প্রায় এক মিনিট ছিল এই আরশোলার ভূত। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল। বুঝলাম আজ আর অন্য ভূত নামানোর চেষ্টা বৃথা।
কাল সকালে আরেকবার চেষ্টা করে দেখব। আজ সমস্ত দিনটা মনের ব্যায়াম অভ্যোস করতে হবে, যাতে কাল কনসেনট্রেশনে কোনও ত্রুটি না হয়।
১১ই এপ্রিল
অভাবনীয়।
আজ প্রায় সাড়ে তিন মিনিট ধরে আমার পরলোকগত বন্ধু ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক আর্চিবল্ড অ্যাকরয়েডের সঙ্গে আলাপ হল। নরওয়েতে রহস্যজনকভাবে অ্যাকরয়েডের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কারণ পরে আমি জেনেছিলাম—এবং সেটা এর আগেই আমি ডায়রিতে লিখেছি। আজ সেই অ্যাকরয়েড অতি আশ্চর্যভাবে আমার সবুজ ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে আবির্ভূত হলেন।
আশ্চর্য বলছি। এই জন্যে যে, অ্যাকরয়েডের বিষয় প্রায় পাঁচ মিনিট ধ্যান করার পর যে জিনিসটা প্রথম দেখা গেল ধোঁয়ার মধ্যে সেটা হল একটি নরকঙ্কাল-যার ডান হাতটা আমার দিকে প্রসারিত।
তারপর হঠাৎ দেখি সে কঙ্কালের চোখে সোনার চশমা। এ যে অ্যাকরয়েডেরই বাইফোকাল চশমা, সেটা আমি দেখেই চিনলাম।
চশমার পর দেখা গেল দাঁতের ফাঁকে একটা বাঁকানো পাইপ-অ্যাকরয়েডের সাধের ব্র্যায়ার।
তারপর পাঁজরের ঠিক নীচেটায় একটা চেনওয়ালা ঘড়ি। এও আমার চেনা।
বুঝতে পারলাম অ্যাকরয়েডের চেহারার যে বিশেষত্বগুলি আমার মনে দাগ কেটেছিল, সেগুলো আগে দেখা যাচ্ছে।
ঘড়ি, পাইপ ও চশমাসমেত কঙ্কাল হঠাৎ বলে উঠল—
হ্যালো, শঙ্কু!
এ যে স্পষ্ট অ্যাকরয়েডের গলা।–আর কণ্ঠস্বরের সঙ্গে সঙ্গেই সুটপরিহিত সৌম্যমূর্তি অ্যাকরয়েডের সম্পূর্ণ অবয়ব ধোঁয়ার মধ্যে প্রতীয়মান হল। তাঁর ঠোঁটের কোণে সেন ছেলেমানুষি হাসি, মাথার কাঁচাপাকা চুলের একগোছা কপালের ওপর এসে পড়েছে। গায়ে ম্যাকিনটশ, গলায় মাফলার, হাতে দস্তানা।
আমি প্রায় হাত বাড়িয়ে অ্যাকরয়েডের হাতে হাত মেলাতে গিয়ে শেষ মুহুর্তে অপ্ৰস্তুত হয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। করমর্দন সম্ভব ছিল না। কারণ যা দেখেছিলাম তা অ্যাক্রয়েডের জড়রূপ নয়, শূন্যে ভাসমান প্রতিবিম্ব মাত্র। কিন্তু আশ্চর্য এই যে প্রেতিচ্ছায়ার কণ্ঠস্বর অতি স্পষ্ট। আমি কিছু বলার আগেই অ্যাকরয়েড তাঁর গভীর অথচ মসৃণ গলায় বললেন,-
তোমার কাজের দিকে আমার দৃষ্টি রয়েছে। যা করছ, তা সবই খেয়াল করি। তুমি তোমার দেশের মুখ উজ্জ্বল করছি।
উত্তেজনায় আমার গলা প্রায় শুকিয়ে এসেছিল। তবু কোনওরকমে বললাম, আমার নিও-স্পেকট্রোস্কোপ সম্বন্ধে তোমার কী মত?
সবুজ ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতর থেকে মৃদু হেসে অ্যাকরয়েড বললেন আমার দেখা যখন তুমি পেয়েছ, তখন আর মতামতের প্রয়োজন কী? তুমি নিজেই জানো তুমি কৃতকার্য হয়েছ। যারা লোকান্তরিত, তারা মতামতের উর্ধের্ব। মানসিক প্রতিক্রিয়ার কোনও প্রয়োজন আমাদের জগতে নেই। চিন্তা ভাবনা সুখ দুঃখ ভাল মন্দ সবই এখানে অবাস্তর।
আমি অবাক হয়ে অ্যাকরয়েডের কথা শুনছি, আর এরপর কী জিজ্ঞেস করব ভাবছি, এমন সময় একটা অদ্ভুত হাসির সঙ্গে সঙ্গেই বুদবুদের মতো অ্যাকরয়েড অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আর তারপরেই ধোঁয়ার কুণ্ডলীটা আমার দিকে এগিয়ে এল—আর আমি বুঝতে পারলাম যে আমার চেতনা লোপ পেয়ে আসছে।
যখন জ্ঞান হল, তখন দেখি আমার চাকর প্রহ্লাদ আমার কপালে জলের ছিটা দিচ্ছে।
এই গরমে লোহার টুপি মাথায় পরে বসে আছ বাবু-বুড়ো বয়সে এত কি সয়?
হেলমেটটা খুলে ফেললাম! বেশ ক্লান্ত লাগছে। বুঝলাম অতিরিক্ত কনসেনট্রেশনের ফল। কিন্তু অ্যাকরয়েডের প্ৰেতাত্মা যে আজ আমার ল্যাবরেটরিতে আবির্ভূত হয়ে আমার সঙ্গে কথা বলে গেছে, তাতে কোনও ভুল নেই। আমার গবেষণা, আমার পরিশ্রম অনেকাংশে সার্থক হয়েছে। আশ্চর্য আবিষ্কার আমার এই নিও-স্পেকট্রোস্কোপ!
মনে মনে ভাবলাম-সামান্য শারীরিক গ্লানিতে নিরুৎসাহ হলে চলবে না। কাল আবার বসব এই যন্ত্র নিয়ে। ইচ্ছা হচ্ছে বিগত যুগের কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রের প্ৰেতাত্মার সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয় করে তাদের সঙ্গে কথা বলব।
১২ই এপ্রিল
অন্ধকূপ হত্যার আসল ব্যাপারটা জানিবার জন্য আজ ভেবেছিলাম সিরাজদ্দৌলাকে একবার আনব্য-কিন্তু সব প্ল্যান মাটি করে দিলেন। আমার প্রতিবেশী অবিনাশ চাটুজ্যে।
বৈঠকখানায় বসে সবেমাত্র কফি শেষ করে ন্যাপকিনে মুখ মুছছি, এমন সময় ভদ্রলোক হাজির।
অবিনাশবাবুর মতো অবৈজ্ঞানিক ব্যক্তি জগতে আর দ্বিতীয় আছে কি না সন্দেহ। ভদ্রলোকের জন্ম হওয়া উচিত ছিল প্রস্তরযুগে। বিংশ শতাব্দীতে তিনি একেবারেই বেমানান। আমার সাফল্যে ঔদাসীন্য ও ব্যর্থতায় টিটকিরি—এ দুটো জিনিস ছাড়া ওঁর কাছে কখনও কিছু পেয়েছি বলে মনে পড়ে না।
ঘরে ঢুকেই আমার সামনের সোফায় ধাপ করে বসে পড়ে বললেন, উশ্রীর ধারে S8
ঘোরাফেরা হচ্ছিল কী মতলবে?
উশ্রীর ধারে? আমি মাঝে মাঝে অবিশ্যি প্ৰাতভ্ৰমণে যাই। ওদিকটা, কিন্তু গত বিশ পচিশ দিনের মধ্যে যাইনি। সত্যি বলতে কী, বাড়ি থেকেই বেরোইনি। তাই বললাম–
কবেকার কথা বলছেন?
আজকে মশাই, আজকে। এই ঘণ্টাখানেক হবে। ডাকালুম-সাড়াই দিলেন না।
সেকী-আমি তো বাড়ি থেকে বেরোইনি।
অবিনাশবাবু এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। এ আবার কী ভিমরতি ধরল। আপনার!! অস্বীকার করছেন কেন? ওরকম করলে যে লোকে আরও বেশি সন্দেহ করবে। আপনার পাঁচ ফুট দু ইঞ্চি হাইট, ওই টাক-ওই দাড়ি-গিরিডি শহরে এ আর কার আছে বলুন!
