আমরা নিঃশব্দে এক পা এক পা করে খাটের দিকে এগিয়ে গেলাম।
প্রাণীটিকে মানুষ বলতে বাধে। তার কপাল ঢালু, মাথার চুল নেমে এসেছে প্রায় ভুরু অবধি। তার ঠোঁট দুটো পুরু, থুতনি চাপা, কান দুটো চ্যাপটা আর ঘাড় নেই বললেই চলে। তার সবঙ্গে ছাই রঙের লোমে ঢাকা। আর মুখের যেখানে লোম নেই, সেখানের চামড়া অবিশ্বাস্য রকম কুঁচকোনো। তার বা হাতটা বুকের উপর আর অন্যটা খাটের উপর লম্বা করে রাখা। হাত এত লম্বা যে আঙুলের ডগা গিয়ে পৌঁছেছে। হাঁটু অবধি।
ডাম্বার্টন অস্ফুটম্বরে বলল, কেভম্যান! এখনও বাঁদরের অবস্থা থেকে পুরোপুরি মানুষে পৌঁছোয়নি।
গলার স্বর যথাসম্ভব নিচু করে আমি জবাব দিলাম, কেভম্যান শুধু চেহারাতেই, কারণ আমার বিশ্বাস গুহার মধ্যে যা কিছু দেখছি সবই এরই কীর্তি।
ডাম্বার্টন হঠাৎ কাঁধে হাত দিয়ে বলল, শ্যাঙ্কস-ওটা কী লেখা আছে পড়তে পারছ?
ডাম্বার্টন দেয়ালের একটা অংশে আঙুল দেখাল। বড় বড় অক্ষরে কী যেন লেখা রয়েছে। অক্ষরগুলো ফরমুলা থেকেই চিনে নিয়েছিলাম, সুতরাং লেখার মানে বার করতে সময় লাগল না। বললাম, আশ্চর্য!
কী?
লিখছে-আর সবাই মরে গেছে। আমি আছি। আমি থাকব। আমি একা। আমি অনেক জানি। আরও জানব। জানার শেষ নেই। পাথর আমার বন্ধু। পাথর শত্ৰু!
ডাম্বার্টন বলল, তা হলে বুঝতে পারছি—এই সেই প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরই একজন—কোনও আশ্চর্য উপায়ে অফুরন্ত আয়ু পেয়ে গেছে।
হুঁ—আর হাজার হাজার বছর ধরে জ্ঞান সঞ্চয় করে চলেছে। কেবল চেহারাটা রয়ে গেছে সেই গুহাবাসী মানুষেরই মতন। …কিন্তু শেষের দুটো কথার কী মানে বুঝলে?
পাথর যে এর বন্ধু সে তো দেখতেই পাচ্ছি। এর ঘরবাড়ি আসবাবপত্র যন্ত্রপাতি সবই পাথরের তৈরি। কিন্তু শত্রু বলতে কী বুঝছে জানি না।
আমারই মতো ডাম্বার্টনও বিস্ময়ে প্রায় হতবাক হয়ে গিয়েছিল। বলল, গুহায় থাকে, তাই দিনরাত্রের তফাত সব সময়ে বুঝতে পারে না। হয়তো রাত্রে জেগে থাকে, তাই দিনে ঘুমোচ্ছে।
ছবি তোলার সাহস হচ্ছিল না-যদি ক্যামেরার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়! আমাদের মতো মানুষকে হঠাৎ চোখের সামনে দেখলে কী করবে ও? কিন্তু লোভটা সামলানোও ভারী কঠিন হয়ে পড়ছিল। তাই ডামবার্টনের হাতে বন্দুকটা দিয়ে কাঁধের থলি থেকে ক্যামেরাটা বার করব বলে হাত ঢুকিয়েছি, এমন সময় নাক ডাকানোর শব্দ ছাপিয়ে গুরুগভীর ঘড়ঘড়ানির শব্দ পেলাম। ডাম্বার্টন খপ করে আমার হাতটা ধরে বলল, আৰ্থিকুয়েক।
পরমুহুর্তেই একটা ভীষণ ঝাঁকুনিতে গুহার ভেতরটা থারথার করে কেঁপে উঠল।
কয়েক মুহুর্তের জন্য কী যে করব কিছু বুঝতে পারলাম না।
গুড়গুড় গুম গুম শব্দটা বেড়ে চলেছে, আর তার সঙ্গে ঝাঁকুনিও।
বন্দুক! ডাম্বার্টন চাপা গলায় চেচিয়ে উঠল।
আদিম মানুষটার ঘুম ভেঙে সে খাটের উপর উঠে বসেছে।
আমি ডামবার্টনের হাত থেকে বন্দুকটা নিয়েও কিছু করতে পারলাম না। কেবল তন্ময় হয়ে সামনের দিকে চেয়ে রইলাম।
লোকটা এখন উঠে দাঁড়িয়ে তার লোমশ ভুরুর তলায় কোটরে ঢোকা চোখদুটো দিয়ে একদৃষ্টি আমাদের দিকে চেয়ে দেখছে। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ফলে বুঝতে পারলাম সে লম্বায় পাঁচ ফুটের বেশি নয়। তার কাঁধটা গেরিলার মতো চওড়া, আর পিঠটা বয়সের দরুন বোধ হয় বেঁকে গেছে। তার চাহনি দেখে বুঝলাম সে আমাদের মতো প্ৰাণী এর আগে কখনও দেখেনি।
ভূমিকম্পের ঘন ঘন ঝাঁকুনির ফলে লোকটা যেন ভয় পেয়েছে। একটা কাতর অথচ কর্কশ আওয়াজ করে সে হাত বাড়িয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
একটা প্ৰচণ্ড শব্দ পেয়ে বুঝলাম গুহার দেয়ালে কোথায় যেন ফাটল ধরল। আমরা আর অপেক্ষা না করে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। পরমুহুর্তেই আদিম মানুষের ঘরের ছাতটা ধ্বসে পড়ে গেল।
কর্ডোবা আর তার সহচরদের মৃতদেহ পাশ কাটিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ডাম্বার্টন বলল, শেষ কথাটার মানে বুঝলে তো? পাথর চাপা পড়েই ওকে মরতে হল!
ঝাঁকুনি থামছে না। কীভাবে আমরা বাইরে পৌঁছেব জানি না। এখনও হামাগুড়ি দেওয়া বাকি আছে। বড় হলঘরটিার কাছাকাছি এসে দেখি সামনে দিনের আলো দেখা যাচ্ছে। কীরকম হল? পথ তো একটাই। ভুল পথে এসে পড়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই।
এগিয়ে গিয়ে দেখি ভুমিকম্পে ঘরের দেয়ালে বিরাট ফাটল হয়ে বেরোবার একটা নতুন পথ তৈরি হয়ে গিয়েছে।
পাথর ভাঙার ফলে কিছু আশ্চর্য ছবি ও নকশা যে চিরকালের মতো ধ্বংস হয়ে গেল, সেটা আর ভাববার সময় ছিল না। গুহার নতুন মুখ দিয়ে দুজনে দৌড়ে ভাঙা পাথর ডিঙিয়ে বাইরে বেরোলাম।
বরফ দেখে আবার হদিস পেয়ে গেলাম। আমাদের বাঁ দিক ধরে চলতে হবে-তা হলেই গুহার আসল মুখ ও আমাদের বেরোনোর রাস্তায় পৌছোতে পারব।
মাঝে প্রায় আধ মিনিটের জন্য ঝাঁকুনি থেমেছিল; আবার গুম গুম শব্দের সঙ্গে প্রচণ্ডতর ঝাঁকুনি শুরু হল।
কিন্তু ভূমিকম্পের শব্দ ছাড়াও যেন আরেকটা শব্দ পাচ্ছি। সেটা আসছে আমাদের ডানদিকের ওই ভয়ংকর জঙ্গল থেকে। শব্দটা শুনে মনে হয় যেন অসংখ্য দামামা একসঙ্গে বাজছে, আর তার সঙ্গে যেন অজস্ৰ অজানা প্ৰাণী একসঙ্গে আতঙ্কে চিৎকার করছে।
জঙ্গলের দিকে চেয়ে থেমে পড়েছিলাম, কিন্তু ডাম্বার্টন আমার আস্তিন ধরে টান দিয়ে বলল, থেমো না! এগিয়ে চলো।
পথ খানিকটা সমতল হয়ে এসেছে বলে আমরা আমাদের দৌড়ের মাত্ৰাটা বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু ডানদিক থেকে দৃষ্টি সরাতে পারছিলাম না। কারণ সেই ধুপ ধুপানি আর তার সঙ্গে সেই ভয়াবহ আর্তনাদের শব্দ ক্রমশ বাড়ছিল, এগিয়ে আসছিল।
