স্বচ্ছ সরোবর, উপবন, তারপর তোমার রাজবাড়ি। দেউড়িতে কেউ পথ আটকাল না, যেতে দিল। সাতমহলা বাড়ির ভিতর দিয়ে হেঁটে-হেঁটে যাই। বিস্ময়ভরে দেখি, তোমার ঐশ্বর্য থরেথরে সাজানো। ছোট একটা বাগানে তুমি হাঁটু গেড়ে আদর করছিলে হরিণকে। তোমাকে ঘিরে কত গাছপালা। কত পাখির ডাক, কত পতঙ্গের ওড়াউড়ি।
আমাদের দিকে তাকিয়ে তুমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে এলে। ভৃঙ্গারের জলে হাত ধুতে-ধুতে তুমি বলেছিলে-এরকমই হয়।
সুখের দিন ছিল মহারাজ। কোথায় গেল?
তুমি বড় স্নেহে কাছে এলে। প্রত্যেকের চোখে তুমি রেখেছিলে তোমার গভীর দু-খানি চোখ। প্রত্যেকের প্রতি আলাদা ভালোবাসা তোমার। বিমুগ্ধ চোখে দেখি তোমাকে। দেখা ফুরায় না। বাক্যহারা আমরা।
তুমি মাথা নুইয়ে বললে–আমার কিছু করার ছিল না।
আমরা বললুম, ফিরিয়ে দাও।
তোমার কণ্ঠস্বর কোমল হয়ে এল। দু-চোখে মৃদু পিদিমের মতো স্নিগ্ধ আলো। তুমি বললে, চারণের মাঠে হরিণেরা ফিরবে না। অত সুন্দর আর রইল না জ্যোৎস্না। মাটির উর্বরতা কিছু কমে যাবে। তবু জেনো, আমি আমি তোমাদেরই আছি।
আমরা বললুম, ফিরিয়ে দাও।
তুমি মাথা নাড়লে। হাত তুলে মৃদু মুদ্রার একটি ইঙ্গিতে মিলিয়ে গেলে তুমি। মিলিয়ে গেল সেই প্রাসাদ, উপবন, সরোবর।
সেই থেকে সুখের দিন গেল মহারাজ। এখন তোমার সঙ্গে আমাদের এক আকাশনদীর তফাত।
মহারাজ, আমাদের সেই সব সুখের দিন কোথায় গেল?
সূত্রসন্ধান
ছেলেবেলা থেকেই–অর্থাৎ যখন আমার বয়স ছয় কি সাত-তখন থেকেই আমার ভিতরে একরকমের অদ্ভুত অনুভূতি মাঝে-মাঝে দেখা দিত। এই অনুভূতি কীরকম তা স্পষ্ট করে বোঝানো খুব শক্ত। তবে একথা বলা যায় যে, অনুভূতিটা এক ধরনের অবাস্তবতার। একা-একা থাকলে হঠাৎ কখনও চারদিকে চেয়ে মনে হত–আমার চারদিকে যা রয়েছে–গাছপালা কিংবা ঘরের দেওয়াল, আসবাব, কিংবা মানুষ–এরা সবাই অবাস্তব, মিথ্যে। এসব জিনিসপত্র, গাছপালা এরা কোনওটাই সত্য নয়। এরকম ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ মাথা গুলিয়ে উঠত। ওই চিন্তা মুহূর্তের মধ্যে প্রবল আকার ধারণ করত, মনে হত–এই পৃথিবীতে যা আমি চোখের সামনে দেখছি তা সবই এক অদ্ভুত উদ্ভট অবাস্তব ব্যাপার, এসবের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই। আমি এই পৃথিবীর কেউ না। এই প্রত্যক্ষ বস্তুগুলি, এই আলো-অন্ধকার এই প্রিয়জন এসবই যেন আমার চারদিকের এক মিথ্যে, অলীক আবরণ মাত্র। ভাবতে ভাবতেই আমার শরীর যেন ঊধ্বদিকে উঠতে থাকত, গা শিউরোত। আমার মনে হত এক ভীষণ যন্ত্রণায় আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আমার মন কিছুতেই এই চিন্তা তখন আর করতে চাইত না, কিন্তু চিন্তা তখন আমাকে ছাড়তও না। বেশ কয়েকটা ঝাঁকুনি দিত আমাকে। কিছুক্ষণ আমি আমার মধ্যে থাকতাম না। এই অনুভূতি আমার শরীরে এবং মনে এত প্রকট এবং প্রবলভাবে দেখা দিত যে, আমার বিশ্বাস ছিল এটা আমার অসুখ। সাংঘাতিক ধরনের কোনও অসুখ।
অস্বীকার করা যায় না, এটা একরকমের অসুখই। অবাস্তবতার এই অনুভূতির দার্শনিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে। পরবর্তীকালে কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের জীবনী পড়তে গিয়ে দেখেছি, তাঁরও অনেকটা এ ধরনের অনুভূতি হত। তিনি তখন দেওয়ালে বা মাটিতে হাত চেপে ধরতেন, শরীরে ব্যথা দিতেন, এবং আস্তে-আস্তে সেই শারীরিক বেদনা তাঁর মানসিক ক্লেশকে উপশমিত করত। এ মুষ্টিযোগ আমার জানা ছিল না। তবে ওই অনুভূতি টের পেলেই আমি জলে ডোবা মানুষের মতো প্রাণপণে মনের ওপরে ভেসে থাকতে চাইতাম। বাস্তবিক ওই সময়ের অভিজ্ঞতা ছিল, যেন। আমি এক অথৈ অনন্ত জলে ডুবে যাচ্ছি।
বছরে এরকম হত দুবার কি তিনবার। প্রথম-প্রথম অনেকদিন আনতে চেষ্টা করতাম। সময়ে ছেলেমানুষি বুদ্ধিবশত আমি ইচ্ছে করেই ওই অনুভূতিটা আনতে চেষ্টা করতাম। ভাবতাম–আচ্ছা, আমার যদি এখন ওরকম হয় তবে কী হবে। এই ভেবে আমি চারদিকে চেয়ে গাছপালা, কী দেওয়াল, কী আসবাব ইত্যাদিকে অবাস্তব, অলীক ভাবতে চেষ্টা করতাম। আশ্চর্য এই যে, চেষ্টা করার সঙ্গে-সঙ্গে আমার গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যেত, আমার শরীর হালকা হয়ে যেন ওপরে উঠে যেতে থাকত এবং মনের ভিতরে এক অথৈ কুলকিনারাহীন কালো জল আমাকে গভীরে আকর্ষণ করত। এরকম ভাবে স্থায়ী হত বড়জোর এক-আধ মিনিট। কিন্তু ওই এক-আধ মিনিট সময়েই আমার যন্ত্রণা এবং ভয় চূড়ান্ত জায়গায় উঠে যেত। চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করত। আবার ঘাম দিয়ে বোধটা প্রশমিত হত। আস্তে-আস্তে স্বাভাবিকতা ফিরে পেতাম। শরীর এবং মন ক্লান্ত লাগত।
বয়স বাড়ে। খেলাধুলো, বন্ধুবান্ধব, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা সবই নিয়মানুসারে বেড়ে যায়। বাইরের ব্যস্ততা যখন নিজের মনকে আচ্ছাদন দিয়ে রাখে তখন মন দিয়ে খেলা আপনিই কমে যায়। একটু বয়স বাড়লে আমারও ওই খেলা কমে গিয়েছিল। কমলেও কিন্তু ছাড়েনি। বছরে এক আধবার হতই। বড় ভয় পেতাম। মাকে গিয়ে বলতাম,–মা, আমার মাঝে-মাঝে কীরকম যেন সব মনে হয়।
মা জিগ্যেস করত–কীরকম?
ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারতাম না। মা-ও বুঝতে পারত না, কিন্তু ভয় পেত। বলত–ওসব ভাবিস কেন! না ভাবলেই হয়।
আমি নিজের ইচ্ছায় যে সবসময়ে ভাবতাম তা নয়। আমার আজও মনে আছে যে আমি ইচ্ছে করলেও কে যেন জোর করে আমার ভিতরে ইচ্ছেটাকে তৈরি করে দিত। ভাবতে চাইছি না, তবু আমার ভিতরকার এক অবাধ্য দুরন্ত তোক যেন জোর করে আমাকে ভাবিয়ে তুলছে।
