লুলু বলে–অত্যন্ত জরুরি।
–কী?
–এই জরুরি অবস্থা। অন্তত সাতাশ বছর আগে এটা জারি করা উচিত ছিল।
–কেন?
লুলু তার হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলে–ফর ওয়ান থিং। গত সপ্তাহে আমার দিল্লি যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে যাওয়া বাতিল করতে হয়। আমি ট্রেনের রিজার্ভেশন ক্যানসেল করার জন্য রেল অফিসে ফোন করি। ফোনের রিং হতেই ওপাশে কে যেন রিসিভার তুলে বলল নমস্কার। আমি রং নাম্বার ভেবে ফোন ছেড়ে দিই। কিন্তু তারপর আরও তিন–তিনবার সেই আশ্চর্য ঘটনা। রেল অফিস টেলিফোনের জবাব দিচ্ছে, এবং জবাব দেওয়ার আগে নমস্কারও জানাচ্ছে। জাস্ট থিংক অফ ইট। গত সাতাশ বছর ধরে আমি রেল অফিসে ফোন করে আসছি, কখনও এরকম ঘটনা ঘটেনি।
আমি খুব মন দিয়ে নোটবইতে কথাগুলি লিখছিলাম। লুলু নোটবইটা সরিয়ে নিয়ে বলল –ওহে ইডিয়ট রিপোর্টার, ইমারজেন্সির মর্ম কবে বুঝবে? তোমার হুইস্কির গ্লাসে এক্ষুনি একটা দারুণ ইমারজেন্সি দেখা যাচ্ছে। বরফ গলে গরম হয়ে যাচ্ছে হুইস্কি। আগে ওটা খাও, তারপর লিখবে।
লুলু খুবই ইম্পট্যান্ট। তার অবাধ্যতা চলে না। হুইস্কি খেতে-খেতে আমি বলি–কিন্তু রেল অফিস থেকে টেলিফোনে নমস্কার জানানোটাই তো বড় কথা নয় মিস্টার লুলু। এতে দরিদ্র ভারতবাসীর কী লাভ হবে। ভারতবর্ষের বহু কোটি লোক টেলিফোন জীবনে একবারও ব্যবহার করেনি বা তারা রেল অফিসেও কোনওদিন টেলিফোন করবে না।
লুলু গম্ভীরভাবে বলে–সরকারের বর্তমান নীতিই হচ্ছে ভারতবর্ষের প্রত্যন্ত গ্রামে গঞ্জে জনসাধারণের হাতের কাছে, নাগালের মধ্যে টেলিফোন পৌঁছে দেওয়া। প্রত্যেক টেলিফোনের সঙ্গে নোটিশ দেওয়া থাকবে : নমস্কারের জন্য রেল বা সরকারি অফিসে টেলিফোন করুন।
আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বলি–কিন্তু টেলিফোন করার জন্য তো পয়সাও দিতে হবে মিস্টার লুলু।
–তা হবে। তবে নমস্কারটা ফ্রি পাওয়া যাবে।
কোলের ওপর নোটবই রেখে লুলুর চোখকে ফাঁকি দিকে মন্তব্যটা লিখে নিয়ে আমি বলি–নাগরিক অধিকার সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন উঠেছে এবং বাক স্বাধীনতা।
লুলু আরও দু-পেগ টেনে নিয়ে দু-পেগের প্রথম কিস্তিতে চুমুক দিয়ে বলে–মানবিক অধিকার ভারী সুন্দর কথা, কিন্তু মানে হয় না। অন্তত সতেরোটা ডিকশনারি খুঁজেও অর্থ বের করতে পারিনি।
আমি লুলুর ভুল শুধরে বলি–মানবিক নয়, নাগরিক।
–ওঃ! বলে লুলু হেসে বলে–তাই বলুন। নাগরিক অধিকার! আমি মানবিক ভেবে এমন ঘাবড়ে গিয়েছিলাম! আসলে মানুষ এবং নাগরিক কথা দুটোই আলাদা, অর্থও দুরকম। নাগরিক মানেই কিন্তু মানুষ নয়। এ কথাটা মনে রাখলে আর কোনও গোলমাল থাকে না।
আমি একটু গোলমাল পড়ে গিয়ে জিগ্যেস করি–নাগরিক এবং মানুষ কি আলাদা শ্রেণি?
–আলবাত! লুলু প্রায় চেঁচিয়ে বলে ওঠে। চোঁ করে হুইস্কি টেনে নিয়ে আবার খুব নীচু গলায় বলে–আসলে কোনওটারই মানে হয় না।
আমি কিন্তু-কিন্তু করে বলি–কিন্তু…
–মূর্খ সাংবাদিক, আপনি অকারণ সময় নষ্ট করছেন। চারদিকে এখন জরুরি অবস্থা।
আমাদের প্রয়োজনগুলিও অত্যন্ত জরুরি। সময় নেই। আয়ু বয়ে যাচ্ছে, একদম সময় নেই। দেরি করলে যৌবন ফিরে যাবে, বসন্ত শেষ হবে। উঠে পড়ুন।
লুলুর গুরুত্ব অপরিসীম। তাই আমি তার আদেশে উঠে পড়লাম।
গাড়ি করে লুলু আমাকে এক বিশাল ম্যানসনে নিয়ে গেল। এত বড় একটা বাড়ি কলকাতার মহার্ঘ প্রায় বিঘে দুই জমিতে কী করে জমিয়ে বসেছে তা ভাববার কথা।
স্বয়ংক্রিয় লিফটে ওপরে উঠতে-উঠতে লুলু আমার দিকে চেয়ে মহা বদমাশের মতো মুচকি হেসে বলে–এ-বাড়িতে আমার প্রায় আধ ডজন প্রেমিকা থাকে।
বলে লুলু আমার মুখের ভাব লক্ষ করতে লাগল। আমি যতদূর সম্ভব মুখখানা ভাবলেশহীন রাখার চেষ্টা করতে-করতে বললাম–থাকতেই পারে। খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
লুলু হাসল না। খুব গম্ভীর মুখে ভ্রুকুটি করে বলল –থাকতেই পারে কেন? আর স্বাভাবিক ব্যাপারই বা কী করে হল?
মুশকিলে পড়ে বললাম–বিজ্ঞান বলে পুরুষরা বাই নেচার বহুগামী।
লুলু–তাহলে আইন করে একাধিক বিয়ে বন্ধ করা হল কেন? যদি জানোই যে, পুরুষরা বহুগামী তবে তাদের সেই গমনপথে গর্ত খোঁড়ার মানে কী? পচা রিপোর্টার, অনেক লোক যদি বউ থাকা সত্বেও আর পাঁচটা মেয়ের সঙ্গে শোয় তবে তোমরা তেমন গা করো না। বোধহয় তোমরা নিজেরাও শোও। কিন্তু একজন ভ ভদ্রলোক যদি দ্বিতীয়বার বিয়ে করে তবে সেটা তোমাদের কাছে খবর হয়ে দাঁড়ায়, বুদ্ধ সাংবাদিক, তুমি কি জানো তোমরা কতটা ইর্যাশনাল?
আমি একটু রেগে গিয়ে বলি, কোনও মেয়ের সঙ্গে শুই না। ইন ফ্যাক্ট আমি এখনও সুযোগই পাইনি। আমার আছে সোশ্যাল স্ট্যান্ডিং, সামাজিক সম্মানবোধ এবং নিজের স্ত্রী সম্পর্কে ব্যক্তিগত ভয়–সেই কারণে ইচ্ছে থাকলেও আমি চরিত্রহীন হতে পারছি না।
লুলু খুবই স্নেহের সঙ্গে আমার দিকে চেয়ে ‘তুমি’ থেকে আবার আপনিতে ফিরে গিয়ে বলে–রিপোর্টার মহোদয়, এবার বুঝতে পারছেন তো আপনার মতো একটি ছাগলের পক্ষে নাগরিক স্বাধীনতা কত অর্থহীন একটি শব্দ! এমনকী দেশ জুড়ে যেসব নাগরিক রয়েছে তারাও অধিকাংশই মানুষ নয়, আপনারই মতো ছাগল! নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য মহিলার সঙ্গে শোওয়ার ইচ্ছে ও স্বাধীনতাকে তারা স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়েছেন। সুতরাং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে আপনারা কী করবেন?
