেই অদৃশ্য অবস্থাতেই গাড়ি চালিয়ে তরফদার হাজারিবাগ থেকে গিরিডি চলে আসেন। গাড়ির পিছনের সিটেই যে ম্যাকাওটি বসেছিল। তিনি টেরই পাননি।
গিরিডি পৌঁছে গাড়িটাকে একটু দূরে রেখে দিয়ে শেষ রাত্তির থেকে আমার বাড়ির কাছেই একটা ঝোপের আড়ালে ওত পেতে বসে থাকা এবং আমি ও প্ৰহ্লাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে ডাকাতির তোড়জোড়!
আমি জিজ্ঞেস করলাম—ডাকাতির সময়ে তুমি কোথায় ছিলে?
বাইরে, বাইরে। তোমার গাছে।
তারপর?
ও বেরোলেই ধরলাম। চোর চোর, জোচোর জোচোর।
আর আমি?
ভাল, ভাল। এখানেই থাকব।
বেশ তো, থাকো না। আর কোনও বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে দোস্তি নেই তো? আমার ফরমুলা অন্যের কাছে পৌঁছবে না তো?
ম্যাকাও আবার সেইভাবে অট্টহাস্য করল।
জিজ্ঞেস করলাম-ওষুধ কটায় খেয়েছ?
রাত দশটা।
বটে এখন তো আটটা বাজে। দশ ঘণ্টা তো হয়ে এল।
তা তো বটেই! হ্যাঃ, হ্যাঃ, হ্যাঃ, হ্যাঃ!
সেই হাসির সঙ্গে সঙ্গেই দেখলাম আমার ঘরটা আস্তে আস্তে আলো হয়ে উঠল। সূর্যের আলো নয়, ম্যাকাওর বহুবিচিত্র পালকের চোখ ঝলসানো রং-এর আলোয় আমার ল্যাবরেটরির চেহারা ফিরে গেল।
আমি আমার খাতাগুলো ঝাড়তে ঝাড়তে চেয়ার থেকে উঠে পড়ে ম্যাকাওটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললুম থ্যাঙ্ক ইউ!
ম্যাকাও বলল, গ্রাসিয়া, গ্রাসিয়া!
সন্দেশ। শারদীয়া ১৩৭১
প্রোফেসর শঙ্কু ও রক্তমৎস্য রহস্য
১৩ই জানুয়ারি
গত কদিনে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি, তাই আর ডায়রি লিখিনি। আজ একটা স্মরণীয় দিন, কারণ আজ আমার লিঙ্গুয়াগ্রাফ যন্ত্রটা তৈরি করা শেষ হয়েছে। এ যস্ত্রে যে কোনও ভাষার কথা রেকর্ড হয়ে গিয়ে তিন মিনিটের মধ্যে তার বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়ে বেরিয়ে আসে। জানোয়ারের ভাষার কোনও মানে আছে কি না সেটা জানার একটা বিশেষ আগ্ৰহ ছিল। আজ আমার বেড়াল নিউটনের তিন রকম ম্যাও রেকর্ড করে তার তিন রকম মানে পেলাম। একটা বলছে দুধ চাই, একটায় মাছ চাই। আর একটায় ইঁদুর চাই। বেড়ালরা কি তা হলে খিদে না পেলে ডাকে না? আরও দু রকম ম্যাও রেকর্ড না করে সেটা বোঝাবার কোনও উপায় নেই।
মাছ বলতে মনে পড়ল-আজ খবরের কাগজে (মাত্র একটা বাংলা কাগজে) একটা খবর বেরিয়েছে, সেটার সত্যি মিথ্যে জানি না, কিন্তু সেটা যদি বানানোও হয়, তা হলে যে বানিয়েছে তার কল্পনাশক্তির প্রশংসা করতে হয়। খবরটা এখানে তুলে দিচ্ছি–
গোপালপুর, ১০ জানুয়ারি। গোপালপুরের সমুদ্রতটে একটি আশ্চর্য ঘটনা স্থানীয় সংবাদদাতার একটি আশ্চর্য বিবরণে প্রকাশ পাইয়াছে। উক্ত বিবরণে বলা হইয়াছে যে, গতকল্য সকলে নুলিয়া শ্রেণীর কতিপয় ধীবর জাল ফেলিয়া সমুদ্র হইতে মাছ ধরিয়া সেই জাল ডাঙায় ফেলিবামাত্র উহা হইতে বিশ পচিশটি রক্তাভ মৎস লাফাইতে লাফাইতে পুনরায় সমুদ্রের জলে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া জলমধ্যে অদৃশ্য হইয়া যায়। নুলিয়াদের কেহই নাকি এই মৎস্যের জাত নির্ণয় করিতে পারে নাই, এবং জালাবদ্ধ মৎস্যেরা এ হেন ব্যবহার নাকি তাহাদের অভিজ্ঞতায় এই প্ৰথম।
