অল্ হাব্বাল ডান হাতটা তুলে গোল্ডস্টাইনকে শান্ত হবার ইঙ্গিত করে বলল, আপনি যে ভাবে চেচাচ্ছেন, তাতে ভয় হয় যিনি আজ পঞ্চাশ শতাব্দী ধরে এই গুহায় কঙ্কাল অবস্থায় বিশ্রাম করছেন, তিনিও না। অস্থির হয়ে ওঠেন। দোহাই মিস্টার গোল্ডস্টাইন-আপনি অতটা উত্তেজিত হবেন না।
গোল্ডস্টাইন কেমন যেন একটু থিতামত খেয়ে চাপাস্বরে বলল, কঙ্কাল?
অল্ হাব্বাল পিদিমটা আবার তুলে নিয়ে পাথরের ফলকটার পিছন দিকটায় এগিয়ে গেল। আমরাও সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে দেখি গুহাটা এখানে একটা চতুষ্কোণ চত্বরের চেহারা নিয়েছে। তার মাঝখানে একটা প্ৰায় চার হাত গভীর গর্ত। সেই গর্তের ভিতরে পিদিমটা নামাতেই চিত হয়ে শোওয়া একটা কঙ্কাল আর তার পাশে ছড়ানো কিছু পোড়ামাটির হাঁড়িকুড়ি দেখতে পেলাম।
অল্ হাব্বাল কঙ্কালের দিকে তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, জাদুকরশ্রেষ্ঠ গেলাম নিশাহির অল হারারিৎ।
পিন্দিমের আলোয় দেখলাম গোল্ডস্টাইনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে মুখ বিকৃত করে বলে উঠল, বাগদাদে এসে এসব বীভৎস তামাশা কেন বরদাস্ত করতে হবে তা আমি বুঝতে পারছি না। তুমি ফটক খুলবে কি না বলে।
অল্ হাব্বাল শান্ত ভাবে কঙ্কালের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে গোল্ডস্টাইনের দিকে তাকাল।
গোল্ডস্টাইন অল হাব্বালের জন্য অপেক্ষা না করেই চিৎকার করে উঠল—
চিচিং ফাঁক!
কয়েক মুহুর্ত আমরা স্তব্ধ হয়ে ফটকের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু চিৎকারে কোনও ফল হল না। ফটক যেমন বন্ধ তেমন বন্ধই রইল। গোল্ডস্টাইন এবার রাগে কাঁপতে কাঁপতে অল হাব্বালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার টুঁটিটা টিপে ধরল।
তুমি এক্ষুনি ফটক খুলবে কি না বলো।
আমি আর পেত্রুচি দুজনে মিলে কোনওমতে গোল্ডস্টাইনকে নিরস্ত করলাম। অল্ হাব্বাল তার গলার স্বর গম্ভীর করে বলল, প্রোফেসর গোল্ডস্টাইন-আপনি বৃথা উত্তেজিত হচ্ছেন। মন্ত্রটা একটা বিশেষ সুরে উচ্চারণ না করলে ফটক খুলবে না—আর সে সুর একমাত্র আমারই জানা আছে। গুহা আবিষ্কার করার পর ক্রমাগত বিশ দিন ধরে মন্ত্রটা বার বার আবৃত্তি করে তবে আমি ঠিক সুরটা আবিষ্কার করতে পেরেছি। সুতরাং—
গোল্ডস্টাইন অধৈৰ্য ভাবে বলল, তা হলে তুমিই বলো। আমি আর এই বন্ধ গুহায় থাকতে পারছি না।
অল্ হাব্বাল বলল, কিন্তু তোমাদের এখানে নিয়ে আসার কারণটা না বলে আমি কী করে ফাটক খুলি? তোমরা যদি আমার অনুরোধ রক্ষা না করা?
কী অনুরোধ? আমরা তিনজনে একসঙ্গে জিজ্ঞেস করে উঠলাম।
আল হাব্বাল এবার প্রদীপটা নিয়ে গুহার মধ্যিখানটায় এগিয়ে গেল। প্ৰদীপের আলোয় একটা চৌকোনা পাথরের টিবি দেখতে পেলাম। তারপর আরও কাছে যেতে দেখতে পেলাম টিবিটার উপর একটা অদ্ভুত দেখতে বাক্স রাখা রয়েছে। বাক্সটা মনে হল তামার, কিন্তু তার উপর সোনা ও রুপোর কাজ করা রয়েছে। আর রয়েছে নানান রঙের নানান সাইজের পাথর বসানো। বাক্স বলছি, কিন্তু সেটাকে যে খোলা যায়, বা তার যে কোনও ঢাকনা বা ডালা বলে কিছু আছে, সেটা দেখে মনে হয় না।
গোল্ডস্টাইন বলল, এটা কী?
পেত্রুচি বলল, এই বাক্সটার কথাই কি ওই পাথরে লেখা আছে?
অল্ হাব্বাল বলল, তা ছাড়া আর কী? কারণ এই গুহাটা যখন প্রথম আবিষ্কার করি তখন এর ভিতরে ওই কঙ্কাল আর এই বাক্স ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
আমি বললাম, কিন্তু লেখায় যে বলছে এর ভিতরে ইতিহাস জীবন্ত ভাবে রক্ষিত হয়েছে–সে ব্যাপারটা কী?
অল হাব্বালের মুখে একটা স্নান হাসি ফুটে উঠল। বলল—
সেইটেই তো আসল প্রশ্ন। সেইখানেই তো মুশকিল। আমার বুদ্ধিতে এর রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হচ্ছে না। আমি অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু কৃতকার্য হইনি। এবারে বুঝতে পািরছ তোমাদের এখানে আনার কারণটা?
আমরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। অবশেষে গোল্ডস্টাইন বলল, তুমি চাইছ। আমরা এটার রহস্য উদঘাটন করি?
অল্ হাব্বাল বলল, আমি কাউকে জোর করতে চাই না। সে ইচ্ছা আমার নেই। আমি কেবল অনুরোধ করতে পারি।
গোল্ডস্টাইন বলল, আমি এর মধ্যে নেই সেটা আমি স্পষ্টই বলে দিচ্ছি। আমার বিশ্বাস ওর মধ্যে কিছু নেই।
গোল্ডস্টাইন বাক্সটা হাতে তুলে নিল।
অল্ হাব্বাল বাধা দিল না, কেবল গভীর চাপা গলায় বলল, ওটার অবমাননা করলে জিগুরাৎ-এর দেবতা অসন্তুষ্ট হবেন।
গোল্ডস্টাইন একটা তাচ্ছিল্যের ভাব করে বাক্সটাকে রেখে দিল। এবার আমি সেটাকে অতি সস্তপণে হাতে তুলে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলাম, পের্তুচি আমার পাশে দাঁড়িয়ে।
অল্ হাব্বাল প্ৰদীপটা নিয়ে আমাদের আরও কাছে এগিয়ে এল।
বাক্সটা ওজনে বেশ ভারী। হাতটা অল্প নাড়া দিতে ভিতর থেকে সামান্য একটা শব্দ পেলাম। বুঝলাম ভিতরে কিছু আলগা জিনিস আছে।
অবশেষে আমি বললাম, গুহার ভিতরে এর রহস্য উদঘাটন সম্ভব হবে না। তুমি কি এটা আমাদের হোটেলে নিয়ে যেতে দেবে? শুধু আজকের দিনের জন্য? আমি কথা দিচ্ছি। এর কোনও অবমাননা আমি করব না।
অল্ হাব্বাল কিছুক্ষণ একদৃষ্টি আমার দিকে চেয়ে বলল, জিগুরাৎ-এর দেবতার অলৌকিক শক্তিতে তোমার বিশ্বাস আছে?
আমি বললাম, প্রাচীন জিনিসের প্রতি আমার অসীম শ্ৰদ্ধা আছে, বিশেষত সে জিনিস যদি এত সুন্দর হয়।
অল্ হাব্বাল একটু হেসে বলল, তাতেই হবে।
তারপর আমাদের দিক থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে ফটকের দিকে মুখ করে তার সেই অদ্ভুত সুরেলা গলায় বলে উঠল—চিচিং ফাঁক।
