ওয়েলকাম, জেন্টলমেন।
হঠাৎ মানুষের গলায় ইংরেজি ভাষা শুনে আমরা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠলাম। শেং বাঁ দিকের দেওয়ালের উপর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছে।
সেখানে একটা গোল গর্ত, তার মধ্য দিয়েই এসেছে কণ্ঠস্বর। আমার বুকের ভিতর হৃৎস্পন্দনের মাত্রা বেড়ে গেছে এক ধাক্কায় অনেকখানি।
হঠাৎ চেনা লাগল কেন গলার স্বরটা?
আবার কথা এল পাশের ঘর থেকে।
অল্পক্ষণের মধ্যেই আমি তোমাদের সঙ্গে দেখা করব। তোমরা একটু অপেক্ষা করে। তোমাদের ঘরে খোলা জানলা না থাকলেও নিশ্বাস প্রশ্বাসের কোনও কষ্ট হবে না, অক্সিজেনের অভাব ঘটবে না। তবে ধূমপান নিষিদ্ধ। ক্ষুধাতৃষ্ণাও তোমরা অনুভব করবে: না। ওই ঘরে। অতএব তোমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।
কথা বন্ধ হল। কই, এঁকে তো শত্রু বলে মনে হচ্ছে না মোটেই! আর ইনি যদি মানুষ হন, তার মানে কি অন্য গ্রহ থেকে আসছে না। এই রকেট?
আর ভাবতে পারলাম না। সন্ডার্স ও ক্রোল টুলে বসে কপালের ঘাম মুছছে। তাদের দেখাদেখি আমরা বাকি তিনজনও বসে পড়লাম।
আবার নৈঃশব্দ্য। আমরা যে যার পকেটে পুরে ফেলেছি আমাদের আগ্নেয়াস্ত্ৰ।
আমি ডায়রি লেখা শুরু করলাম।
কতক্ষণ বসে থাকতে হবে এইভাবে? কী আছে আমাদের কপালে?
১২ই অক্টোবর, সন্ধ্যা ছটা
পৃথিবীর সবচেয়ে নিকটবতী নক্ষত্ৰ আলফা সেনটরির একটি গ্রহ থেকে আসা এই ইউ.এফ.ও.-কে (এখন আর আমাদের অজ্ঞাত নয়) ঘিরে আমাদের যে লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা হল, সেটা গুছিয়ে বলার চেষ্টা করি।
প্রায় দেড় ঘণ্টা গোল ঘরে বসে থাকার পর আবার শুনতে পেলাম পরিচিত কণ্ঠস্বর।
লিসন, জেন্টেলমেন। তোমরা আমাকে না দেখতে পেলেও, আমি তোমাদের দেখতে পাচ্ছি। এই দৃষ্টি সাধারণ চোখের দৃষ্টি নয়। এই রকেটে বিশেষ বিশেষ পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ যন্ত্র রয়েছে। সেই যন্ত্রের সাহায্য দেখেছি তোমাদের তিনজনের পকেটে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। সেই তিনটি অস্ত্ৰ পকেট থেকে বার করে তোমাদের সামনে দেয়ালের উপর দিকে যে গোল গর্তটি রয়েছে তার মধ্যে ফেলে দাও। তারপর বাকি কথা হবে।
আমি কথা শুনেই অ্যানাইহিলিনটা বার করেছি। পকেট থেকে, কিন্তু ক্রোল ও সন্ডার্স দেখছি চুপচাপ বসেই আছে। আমি আজ্ঞা পালনের জন্য ইশারা করলাম তাদের দিকে, তবুও তারা নড়ে না।
আই অ্যাম ওয়েটিং, বলে উঠল গমগমে কণ্ঠস্বর।
আমি আবার ইশারা করলাম। তাতে সন্ডার্স চাপা গলায় অসহিষ্ণুভাবে বলল, একটা বুজরুককে আত ভয় পাবার কী আছে? দিস ইজ নো ইউ.এফ.ও.!
ঘরের আবহাওয়ায় হঠাৎ একটা পরিবর্তন লক্ষ করছি। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এরকম হল কেন? সন্ডার্স ও ক্রোলের হাত চলে গেছে তাদের বুকের ওপর। কোমর থেকে দুমড়ে গেছে শরীর। নকুড়বাবু হাসফাঁস করছেন। শেং-এর জিভ বেরিয়ে গেছে, মুখ বেঁকে গেছে শ্বাসকষ্টে। সর্বনাশ! শেষে কি এইভাবে-?
ফেলে দাও আগ্নেয়াস্ত্ৰ! মুখের মতো জিদ কোরো না! তোমাদের মরণবাঁচন এখন আমার হাতে।
দিয়ে দিন! দিয়ে দিন! রুদ্ধকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন নকুড়বাবু।
আমি আগেই উঠে অ্যানাইহিলিনটা পকেট থেকে বার করে এগিয়ে গেছি। এবার সাহেব দুটিও কোনওরকমে উঠে এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে রিভলবার বার করে গর্তে ফেলে দিলেন। তারপর আমি ফেললাম আমার অ্যানাইহিলিন।
ঘরের আবহাওয়া তৎক্ষণাৎ আবার স্বাভাবিক হয়ে এল।
থ্যাঙ্ক ইউ।
কিছুক্ষণ কথা নেই। আমরা আবার দম ফেলতে পারছি আবার যে যার জায়গায় এসে বসেছি।
এবার যেদিকে গোল গর্ত, সেদিকেরই গোল দরজাটা দুভাগ হয়ে দু পাশে সরে গেল, আর তার ফলে যে গোল গহ্বরের সৃষ্টি হল তার মধ্যে দিয়ে ঘরে এসে যিনি ঢুকলেন, তাঁকে দেখেছি। দশ বছর আগে জেনিভার সেই স্টিমারে।
ইটালির পদার্থবিজ্ঞানী ডঃ রোডোলফো করবোনি।
সন্ডার্স ও ক্রোল দুজনেই এঁকে এককালে চিনত, দুজনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিস্ময়সূচক শব্দ।
করবোনি এখন আরও বিবৰ্ণ, আরও কৃশ। তার মিশকালো চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু তার দৃষ্টিতে তখন যে নৈরাশ্যের ভাব দেখেছিলাম, তার বদলে এখন দেখছি। এক আশ্চর্য দীপ্তি-যেন সে এক অতুল শক্তি ও আত্মপ্রত্যয়ের অধিকারী, কাউকে সে তোয়াক্কা করে না।
ওয়েল, জেন্টলমেন, দরজার মুখে দাঁড়িয়ে শুরু করল। কারবোনি, প্রথমেই বলে রাখি যে আমার সঙ্গে অস্ত্ৰ আছে, কাজেই আমার গায়ে হাত তুলতে এসো না।
আমি সন্ডার্সের দিকে দেখছিলাম, কারণ আমি জানি সে রগচটা মানুষ; এর আগে বার কয়েক তার মাথা গরম হতে দেখেছি। এখন সে দাঁতে দাঁত চেপে রয়েছে। হাত তোলার নিষেধটা মানতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে।
এবার আমি কারবোনিকে একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না।
এই রকেটের মালিক কি তুমি?
আপাতত আমি।
আপাতত মানে? আগে কে ছিল?
যাদের সঙ্গে আমি আজ পনেরো বছর ধরে যোগাযোগ করে আসছি, তারা। এককালে তুমিও করেছিলে। আলফা সেনটরির একটি গ্রহের প্রাণী। তারা যে আসছে, সেকথা তারা আমায় জানিয়েছিল। আমি তাদের জন্য প্ৰস্তুত ছিলাম।
কী ভাষায় ভাবের আদান প্ৰদান হচ্ছিল তোমাদের মধ্যে?
প্রথমে গাণিতিক ভাষায়, পরে মুদ্রার সাহায্যে। ইচ্ছা ছিল ইংরাজি অথবা ইটালিয়ানটা শিখিয়ে নেব, কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠল না।
কেন?
এখানে আসার কী দিন পরেই তারা অসুখে পড়ে।
অসুখ?
হ্যাঁ। ফ্লু। পৃথিবীর ভাইরাসের হাত থেকে তারা রেহাই পায়নি। তিনজন ছিল, তিনজনই মারা যায়। অবিশ্যি আমার কাছে ওষুধ ছিল, কিন্তু সে ওষুধ আমি কাজে লাগাইনি।
