আমার বাবার ছিল রেলের চাকরি। ফলে এক জায়গায় বেশিদিন থাকা আমাদের হত না। নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হত। সেইসব জায়গায় সর্বত্র তখন লোকালয় ছিল না। কোনও টিলার ওপরে বা নির্জন জায়গায় বাবা কোয়ার্টার বা বাংলা পেতেন। আমাদের পরিবারে লোকসংখ্যাও ছিল সামান্য। দিদি, আমি, ছোট বোন, ভাই তখনও হয়নি। সেইসব নির্জন জায়গায় আমার বন্ধু জুটত কমই। যা-ও জুটত তারা ছিল কুলিকামিন বা বাবুর্চি বেয়ারার ছেলেরা। তারা আমার সঙ্গী হয়ে উঠত, বন্ধু হতে পারত না। ফলে মনের দিক থেকে একাকিত্ব কখনও ঘুচত না। পৃথিবীতে বন্ধুর মতো জিনিস খুব কমই আছে। যার সৎ বন্ধু থাকে তার অনেক মনের অসুখ ভালো হয়ে যায়। সেই বয়সে বন্ধুভাগ্য আমার ছিলই না। ফলে ওই মানসিক একাকিত্ব আমার ওই অসুখটাকে বাড়িয়েই তুলত। কিছু করার ছিল না। গুরুজনদের বুঝিয়ে বলতে পারতাম না বলে সেই যন্ত্রণা একা সহ্য করতে হত।
ক্রমে বড় হয়ে উঠতে-উঠতে আত্মসচেতনতা বাড়তে লাগল। খেলাধুলো করি, স্কুলে যাই, দুষ্টুমি করে বেড়াই। বাইরে থেকে দেখে স্বাভাবিক অন্য ছেলেদের মতোই লাগে আমাকে। কিন্তু ভিতরে-ভিতরে আমার বিশিষ্ট এক ‘আমি’ তৈরি হতে থাকে। সব মানুষেরই যেমন হয়। উল্লেখের বিষয় এই যে, আমার ছেলেবেলাতেই যে ‘আমি’ তৈরি হয়েছিল তার বৈশিষ্ট্য ছিল বিষণ্ণতা, অন্যমনস্কতা, চিন্তাশীলতা একাকিত্ববোধ, নিঃসঙ্গতা। এই ধরনের ছেলেরা সাধারণত বই পড়তে ভালোবাসে। খেলাধুলো বা আমোদপ্রমোদ, লোকসঙ্গে, ভিড়ে তেমন আনন্দ পায় না। বই পড়তে-পড়তে বলগাহীন কল্পনাকে ছেড়ে দেওয়া, অবাধ চিন্তার রাজ্যে প্রিয় নির্বাসন-এর চেয়ে স্বাদু আমার কিছুই ছিল না। কাজেই অনিবার্যভাবে বাস্তবতাবোধ, কর্মপ্রিয়তা বা কোনও কাজে পটুত্ব কমে যেতে লাগল। কল্পনাবিলাসীর ভাগ্য যেরকম হয়ে থাকে। চিন্তার রাজ্যে যে রাজা উজির, বাস্তবক্ষেত্রে সে প্রায় অপদার্থ।
খেলাধুলোয় আমার খানিকটা দখল ছিল। বলে শট মারতে ভালোই পারতাম, ক্রিকেটে ব্যাট চালানো আনাড়ির মতো ছিল না, হাইজ্যাম্প-লংজাম্প বা দৌড়ে পটুত্ব না থাক, অভ্যাস ছিল। অনুষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক সম্মেলনে কবিতা আবৃত্তি করতাম। কিন্তু সেগুলো ছিল আমার মনের উপরিভাগের ব্যাপার। মনের গভীরতর স্তরেও বাইরের এসব দৌড়লাফ আবৃত্তি তরঙ্গ তুলত। সেখানে ছিল এক অনপনেয় স্পর্শকাতরতা, আত্মচিন্তা, অভিমান। বাইরের জীবনের যত অকৃত্রিম রাগ ক্ষোভ সব সেখানে গিয়ে বাসা বাঁধত। এবং সমস্ত আঘাতই সেখানে বারংবার কল্পনার রাজ্যের দরজার পাল্লা উন্মোচিত করে দিত। বাইরের জগতের ব্যর্থ ‘আমি’ সেই কল্পনার জগতে আশ্রয় পেতাম। কল্পনার জগতে বহু মানুষেরই বিচরণ–তবে তার তারতম্য আছে। নিজেকে নিয়ে যার যত চিন্তা, অস্বস্তি, আত্মমগ্নতা তার বাস্তববুদ্ধি তত কম, আঘাত সহ্য করার শক্তি সামান্যই, আত্মনির্ভরশীলতা প্রায় শূন্য। আমারই সেই বিপদ দেখা দিতে লাগল। আমি আরও বেশি করে বই আর বইয়ের মধ্যে ডুবে যেতে লাগলাম। হাতে যখন বই থাকত না তখন মনে কল্পনা থাকত।
যে অনুভূতির কথা বলছিলাম তার বীজ সম্ভবত নিহিত ছিল এখানেই। চারিদিকের পৃথিবী এবং ঘটনাপ্রবাহে অবগাহন না করলে মনটা কেবলই শিকড়হীন গাছের মতো নিজের চারধারে পাক খেয়ে শুকিয়ে কুঁকড়ে যায়। বাস্তবতার জ্ঞানবর্জিত মন হচ্ছে আত্মভুক। নিজের মজ্জা-মাংস রক্ত ছাড়া সে আর খাদ্য-পানীয় পাবে কোথায়? ফলে আর দেহের পুষ্টি এবং লাবণ্যসঞ্চার হচ্ছিল না। অল্পবয়সেই আমার মুখেচোখে বিষণ্ণতা ভর করতে লাগল।
মাঝে-মাঝে কাজে-অকাজে বাল্যকালের সেই অনুভূতি দেখা দেয়। সেই অনুভূতির বিস্ময়বোধ আমাকে ভীত, চঞ্চল করে তোলে। সমাধান পাই না। বাল্যকাল চলে গিয়ে কৈশোর আসছে–টের পাচ্ছি। দেহটি যষ্টির মতো সরল সোজা ওপরে উঠে যাচ্ছে, রোগা হাড়সার দেহ, অন্যমনস্ক, চিন্তাশীল, রুগ্ন এক কিশোর। বই পড়তে ভালোবাসে, কিন্তু পড়ার বইতে তার অনীহা। অর্থাৎ যা কিছু কাজের কাজ তার কোনওটাতেই আগ্রহ নেই।
মনে আছে আলিপুরদুয়ারে এক স্পোর্টসে নাম দিয়েছি। অঙ্ক রেস। দর্শকদের মধ্যে আমার মা-বাবা ছোট দুটি ভাইবোন আর দিদিও রয়েছে। তাদের জন্যই বড় লজ্জা করছিল আমার। দৌড় শুরু হল। কুণ্ঠা জড়ানো পায়ে দৌড়ে গিয়ে কাগজের ওপর লেখা তাঁকে উপুড় হয়ে পড়লাম। যোগ শেষ করে সবার আগে উঠেছি, দৌড়ে যাচ্ছি। নিশ্চিত ফাস্ট, কেউ ঠেকাতে পারবে না। হঠাৎ মনে হল, কাগজে নাম লেখা হয়নি। নাম লেখা না হলে বিচারকর্তা বুঝবে কী করে যে অঙ্কটা আমিই করেছি! ভেবে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ফিরে যাব? নামটা লিখে নিয়ে আসব? ভাবতে-ভাবতেই আর-একটা ছেলে উঠে দৌড়ে এল। দেখতে পেলাম আমার প্রথম স্থান হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। অথচ কাগজে নামও লেখা হয়নি। এই কয়েক মুহূর্তের দ্বিধা–সঙ্কোচের সুযোগে ছেলেটা আমাকে পিছনে ফেলে দৌড়ে গিয়ে তার কাগজ জমা দিল। তখন বোকার মতো অগত্যা আমিও গিয়ে নামহীন কাগজ জমা দিলাম। অঙ্ক রেসের নিয়ম অনুযায়ী অঙ্ক ভুল হলে ফার্স্ট হবে না। অঙ্ক ঠিক হওয়া চাই। অত প্রতিযোগীর মধ্যে আমরা যে প্রথম দুজন, তাদেরই অঙ্ক ঠিক হয়েছিল। ফার্স্ট হল সেই ছেলেটা, আমি সেকেন্ড। পরে জানতে পারলাম যে, সেই ছেলেটাও কাগজে নাম লেখেনি। কিন্তু তার বাস্তবুদ্ধি প্রখর বলে সে নাম লেখার কথা ভাবেওনি। আমি ভাবতে গিয়ে তার অনেক আগে অঙ্ক শেষ করেও পিছিয়ে পড়েছি। সেদিনই বুঝতে পারি, আমার সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে দ্বিধা। সেই অঙ্ক–রেসের শেষে মা খুব হতাশ হয়ে বলেছিলেন–সবার আগে তুই উঠেছিস দেখে ভাবলাম যাক রুনু এবার ফাস্ট হবে। ওমা মাঝরাস্তায় দেখি ক্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছিস হাঁ করে। কী অত ভাবছিলি? বলে রাখা ভালো যে সেই রেসে সেকেন্ড প্রাইজ ছিল না।
