লুলু আসলে কে বা তার গুরুত্বই বা কী তা আমার কাছে অস্পষ্ট। তবে যতবারই দেশে কোনও-না-কোনও ঘটনা ঘটে তখনই আমাকে লুলুর কাছে আসতে হয়, তার সাক্ষাৎকার নিতে। এ যাবৎ তার কত যে সাক্ষাৎকার নিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তবু লুলু আমাকে আদপেই মনে রাখেনি। দেখা হলে সম্পূর্ণ নতুন করে পরিচয় দিতে হয় এবং পুরোনো পরিচয়ের কোনও স্মৃতির ঝলকানিও লুলুর ভাবসাবে কখনও ফুটে ওঠে না। এটাই যাকে বলে আপশোশ কি বাত।
১৯৪৭ সালের ষোলোই আগস্ট আমি লুলুর সাক্ষাৎকার নিতে আসি, মনে আছে। তখন লুলুর চেম্বার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ছিল না, তবে সে তখনও এখনকার মতোই ব্যস্ত মানুষ ছিল। দেখা করার জন্য আমাকে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হয়। ঘরে ঢুকে কিন্তু লুলুকে একটুও ব্যস্ত দেখিনি। টেবিলের ওপর পা তুলে সে বসেছিল। চেয়ারটা পিছন দিকে হেলে দুটো পায়ার ওপর বিপজ্জনকভাবে ভারসাম্য রক্ষা করছে কোনওক্রমে। লুলু মৃদু হেসে বলল –বি কুইক।
–এই স্বাধীনতা, এই চূড়ান্ত জয়, এই দেশ বিভাগ এবং এই…এই…আবেগে আমার গলা বসে গেল।
লুলু মাথা নেড়ে বলল –হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই স্বাধীনতা, এই দেশ বিভাগ আর যা কিছু সবই খুব চমৎকার। অতি চমৎকার। এই জয়…তবে আমার একটা ভয় হচ্ছে যে, যেসব ইংরেজ এদেশে মারা গেছে তাদের ভূতগুলো চলে যাচ্ছে না। সেগুলোকে যদি না তাড়ানো যায় তবে পাকে প্রকারে ইংরেজও থাকছে। এবং ইংরেজিয়ানাও। এখন আমাদের উচিত হবে ভারতের অতীতের ভূতদের ইংরেজ ভূতের বিরুদ্ধে লাগানো।
লুলু যে সামান্য মাতাল অবস্থায় ছিল তা তখন আমি টের পাই।
গান্ধি হত্যার পর আমি লুলুর কাছে গিয়ে আবার ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর চেম্বারে ঢুকে দেখি লুলু অবিকল সেইভাবেই বসে আছে।
বলি–এই বিশ্বাসঘাতকতা, এই হত্যা…
লুলু মাথা নেড়ে বলল –জঘন্য। আসলে একজনকে খুন করার মধ্যে কী যে আছে আমার মাথায় আসে না। লাভ কী? আমার তো ভাবতেই জ্বর আসে? খুনের পর ধরা পড়তে হবে, দিনের পর দিন স্নায়ু–ছেঁড়া মামলা চলবে। তারপর ফাঁসি…ওঃ। তার চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আছে। ধরুন, কাউকে মারার ইচ্ছে হলে আমি তার একটা মূর্তি তৈরি করে সেটার ওপর গুলি চালালাম, ইচ্ছে মতো তারপর লোকটাকে চিঠি লিখে জানিয়ে দিলাম যে, অমুক দিন অমুক সময়ে তোমাকে আমি মেরে ফেলেছি। ব্যস, লোকটাও তা জানার পর একদম মৃতের মতো হয়ে যাবে। অর্থাৎ সব কাজকর্ম অ্যাকটিভিটি বন্ধ করে দেবে। হত্যাটা হবে প্রতীকী এবং তাতে হিংস্রতাও থাকবে না। চিন যুদ্ধের সময় ফের পত্রিকার তরফ থেকে লুলুর কাছে যাই।
–এই যুদ্ধ সম্পর্কে…
লুলু অবিকল একইভাবে চেয়ারে দোল খেতে-খেতে বলে–হোপলেস। যুদ্ধ টুদ্ধের কোনও মানেই হয় না। বিশেষ করে চিনেদের সঙ্গে। আমার মনে হয়, এসব ডিসপিউট মেটানোর জন্য অন্য ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সাগ্রহে বলি–কীরকম?
–ধরুন, চিনের সঙ্গে ভারতের একটা হকি ম্যাচের ব্যবস্থা হল। যদি ভারত জেতে তাহলে তার কথাই থাকবে। হকিতে আপত্তি থাকলে চিন পিংপংয়েও ভারতকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। যাই হোক, আমার কথা হচ্ছে, স্পোর্টসের যুদ্ধটা সেরে নেওয়া ভালো। সিরিয়াসলি মারপিটটা নিছক ছেলেমানুষি। আমি জানি চিন বলছে যে, তিব্বত তাদের। আমার প্রথম বিয়ের আগে আমার বউও বলত সে নাকি আমার, একান্তই আমার। তারপর আরও চারবার বিয়ে করতে হয়েছে আমাকে এবং এখন আবার আমি দারাহীন, কিন্তু প্রথম বউয়ের মতো সব বউই আমাকে ওই একই কথা বলছে, এবং ওই একই কথা হয়তো এখনও তারা তাদের নতুন নতুন প্রেমিক বা স্বামীর কাছে বলছে। এসবের কোনও মানে নেই। দুনিয়াতে কেউ বা কিছু কারও বা কিছুর নয়।
সেদিনই আমি লুলুকে বলি–আপনার চেম্বারটা এয়ারকন্ডিশনড করান না কেন? আর ওই বিপজ্জনক চেয়ারের বদলে আপনি তো অনায়াসে একটা রিভলভিং চেয়ারের ব্যবস্থা করতে পারেন।
এরপরও পাকিস্তান যুদ্ধ, ভিয়েতনাম, কংগ্রসে ভাগ, নকশাল আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট ইত্যাদি বিষয়ে আমাকে লুলুর লাক্ষাৎকার নিতে হয়। কিন্তু সেগুলোর কথা থাক। ইমারজেন্সির পর যখন আমি লুলুর কাছে যাই তার বেশ কিছুদিন আগে তার চেম্বার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং সে একটা রিভলভিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে। একটু মাতাল।
বললাম–ইমারজেন্সি সম্পর্কে কিছু বলবেন?
লুলু টেবিলে মৃদু চাপড় দিয়ে বলে–আলবাত!
–কী?
–দেয়ার ইজ অ্যান ইমারজেন্সি। খুবই জরুরি ব্যাপার। খুবই আর্জেন্ট। অনেকক্ষণ ধরেই এটা আমি ফিল করেছি। চলুন যাওয়া যাক।
–কোথায়?
–জরুরি কাজে। খুবই জরুরি।
এই বলে লুলু উঠে পড়ে। আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামিয়ে আনে রাস্তায়, গাড়িতে ওঠায় এবং একটা মদের দোকানে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বলে–এ ব্যাপারটা খুবই জরুরি।
–কিন্তু আমি জরুরি অবস্থা জারি প্রসঙ্গে…
লুলু আধো চোখ আমাকে দেখল। খুবই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি। দুপেগ করে হুইস্কির হুকুম দিয়ে আমার দিকে চেয়ে বলল –আপনি নতুন জার্নালিসম করছেন, তাই না?
–না। আমি দীর্ঘকাল ধরে…ইন ফ্যাক্ট আমি আপনার ইন্টারভিউই তো বহুবার…
লুলু মাথা চেপে ধরে একটা কাতর শব্দ করল। তারপর বলল –তাহলে আপনি একটি গর্দভ রিপোর্টার।
–কেন? আমি ফুঁসে উঠে বলি। পরমুহূর্তেই আমার মনে পড়ে যায় যে, লুলু অত্যন্ত ইমপর্ট্যান্ট লোক। দেশের অন্যতম প্রধান নায়ক। সব কিছুর মূলেই লুলু। তাই আমি আবার বিনীত হয়ে বলি–হতেও পারে।
