ড্রাগন তখন সবে আমার ফোরোসোটানিক অ্যাসিডের বোতলের ছিপিটি খুলেছে। আমি অতি সন্তৰ্পণে এগিয়ে গিয়ে পিস্তলটি উচিয়ে তার কাঁধের উপর তাগ করে ঘোড়া টিপতেই একটা বিদ্যুতের শিখা তিরের মতো গিয়ে লক্ষ্যস্থলে লাগল।
কিন্তু অবাক বিস্ময়ে এবং গভীর আতঙ্কে দেখলাম, যে শকে একটি আস্ত হাতি ভস্ম হয়ে যাবার কথা, সে শক এই সাড়ে তিন হাত (ড্রাগনটি আয়তনে ক্ৰমেই বেড়ে চলেছে) প্রাণীর কোনওই অনিষ্ট করতে পারল না! সামান্য একটু শিউরে উঠে ড্রাগন বোতল ছেড়ে প্রায় দশ সেকেন্ড তার হলুদ জ্বলজ্বলে চোখ দিয়ে একদৃষ্টি আমার দিকে চেয়ে রইল।
আমি অনুভব করলাম আমার হাত পা অবশ হয়ে আসছে।
তারপর ড্রাগনের নাক দিয়ে পড়ল নিশ্বাস, আর নিশ্বাসের সঙ্গে বেরোল রক্তবর্ণ ধোঁয়া। সেই তীব্র ঝাঁঝালো বিষাক্ত ধোঁয়ায় আমার দৃষ্টি ও চেতনা লোপ পেতে শুরু করল।
অজ্ঞান হবার আগের মুহুর্ত অবধি আমি দেখতে পেলাম ড্রাগন তার পায়ের আঘাতে ও লেজের আছড়ানিতে আমার টেবিলের সমস্ত যন্ত্রপাতি লণ্ডভণ্ড চূৰ্ণবিচূর্ণ করছে।
***
প্রহ্লাদের গলার আওয়াজে জ্ঞান হল।
বাবু, বাবু!
ধড়মড়িয়ে উঠে দেখি ল্যাবরেটরির চেয়ারে বসে আছি।
প্রহ্লাদ জিভ কেটে বলল, অ্যাই দ্যাখ—আপনি ঘুমিয়ে পড়লে, আমি বুইতে পাইনি।
কী হয়েছে?
সেই নেপালি বাবু। তেনার লাঠিটা ফ্যালে গেলেন যে!
লাঠি?
দরজার দিকে চোখ পড়তে দেখি হাসি মুখে চী-চিং দাঁড়িয়ে আছেন—তাঁর হাতে সেই সরু বাঁশের লাঠি।
দিস তাইম, আই ফলগেত মাই স্তিক। হে হে! ভেলি সলি!
আমার মুখ দিয়ে কেবল বেরোল—বাট দি ড্রাগন?
দাগন? ইউ সি দাগন?
আমার সমস্ত যন্ত্রপাতি… বলতেও লজ্জা করল—কারণ আমার টেবিলের জিনিসপত্র যেমন ছিল তেমনই আছে। কিন্তু অ্যাসিড?…
তিনটি বোতলই যে খালি।
আমি বিস্ফারিত নেত্ৰে খালি বোতলগুলোর দিকে চেয়ে আছি, এমন সময় শুনলাম চী-চিং-এর খিলখিল হাসি।
হিহিহি! এ লিত্ল ম্যাজিক—বাত গ্রেত ম্যাজিক!…ওই তোমার ড্রাগন।
চী-চিং কড়িকাঠের দিকে আঙুল দেখালেন। উপরে চেয়ে দেখি আমার চিরপরিচিত টিকটিকি তার জায়গাতেই রয়েছে।
অ্যান্দ ইয়োল অ্যাসিদ!
এবার টেবিলের দিকে চাইতেই চোখের নিমেষে তিনটি খালি বোতল স্বচ্ছ তরল পদার্থে কানা অবধি ভরে উঠল!
চী-চিং এবার বাঙালি কায়দায় দুটো হাতের তেলো একত্র করলেন।
নোমোস্কাল, প্রোফেসাল সোঁকু।
চী-চিং চলে গেলেন।
প্রহ্লাদ শুনলাম বলছে, ভাবলাম বেশ সরেস লাঠিখান—কাজে দেবে। ও মা-বাবু এই গেলেন। আর এই এলেন। পাঁচ মিনিটও হয়নি।
***
পুনশ্চ। ১৮ই অক্টোবর। ড্রাগনের ঘটনাটা ডায়রিতে লিখতে গিয়ে দেখি সেটা আগেই লেখা হয়ে গেছে—আমারই হাতের লেখায়। এটাও কি তা হলে চী-চিং-এর দুর্ধর্ষ ম্যাজিকের একটা নমুনা?
সন্দেশ। শারদীয়া ১৩৭২
প্রোফেসর শঙ্কু ও বাগদাদের বাক্স
১৯শে নভেম্বর
গোন্ডস্টাইন এইমাত্র পোস্ট আপিসে গেল কী একটা জরুরি চিঠি ডাকে দিতে। এই ফাঁকে ডায়রিটা লিখে রাখি। ও থাকলেই এত বকবক করে যে তখন ওর কথা শোনা ছাড়া আর কোনও কাজ করা যায় না। অবিশ্যি প্রোফেসর পেত্রুচিও আমার সঙ্গেই রয়েছে, আমার সামনেই বসে, কিন্তু কাল হোটেলে তার হিয়ারিং এডটা হারিয়ে যাবার ফলে সে শব্দটব্দ। বিশেষ শুনতে পাচ্ছে না। ফলে লোকজনের সঙ্গে কথাবাতী একরকম বন্ধই করে দিয়েছে। এদেশের ভাষাটা তার বেশ ভাল ভাবেই জানা আছে, এবং আপাতত সে একটি স্থানীয় খবরের কাগজ মুখের সামনে খুলে বসে আছে।
আমাদের বসার জায়গাটা হল বাগদাদ শহরের একটা রেস্টোরান্ট। দোকানের বাইরে ফুটপাথের উপর ফরাসি কায়দায় চাঁদােয়া টাঙিয়ে তার তলায় টেবিলচেয়ার পাতা, এবং তারই একটাতে আমরা বসেছি। কফি অডার দেওয়া হয়েছে, এই এল বলে।
বাগদাদে আসার কারণ হল—আন্তজাতিক আবিষ্কারক সম্মেলন, অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেন্টরস কনফারেন্স। বৈজ্ঞানিক সম্মেলন বহুকাল থেকেই পৃথিবীর নানান জায়গায় হয়ে আসছে, কিন্তু আবিষ্কারক সম্মেলন এই প্ৰথম। বলা বাহুল্য এখানে যাঁরা আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে আমার স্থান খুবই উচুতে। পৃথিবীর কোনও একজন বৈজ্ঞানিক এর আগে আর কখনও এতরকম জিনিস আবিষ্কার করেনি। যাঁরা এসেছেন, তাঁরা সকলেই তাঁদের লেটেস্ট ইনভেনশনটি সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, এবং এই সম্মেলনের একটা প্রধান উদ্দেশ্য হল এইসব আবিষ্কারের খবর পৃথিবীতে প্রচার করা। আমি এনেছি। আমার অমনিস্কোপ যন্ত্র। এটা বৈজ্ঞানিক মহলে বিশেষ সাড়া জাগিয়েছে। যন্ত্রটা হল একরকম চশমা যাতে টেলিস্কোপ, মাইক্রোস্কোপ ও একস-রে—এই তিনটে জিনিসেরই কাজ চলে।
কনফারেন্স কাল শেষ হয়ে গেছে। বাইরে থেকে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ সকালে যে যার দেশে ফিরে গেছেন। আমরা তিনজন আপাতত আরও কিছুদিন থাকব। আমি প্রথম থেকেই ঠিক করেছিলাম। হগুপ্তাখানেক থেকে যাব। সঙ্গে যে আরও দুজনকে পেয়ে গেলাম সেটা কপালজোরে। আমি নিজে কাউকে কিছুই বলিনি। কাল রাত্রে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিনার ছিল, খাওয়া সেরে হোটেলে ফেরার পথে গোল্ডস্টাইন জিজ্ঞেস করল, তুমি কি কালই ফিরে যােচ্ছ নাকি? আমি বললাম, হারুণ-অল-রশিদের দেশে মাত্র সাতদিন থেকে ফিরে যাবার ইচ্ছে নেই। ভাবছি। দেশটাকে আরেকটু ঘুরে দেখব। এখানকার প্রাচীন সভ্যতার কিছু নমুনা চাঙ্গুষ দেখে তারপর দেশে ফিরব।
