ভদ্রলোক একেবারে যেন চুপসে গেলেন।
ভুল হয়েছে? বৈজ্ঞানিক! ও, তা হলে বোধ হয়। ভুলই হয়েছে। কিন্তু তা হলে কোথায় যাব বলুন তো?
কেন, আপনাদের ওদিকে তো আরও অন্য ডাক্তার রয়েছেন।
তা আছে। তবে তারাও কিছু করতে পারল না। আমার খোকার জন্য।
কী হয়েছে। আপনার ছেলের? কত বয়স?
আজ্ঞে, ছেলের আমার চার পুরেছে। গত জষ্ঠি মাসে। খোকা বলে ডাকি, ভাল নাম অমূল্য। হয়েছে কী—এই সেদিন—এই গত বুধবার সকালে—আমার উঠোনের এক কোণে শেওলা ধরে ভারী পেছলা হয়ে আছে-সেখানে খেলা করতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে মাথার এই বাঁ দিকটায় একটা চোট লাগল। খুব কান্নাকাটি করল খানিকটা। পরে দেখলাম মাথার ওইখানটা ফুলেওছে বেশ। ফোলা অবিশ্যি দুদিনেই কমে গেল, কিন্তু সে থেকে কী যে আবোলতাবোল বকছে তা বুঝতেই পারছি না। অমন কথা সে এর আগে কক্ষনও বলেনি বাবু! তবে কেমন যেন মনে হয়—বুঝতে পারি না—তবু মনে হয়—সে কথার যেন মানে আছে। তবে আমরা তো মুখু্যসূখু মানুষ—পোস্টাপিসের কেরানি—আমরা তার মানে বুঝি না।
ডাক্তার বোঝেনি তার মানে?
আজ্ঞে না। আর সে ডাক্তার তো তেমন নয়, তাই ভাবলাম যে আপনার কাছে….।
আমি বললাম, কেন, ঝাঝার ডাক্তার গুহ মজুমদারকে তো আমি চিনি। তিনি তো ভাল চিকিৎসক।
তাতে ভদ্রলোক খুব কাতরভাবে বললেন, আমার কি তেমন সামর্থ্য আছে বাবু যে আমি বড় ডাক্তারকে ডাকব! আমায় সবাই বললে যে গিরিডির শঙ্কু ডাক্তারের কাছে যাও—তিনি দয়ালু লোক বিনি। পয়সায় তোমার ছেলেকে ভাল করে দেবেন। তাই এলুম আর কী।
লোকটিকে দেখে মায়া হচ্ছিল, তাই আমার ব্যাগ থেকে কুড়িটা টাকা বার করে দিয়ে বললাম, আপনি গুহ মজুমদারকে দেখান। তিনি নিশ্চয়ই আপনার ছেলেকে ভাল করে দেবেন।
ভদ্রলোক কৃতজ্ঞভাবে টাকাটা পকেটে পুরে হাত জোড় করে মাথা হেঁট করে বললেন, আসি তা হলে। আপনাকে অযথা বিরক্ত করলুম-মাফ করবেন।
ভদ্রলোক চলে যাবার পর নিশ্চিন্ত মনে হাঁফ ছেড়ে ল্যাবরেটরিতে ফিরে এলাম। এরা আমাকে ডাক্তার বলে ভুল করল কী করে, সেটা ভেবে যেমন হাসি পাচ্ছে, তেমন অবাকও লাগছে।
১০ই সেপ্টেম্বর
সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে ওঠা আমার চিরকালের অভ্যাস। উঠে হাত মুখ ধুয়ে একটু উশ্রীর ধারে বেড়াতে যাই। আজ প্ৰাতভ্ৰমণ সেরে ফিরে এসে দেখি ঝাঝার ডাক্তার প্রতুল। গুহ মজুমদার ও সেদিনের সেই ভদ্রলোকটি আমার বৈঠকখানায় বসে আছেন। আমি তো অবাক। প্রতুলবাবু এমনিতে বেশ হাসিখুশি, কিন্তু আজ দেখলাম। তিনি রীতিমতো গভীর ও চিন্তিত। আমাকে দেখেই সোফা ছেড়ে উঠে নমস্কার করে বললেন, আপনি তো মশাই বেশ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন, এ চিকিৎসা তো আমার দ্বারা সম্ভব নয় প্রোফেসর শঙ্কু!
আমি প্রহ্লাদকে ডেকে কফি আনতে বলে সোফায় বসে প্রতুলবাবুকে বললাম, কী অসুখ হয়েছে বলুন তো ছেলেটির। কষ্টটা কী?
কোনও কষ্ট আছে বলে মনে হয় না।
তবে? মাথায় চোট লেগে ব্রেনে কিছু হয়েছে কি? ভুল বকছে?
বকছে, তবে ভুল-ঠিক বলা শক্ত। এখন পর্যন্ত এমন কিছু বলতে শুনিনি যেটাকে জোর দিয়ে ভুল বলা চলে। আবার এমন কিছু বলতে শুনেছি যেগুলো একেবারে অবিশ্বাস্য রকম ঠিক।
কিন্তু আমিই বা এ ব্যাপারে কী করতে পারি বলুন।
প্রতুলবাবু ও অন্য ভদ্রলোকটি পরস্পরের দিকে চাইলেন। তারপর প্রতুলবাবু বললেন, আপনি একবার আমাদের সঙ্গে চলুন! আমার গাড়ি আছে—একবার দেখে আসুন অন্তত। আমার মনে হয়—আর কিছু না হোক আপনার খুব আশ্চর্য ও ইন্টারেস্টিং লাগবে। সত্যি বলতে কী, কেউ যদি এর একটা কিনারা করতে পারে, তবে সেটা আপনিই পারবেন।
খুব একটা জরুরি কারণ না থাকলে প্রতুলবাবু আমাকে এমন অনুরোধ করতেন না সেটা জানি। কাজেই শেষ পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গ নিতেই হল। ফিয়াট গাড়িতে করে গিরিডি থেকে ঝাঝা পৌছোতে আমাদের লাগল। দুঘণ্টা।
পথে আসতে আসতেই জেনেছিলাম। অন্য ভদ্রলোকটির নাম দয়ারাম বোস। সাত বছর হল ঝাঝার পোস্টাপিসে চাকরি করছেন। বাড়িতে স্ত্রী আছেন, আর ওই একটি মাত্র ছেলে অমূল্য ওরফে খোকা। বাড়িটাও দেখলাম ভদ্রলোকের চেহারার সঙ্গে মানানসই। খোলার ছাতওয়ালা একতলা বাড়ি, দুটি মাত্র ঘর, আর একটা আট হাত বাই দশ হাত উঠোন-যে উঠোনে খোকা পিছলে পড়েছিল। পুব দিকে ঘরের একটা ছোট্ট খাটের উপর বালিশে মাথা দিয়ে খোকা শুয়ে আছে। রোগা শরীর, মাথাটা আর চোখ দুটো বড়, চুলগুলো ছোট ছোট করে ছাঁটা।
আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই খোকা বলল, স্বাগতম।
আমি একটু হেসে বললাম, তুমি সংস্কৃতে অভ্যর্থনা জানাতে শিখলে কী করে?
আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে খোকা কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে বলল, সিক্স অ্যান্ড সেভেন পয়েন্ট টু ফাইভ?
পরিষ্কার ইংরিজি উচ্চারণ-কিন্তু এ প্রশ্নের মানে কী?
আমি দয়ারামবাবুর দিকে চেয়ে বললাম, এসব কথা ও কোথেকে শিখল?
দয়ারামের বদলে প্রতুলবাবু ফিসফিস করে বললেন, যা বুঝছি ও যে সমস্ত কথা কদিন থেকে বলছে, তা ওকে কেউ শেখায়নি। ও নিজে থেকেই বলছে। সেইখানেই তো গণ্ডগোল। অথচ খাচ্ছেদ্যাচ্ছে ঠিকই। ঘুমটা বোধ হয় একটু কমেছে। আমরা যখন বেরিয়েছি পাঁচটায় তখনই ও উঠে গিয়ে কথা শুরু করেছে।
আমি বললাম, সকলে কী বলছিল?
এ প্রশ্নের উত্তর খোকা নিজেই দিল। সে বলল, করভাস স্প্লেন্ডেন, পাসের ডোমেসটিকাস।
আমার পিছনেই একটা চেয়ার ছিল; আমি সেটায় ধাপ করে বসে পড়লাম। এ যে আমাদের অতি পরিচিত সব পাখির ল্যাটিন নামগুলো বলছে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে যে সব পাখিকে প্রথম ডাকতে শুনি সেগুলোরই ল্যাটিন নাম হল এই দুটো। কারভাস সপ্লেন্ডেন হল কাক আর পাসের ডোমেসটিকাস হল চড়াই।
