তোমার কাছে আমাদের অনুরোধ কাচের আচ্ছাদন খুলে ফেলো। আমাদের আয়ু এমনিতেই কমে এসেছে। একটা আস্ত গ্রহের সমস্ত অধিবাসীদের হত্যা করার অপরাধের ভার কি তুমি সারা জীবন বইতে পারবে? তাই অনুরোধ করছি—আমাদের মুক্তি দাও। তুমি বৈজ্ঞানিক। আমাদের সম্বন্ধে তোমার মনে কোনওরকম সহানুভূতির ভাব নেই?
একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে খোঁচা দিচ্ছিল। এবারে সেটা না জিজ্ঞেস করে পারলাম না।
তোমাদের মধ্যে কি এমন কোনও ক্ষমতা আছে যাতে তোমরা তোমাদের চেয়ে আয়তনে অনেক বড় প্রাণীকেও হত্যা করতে পার?
কিছুক্ষণ কোনও উত্তর নেই। আমি বললাম, আমার প্রশ্নের জবাব দাও। গত কদিনের মধ্যে তোমাদের কাছাকাছি কতগুলি প্রাণীর যে মৃত্যু হয়েছে—তার জন্য কি তোমরা দায়ী?
এবারে আমার প্রশ্নের উত্তরে একটা পালটা প্রশ্ন এল—ভাইরাস কাকে বলে জান?
নিশ্চয়ই।
কাকে বলে?
আমার ভারী অপমান বোধ হচ্ছিল, তাও উত্তর দিলাম—রোগবহনকারী বিষাক্ত বীজকে বলে ভাইরাস।
ঠিক। এই ভাইরাসের আয়তন কী?
মাইক্রোস্কোপে দেখতে হয়।
ঠিক। কিন্তু এই বীজ থেকে একটা গোটা শহরের লোক নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে সেটা জান?
শুধু শহর কেন? একটা সম্পূর্ণ দেশের লোকসংখ্যা লোপ পেয়ে যেতে পারে। মহামারীর কথা কে না জানে?
ঠিক। এখনও কি বুঝতে পারিছ না। আমাদের ক্ষমতা কোথায়?
ছড়িয়ে দেব কেন?
তা হলে?
কোনও উত্তর নেই। আমি অনুভব করলাম আমার ভেতরের জামাটা ঘামে ভিজে উঠেছে। একটা সাংঘাতিক সন্দেহ মনের মধ্যে জেগে উঠেছে।
এই গ্রহের অধিবাসীরা কি তা হলে এক একটি মূর্তিমান ভাইরাস?
তাই যদি হয়, তা হলে এদের মুক্তি দিলে তো এরা সমস্ত পৃথিবীকে—তিন মাসের মধ্যে।
আমি চমকে উঠলাম। আমার কোন প্রশ্নের জবাব এরা দিচ্ছে? আমি তো কোনও প্রশ্ন করিনি। এদের!
এবারে একটা ক্ষীণ হাসির শব্দ পেলাম…সে হাসি এক অপার্থিব বিদ্রূপে ভরা। তারপর কথা এল…
আমরা মানুষের মনের কথা বুঝতে পারি। তুমি ভাবছ সমস্ত পৃথিবীকে রোগাচ্ছন্ন করার শক্তি আছে কি না আমাদের। আমি উত্তরে বলেছি…আছে। শুধু তাই নয়…সমস্ত পৃথিবীকে তিন মাসের মধ্যে আমরা জনশূন্য করে দিতে পারি। সংক্রামক রোগের জন্য তো আর হাঙ্গামা করতে হয় না। আমাদের একজনের চেষ্টাতেই সমস্ত গিরিডি শহরটা ফাঁকা করে দিতে পারি। আর সকলে মিলে যদি একজোটে লাগি তা হলে…।
গলার স্বরটা যেন কেমন ক্ষীণ হয়ে আসছে। সেটা কি যন্ত্রের দোষ?
আবার উত্তর এল… না, তোমার যন্ত্র ঠিক আছে। আমরাই দুর্বল হয়ে পড়েছি। কাচের ঢাকনা না খুললে আমরা আর বাঁচব না। আমাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী হবে তুমি-প্রোফেসর ত্ৰিলোকেশ্বর শঙ্কু; এই খুনের জন্য অবিশ্যি তোমাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে না। কিন্তু বিবেক বলে কি তোমার কিছুই নেই। একজন বৈজ্ঞানিকের কি এতটা নিষ্ঠুরতা সম্ভব? ভেবে দেখো শঙ্কু, ভেবে দেখো।
তোমাদের যদি মুক্তি দিই, তা হলে পৃথিবীতে মানুষের উপর থেকে তোমাদের আক্রোশ যাবে কি? তোমাদের বিশ্বাস করব কী করে?
এ প্রশ্নের জবাব এল না। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতার পর আমার যন্ত্রের ভিতর থেকে আসতে আরম্ভ করল এক বীভৎস আর্তনাদের কোরাস। কত কণ্ঠ সে কোরাসে মিলেছে। জানি না। কিন্তু সেটা যে আর্তনাদ, এবং তাতে যে তীব্র যন্ত্রণার ইঙ্গিত রয়েছে তাতে কোনও ভুল নেই!
শঙ্কু! শঙ্কু!
সমস্ত আর্তনাদ ছাপিয়ে আবার সেই কথা।
শঙ্কু! শঙ্কু! শঙ্কু!
কী বলছি?
কাচের ঢাকনা খুলে দাও, খুলে দাও! আমরা মরতে চলেছি। আমাদের প্রাণ তোমার হাতে। হত্যার দায়ে পড়ো না। সারাটা জীবন বিবেকের জ্বালা…
কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে এল।
আমি যেমন চেয়ারে বসেছিলাম, তেমনই বসে রইলাম। একটা প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব মনের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের কর্তব্য কী সেটা বুঝতে পারছিলাম। কাচের ঢাকনা খোলা চলে না। টেরাটম গ্রহের প্রাণীদের বাঁচাতে গিয়ে সমস্ত পৃথিবীর লোকের জীবন বিপন্ন করা চলে না।
আমার মাইক্রোসোনোগ্রাফে শব্দ কমে আসছে। কথা থেমে গেছে-এখন কেবল তীব্ৰ, তীক্ষ্ণ আর্তনাদ!
সে আর্তনাদ ক্ৰমশ হাহাকারে পরিণত হল।
তারপর সে হাহাকারও মিলিয়ে গিয়ে রইল এক গভীর নিস্তব্ধতা।
আমি আরও মিনিটখানেক অপেক্ষা করে আমার যন্ত্রের সুইচটা বন্ধ করে দিলাম।
তারপর আস্তে আস্তে বলটার কাছে হেঁটে গিয়ে কাচের ঢাকনাটা তুলে ফেললাম।
ঘড়িতে ভোর পাঁচটার ঘণ্টা বাজছে।
কিন্তু টেরাটমে বসন্তের রং ধরেনি। তার বদলে একটা যেন মেটে রুক্ষতা।
আমি বলটাকে তুলে নিয়ে নিউটনের দিকে চাইলাম। সে-ও দেখি একদৃষ্টে বলটার দিকে চেয়ে আছে। কিন্তু আগের সেই আক্রোশের কোনও ইঙ্গিত পেলাম না আর দৃষ্টিতে। আমি বললাম, তুই খেলবি বলটাকে নিয়ে? নে খেল।
বলাটা মাটিতে রাখতে নিউটন এগিয়ে এল। তারপর তার ডান হাত দিয়ে মৃদু একটা আঘাত করতেই সৌরজগতের ক্ষুদ্রতম গ্রহ ফেটে চৌচির হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল!
সন্দেশ। বৈশাখ ১৩৭২
প্রোফেসর শঙ্কু ও চী-চিং
১৮ই অক্টোবর
আজ সকালে সবে ঘুম থেকে উঠে মুখটুখ ধুয়ে ল্যাবরেটরিতে যাব, এমন সময় আমার চাকর প্রহ্লাদ এসে বলল, বৈঠকখানায় একটি বাবু দেখা করতে এয়েছেন।
আমি বললাম, নাম জিজ্ঞেস করেছিস?
প্ৰহাদ বলল, আর্জেন্তু না। ইংরিজি বললেন। দেখে নেপালি বলে মনে হয়।
